অনুপ্রবেশ সমস্যাই এ রাজ্যের নির্বাচনী লড়াইয়ে কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিশেষ করে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে এ বারের নির্বাচনে যে তীব্র স্রোত তৈরি হয়েছে, তার মূলেই তা-ই। সেই প্রশ্নেই শুক্রবার পরস্পরকে বিঁধলেন অমিত শাহ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নির্বাচনী প্রচারে এসে ফের এ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় তুলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ। নিউ টাউনের হোটেলে বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘বিজেপির লক্ষ্য অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে ( ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট) ফেরত পাঠানো। রাজ্যের সরকারের সহায়তা ছাড়া এই কাজ সম্ভব নয়। বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে খুঁজে খুঁজে অনুপ্রবেশকারীদের বার করে দেওয়া হবে।’’ পরে পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় জনসভাতেও শাহ বলেছেন, ‘‘অনুপ্রবেশকারী-মুক্ত বাংলা চাই কি? বিজেপি চায়, বাংলাকে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করতে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদের সামলে রাখতে চান।’’
এই তরজায় শাহের দিকে পাল্টা আঙুল তুলেছেন তৃণমূল নেত্রীও। মমতাও এ দিন বলেন, ‘‘অনুপ্রবেশকারী যদি ঢোকে, তা হলে অমিত শাহের পদত্যাগ করা উচিত।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব মনে করিয়ে তাঁর দাবি, ‘‘আমরা অনুপ্রবেশকারী ঢোকাইনি। কারণ, আমাদের ঢোকানোর ক্ষমতা নেই। সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।’’ অনুপ্রেবশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ দিন বলেছেন, ‘‘পহেলগামে অনুপ্রবেশ হল কী করে? দিল্লিতে জঙ্গিরা ঢুকে হামলা চালাল কেমন করে? ওখানে তো সুরক্ষার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের।’’ এই প্রশ্নে এ দিন আরও এক বার বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গও তুলেছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘কোন ব্যবসায়ীর স্বার্থরক্ষায় তা করা হচ্ছে?’’
সমস্যা হিসেবে অনুপ্রবেশকে নানা আঙ্গিকে প্রচারে আনছে বিজেপি। শাহ বলেন, ‘‘অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের যুবকদের চাকরি খাচ্ছে, চাল হজম করছে। এই অনুপ্রবেশকারীরা মাফিয়াগিরি করে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘অনুপ্রবেশকারী এত বেড়ে গিয়েছে যে, কে ভারতীয়, কে অনুপ্রবেশকারী সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। বর্ডার সিল করে অনুপ্রবেশকারী আটকানো উচিত কি না? আপনারা এক বার বিজেপির সরকার গঠন করে দিন, মানুষ কেন পাখিও সীমান্ত পেরোতে পারবে না।’’ সাংবাদিক বৈঠকে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা প্রসঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রশ্নের উত্তরে শাহ বলেছেন, ‘‘এর জবাব তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিতে পারবেন! তিনি তাঁর অপকর্মের জন্য রাজ্যে কত অনুপ্রবেশকারীকে আশ্রয় দিয়েছেন? আমরা ক্ষমতায় এলে সংখ্যাটা জানিয়ে দিতে পারব। সবার আগে আনন্দবাজারকে জানাব!’’ তাঁর মন্তব্য, ‘‘রাজ্য সরকারের অপশাসন নিয়ে যে শ্বেতপত্র প্রকাশিত হবে, সেখানেই উল্লেখ থাকবে।’’
উত্তর ২৪ পরগনার সভাগুলিতে অনুপ্রেবশ নিয়ে শাহের দাবিকে এনআরসি’র সঙ্গে জুড়ে এ দিন পাল্টা আক্রমণ করেছেন মমতাও। তিনি বলেন, ‘‘অসমে যখন এনআরসি করেছিল, তখন ১৯ লক্ষ লোকের নাম বাদ গিয়েছিল। ১৩ লক্ষ হিন্দুদের নাম আর ৬ লক্ষ মুসলমানের নাম বাদ গিয়েছিল। সংবাদপত্রে দেখলাম, ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। তার মধ্যে ৬০ লক্ষ হিন্দুর নাম, ৩০ লক্ষ মুসলমানের নাম বাদ রয়েছে।’’
ইস্তাহারে দুর্নীতি নিয়েও তৃণমূলকে বিঁধেছেন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘১৫ বছর মানুষ দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ, জবরদস্তি শাসন দেখেছে।’’ কাটমানি, সিন্ডিকেট ইত্যাদির কথা উল্লেখ করে বিজেপির শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা জানিয়েছেন তিনি। শাহের অভিযোগ, ‘‘ভয়, দুর্নীতি এবং বিভেদের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে তৃণমূল।’’ পাল্টা শাহের দিকে আঙুল তুলে অভিযেক বলেন, ‘‘সব থেকে বড় কয়লা মাফিয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বরণ করে নেন। তাঁর দু’পাশে দুর্নীতিগ্রস্তদের ভিড়। ইডি, সিবিআই জেরা করার পরই সকলে বিজেপিতে চলে যান।’’ এই সূত্রে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, মহারাষ্ট্রের নারায়ণ রানে এবং সদ্যপ্রয়াত অজিত পওয়ারের নামও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)