E-Paper

অচেনা উদ্‌যাপন, পথে দাপাল ভিন্ রাজ্যের গাড়ি

অন্যান্য ভোটের ফল ঘোষণার পরে যে উৎসব কলকাতার রাস্তায় দেখা যায়, এ দিনের বিজয়োৎসব তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা ছিল বলে মনে করছেন শহরের বাসিন্দাদের অনেকেই।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৯:৪৯
উন্মাদনা: বিজেপির জয়ের পরে শহরে রাজস্থানের নম্বর প্লেট লাগানো গাড়ি নিয়ে, ডিজে বাজিয়ে উল্লাস সমর্থকদের। সোমবার।

উন্মাদনা: বিজেপির জয়ের পরে শহরে রাজস্থানের নম্বর প্লেট লাগানো গাড়ি নিয়ে, ডিজে বাজিয়ে উল্লাস সমর্থকদের। সোমবার। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

গত কয়েক দিনের টানটান উত্তেজনার মোড়ক থেকে সকালের কলকাতা তখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। সোমবার, বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার দিন, সকাল সাড়ে ৯টাতেও এমন জনশূন্য রাস্তাঘাট, দেখে মনে হচ্ছিল, যেন অঘোষিত ‘কার্ফু’ চলছে। যদিও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চেনা শহরের চেহারা বদলাতে শুরু করল। পরিবর্তনের পক্ষে রায় যত স্পষ্ট হল, ততই আরও অচেনা হয়ে উঠতে থাকল পরিচিত কলকাতা। দিকে দিকে তত ক্ষণে রাস্তার দখল নিয়েছে বেপরোয়া মোটরবাইক বাহিনী। ঘুরছে রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের নম্বর প্লেট লাগানো হুড খোলা গাড়ি। সেই সমস্ত গাড়ির চালকেরা হর্ন দিতে দিতে নাচছেন। মাঝেমধ্যেই রাস্তায় এসে পড়ছে গুটখার পিক। বনেটেরউপরে উঠেও চলছে বেপরোয়া নাচ। বাদ নেই লরি, বাসের মাথায় উঠে নাচও। এর কিছু ক্ষণের মধ্যেই পাড়ায় পাড়ায় শুরু হল চটুল হিন্দি গানের সঙ্গে আগলহীন উন্মাদনার নাচ। যা চলল মধ্যরাত পর্যন্ত।

অন্যান্য ভোটের ফল ঘোষণার পরে যে উৎসব কলকাতার রাস্তায় দেখা যায়, এ দিনের বিজয়োৎসব তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা ছিল বলে মনে করছেন শহরের বাসিন্দাদের অনেকেই। তাঁদের প্রশ্ন, বিজয়োৎসবে জাঁকজমক রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সার্বিক অংশগ্রহণ আছে কি? দিনভর শহরের রাস্তায় ঘুরে দেখা গেল, জয়ের উদ্‌যাপন কখনওই সার্বিক চেহারা নিল না। সম্ভ্রান্ত কলকাতা বিকেল গড়ানোর সময়েও ঘরবন্দিই রইল। দক্ষিণের চেয়ে উত্তর কলকাতার রাস্তায় বিজয়োৎসব চোখে পড়ল কিছু বেশি। তবে, কোথাওই কোনও সঙ্ঘবদ্ধ মিছিল নেই। বদলে ছিল মোটরবাইক, হুড খোলা গাড়ির দাপাদাপি। যে সমস্ত জায়গায় গান বাজিয়ে নাচ চলেছে, সেখানে রয়েছে অবাঙালির আধিক্য। উত্তর কলকাতার বাগবাজার স্ট্রিটে এমনই একটি গলির মুখে হিন্দি গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে এক ব্যক্তি হিন্দিতেই বললেন, ‘‘এ বার শান্তিতে থাকা যাবে এখানে।’’ কথা থামিয়ে দিয়ে পাশে দাঁড়ানো আর এক ব্যক্তি ভিড়ের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘‘রাত মে পার্টি হোগা। ডান্সার বুলাও।’’ এর মধ্যেই সেখানে হাজির মোটরবাইক বাহিনী।সাইলেন্সার খোলা সেই বাইকের আওয়াজ যেন চকলেট বোমা ফাটানোর শব্দকেও হার মানাবে।

মুরলীধর সেন লেনে বিজেপির কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গেরুয়া আবির মাখা এক ব্যক্তি আবার বললেন, ‘‘এর পরে হিন্দু রাষ্ট্র তৈরি করাই লক্ষ্য। মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।’’ দেখা গেল, মুরলীধর সেন লেনে বিরাট মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। তার এক পাশে পদ্মফুলের ঘেরাটোপে রয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি। মূর্তির দু’কান, মাথা— সবেতেই একটি করে পদ্মফুল গুঁজে দেওয়া হয়েছে। তারস্বরে বাজতে থাকা সাউন্ড বক্সের মধ্যে যতটা সম্ভব গলা চড়িয়ে বিজেপি কর্মীর মন্তব্য, ‘‘নতুন পরিকল্পনা হয়েছে। একটু পরেই বাইক বাহিনী কালীঘাটে ঘরে ঘরে পদ্মফুল উপহার দিতে যাবে।’’ সেইউচ্চকিত কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় ঢাক, ঢোল, বাজির শব্দে।

এ দিন দেদার বাজি ফেটেছে দক্ষিণ কলকাতার গণনা কেন্দ্রের বাইরেও। সেখানে দুপুর থেকেই লাড্ডু বিলোনো শুরু হয়েছিল। এ দিন মিষ্টির ভিড়ে বাংলার রসগোল্লাকে টেক্কা দিয়েছে লাড্ডু। শহরের একাধিক নামী মিষ্টির দোকান বিকেল পর্যন্ত বন্ধ থেকেছে। তার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ লাড্ডুর বন্দোবস্ত হল কী করে? রাজ্যবিজেপির এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘এক সপ্তাহ আগে থেকেই বরাত দেওয়া ছিল। ফলাফল তো জানতামই। শুধু লাড্ডু কেন, প্রচুর পরিমাণ কাতলা মাছ কেনা হয়েছে। দিকে দিকে আজ মাছে-ভাতে উৎসব হচ্ছে।’’

এই উৎসবের মাঝেই উত্তরের দেশবন্ধু পার্কের কাছে ‘খেলা শেষ’ লেখা ব্যানার পড়েছে। আবির মেখে সেই ব্যানার ঘিরে দাঁড়িয়ে নিজস্বী তোলার মাঝেই এক মহিলার মন্তব্য, ‘‘ভুল ব্যানার। খেলা শেষ কোথায়? খেলা তো এ বার সবে শুরু।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Rajasthan

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy