E-Paper

তৃণমূলের ‘স্পেশাল জ়োন’-এ সংগঠনের জোরে ঢাকা পড়ছে অনুন্নয়নের ক্ষত

নদীর ধারে প্রায় দশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাঁচটি সেক্টরে তৈরি এসইজ়েডে এক সময়ে দেড়শোর কাছাকাছি কারখানা রমরমিয়েচলত। বর্তমানে কমতে কমতে গোটা পনেরো কারখানা রয়েছে। হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল এক সময়ে।

সমীরণ দাস 

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৬
বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি কারখানা। ফলতা এসইজ়েড-এ।

বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি কারখানা। ফলতা এসইজ়েড-এ। — নিজস্ব চিত্র।

ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে যাওয়ার পথে ফতেপুরের কাছে রাস্তার বাঁ দিকে দিক-নির্দেশক মস্ত বোর্ডটাচোখ এড়ানোর কথা নয়। সবুজের উপর‌ে বড় বড় সাদা অক্ষরে লেখা— ‘ফলতা স্পেশাল ইকনমিক জ়োন’। দীর্ঘ দিন ধরে রোদ-বৃষ্টিতেই সম্ভবত সবুজের আস্তরণ উঠে সাদা অক্ষরগুলি কিছুটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। বোর্ডে দেওয়া দিক-নির্দেশ মেনে জাতীয় সড়ক ছেড়ে ডান দিকে গেলেই পৌঁছনো যাবে বাম আমলে সাড়া জাগানো ফলতার এসইজ়েড-এ। তবে, সাইনবোর্ডের লেখার মতোই বর্তমানে সেই স্পেশাল ইকনমিক জ়োনও এলোমেলো।

নদীর ধারে প্রায় দশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাঁচটি সেক্টরে তৈরি এসইজ়েডে এক সময়ে দেড়শোর কাছাকাছি কারখানা রমরমিয়ে চলত। বর্তমানে কমতে কমতে গোটা পনেরো কারখানা রয়েছে। হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল এক সময়ে। এখন হাতে গোনা কয়েক জন কর্মী কাজ করেন। স্থানীয় নীলা গ্রামের বৃদ্ধ সমীর মণ্ডলের আক্ষেপ, “এখানে এক সময়েবাইরের লোকজন দলে দলে কাজে আসতেন। আর এখন এখানকার ছেলেদেরই কাজের খোঁজে ভিন্ রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে।” এই ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে গত লোকসভা ভোটে দেড় লক্ষেরও বেশি ভোটে লিড পান ডায়মন্ড হারবারলোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলতা, বিষ্ণুপুর, সাতগাছিয়া মিলিয়ে লিডের অঙ্ক ছিল তিন লক্ষের কাছাকাছি। তৃণমূলের নেতারাই বলছেন, ব্যবধানের নিরিখে এই অঞ্চল তৃণমূলের নিজস্ব ‘স্পেশাল ইকনমিক জ়োন’। বিরোধীরা ব্যাপক ভোট লুট, সন্ত্রাসের অভিযোগ তোলে। তবে তৃণমূলের দাবি, দক্ষ সংগঠনই জয়ের চাবিকাঠি। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়েই তৃণমূলের সংগঠন ভাল। তবে ভোটের ফল বলছে, ডায়মন্ড হারবার লোকসভার এই এলাকাগুলিতে তৃণমূল কার্যত অপ্রতিরোধ্য। তাই বিধানসভা ভোটেও জমাট সংগঠনে টাল খাওয়ার কোনও কারণ দেখছেন না তৃণমূল নেতৃত্ব। সেই দক্ষ সংগঠন দিয়েই ঢাকার চেষ্টা চলছে অনুন্নয়ন-সহ নানা অভিযোগের ক্ষত।

ফলতায় বেহাল এসইজ়েড-কে ভোটের প্রচারে তুলে ধরছে বিরোধীরা। বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডার অভিযোগ, তৃণমূলের দাদাগিরি আর তোলাবাজির জেরেই একের পর এক সংস্থা এসইজ়েড ছেড়ে চলে গিয়েছে। তৃণমূলের মস্তানিতে বিরোধীরা তো বটেই, এখানকার বহু শান্তিপ্রিয় মানুষও এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ। আরও অভিযোগ, ফলতার নদী-কেন্দ্রিক পর্যটন ভেঙে পড়েছে। সিপিএমের প্রার্থী শম্ভু কুর্মি গণতন্ত্র ধ্বংস, বেহাল কর্মসংস্থানের কথা তুলেও সরব হয়েছেন। তৃণমূলের হয়ে প্রথম বার টিকিট পাওয়া, অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খান জানাচ্ছেন, জিতে বিধানসভায় গিয়ে এসইজ়েড পুনরুদ্ধারে সরব হবেন। এই জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধেই নানা সময়ে ভোট লুট-সহ দাদাগিরির একাধিক অভিযোগ তুলেছেন বিরোধী নেতারা। জাহাঙ্গিরের দাবি, ভয়ে ঘর ছাড়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। কেউ ঘরছাড়া থাকলে, তিনি নিজে তাঁকে ফেরানোর ব্যবস্থা করবেন।

বেলসিংহা-২ পঞ্চায়েতের সদস্য থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে এসে চমকপ্রদ উত্থান হয় জাহাঙ্গিরের। সঙ্গীদের দাবি,অভিষেক-ঘনিষ্ঠতা ও দুর্দান্ত সাংগঠনিক শক্তির কারণেই ঈর্ষায় তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। সেই ‘ভাবমূর্তি’ থেকে বেরোতেই প্রচারে জোর দিচ্ছেন জাহাঙ্গির। প্রচার-পর্বে বিভিন্ন এলাকায় যুব নেতাকে ঘিরে উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ছে। উল্টো দিকে, দেওয়ালে বা ফ্লেক্স-ফেস্টুনে বিরোধীদের উপস্থিতি বেশ কম। জাহাঙ্গিরের কথায়, “আমরা সারা বছর মানুষের সঙ্গে থাকি। এলাকা জুড়ে সাংসদের নেতৃত্বে প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে। বিরোধীদের পতাকা বাঁধার লোকও নেই।”

পাশেই বিষ্ণুপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ঢোকার মুখে থমকে যেতে হবে আমতলা রোডে। দীর্ঘ দিন ধরেই বেহাল এই রাস্তা। প্রায়ই দুর্ঘটনাঘটছে। ভোটের মুখে কাজ শুরু হয়েছে। বিরোধীরা বলছেন, অভিষেকের ডায়মন্ড মডেলের আসল ছবি এই বেহাল রাস্তাই। এই এলাকারবিদায়ী বিধায়ক তথা এ বারের প্রার্থী দিলীপ মণ্ডল আবার পরিবহণ দফতরের প্রতিমন্ত্রীও। তাঁর দাবি, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লেগেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। বেহাল রাস্তায় সাধারণ মানুষের নিত্য দুর্ভোগ ভোট বাক্সে কোনও প্রভাব ফেলবে না বলেই আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল।

বাম জমানায় ২০০১ সালে বিধায়ক হয়েছিলেন দিলীপ। পরে ২০১১ থেকে টানা জিতছেন। এক সময়ের বাম-গড়ে সংগঠন তৈরি করতে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়েছেন। বর্তমানে ব্লক, অঞ্চল, বুথের পাশাপাশি বহু পাড়ায় পাড়া কমিটি পর্যন্ত রয়েছে তৃণমূলের। নেতারা বলছেন, লড়াইটা ব্যবধান বাড়ানোর। শহর-ঘেঁষা এই এলাকায় জাতীয় সড়কের আশপাশে একের পর এক আবাসন গড়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই আবাসন প্রকল্পেই পকেট ভরছে তৃণমূলের। দু’বার প্রার্থী পরিবর্তন করে বিজেপি শেষ পর্যন্ত এখানে প্রার্থী করেছে ডায়মন্ড হারবার সাংগঠনিক জেলার প্রাক্তন সভাপতি অভিজিৎ সর্দারকে। তিনি বলেন, “এলাকায় চাষের জমি জোর করে দখল করে আবাসন হচ্ছে। তৃণমূলের দাপটে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না।” সিপিএম প্রার্থী শ্যামল ডাল বলেন, “বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এলাকায় কাজ নেই। দলে দলে ছেলেরা বাইরে চলে যাচ্ছে।” দিলীপ অবশ্য বলেন, “বিরোধীরা ছন্নছাড়া। এলাকা জুড়ে যে বিপুল উন্নয়ন হয়েছে, মানুষ তার সঙ্গেই থাকবেন।”

বিষ্ণুপুর লাগোয়া সাতগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্র। এক সময়ে দীর্ঘ দিন এখান থেকে বিধায়ক ছিলেন জ্যোতি বসু। এখানকার কলেজে এক সময়ে পড়াতেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। আমতলার যানজট এলাকার মস্ত সমস্যা। বেহালা, বারুইপুর, ডায়মন্ড হারবার ও বজবজ— এই চার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সংযোগস্থল আমতলায় দিনের বেশির ভাগ সময়েই যানজট লেগে থাকে। এলাকায় জিন্‌স তৈরির প্রচুর কারখানা রয়েছে। রয়েছে প্রচুর নার্সারি। অভিযোগ, ক্ষুদ্র শিল্পগুলির উন্নতিতে প্রশাসনের তেমন পরিকল্পনা নেই। এ বার এখানে নতুন মুখ সোমাশ্রী বেতালকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। জিতে আমতলার যানজট সমস্যার সমাধান, ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি। সোমাশ্রীর স্বামী নবকুমার বেতাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো সৈনিক। সঙ্গীরা বলছেন, ‘‘দাদা এলাকা চেনেন হাতের তালুর মতো।’’

নবকুমারের সূত্রেই সোমাশ্রীকে চেনেন অভিষেক। সেই থেকে গত কয়েক বছরে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ থেকে এ বার বিধানসভার টিকিট পেয়েছেন সোমাশ্রী। গত লোকসভা নির্বাচনের মনোনয়নে সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবক ছিলেন তিনিই। তবে ফলতা, বিষ্ণুপুরের মতো এই এলাকায় তৃণমূল ততটা নিষ্কণ্টক নয়। দলেই নবকুমার-সোমাশ্রীর বিরুদ্ধ গোষ্ঠী রয়েছে। ‘বিপদ’ বুঝে তড়িঘড়ি নির্বাচনী সভা করেছেন অভিষেক। সভায় সব পক্ষকেই অবশ্য দেখা গিয়েছে। গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল জিতলেও কয়েকটি অঞ্চলে এগিয়ে ছিল বিজেপি। লোকসভা ভোটে একটি বাদে সব অঞ্চল পুনরুদ্ধার হয়। বিজেপি এখানে প্রার্থী করেছে অগ্নীশ্বর নস্করকে। গত বিধানসভা ভোটে বিষ্ণুপুরে দাঁড়িয়ে হেরেছিলেন অগ্নীশ্বর। এ বারও বিষ্ণুপুরেই তাঁর নাম ঘোষণা হয়েছিল। পরে সাতগাছিয়ায় প্রার্থী করা হয়। প্রচারে তৃণমূলের দুর্নীতি, এলাকার অনুন্নয়ন তুলে ধরছেন তিনি।

সিপিএমের প্রার্থী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গৌতম পাল বলছেন, “জ্যোতি বসু বিধায়ক থাকাকালীন আর্সেনিকমুক্ত পানীয় জল প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন। আজও আর্সেনিকমুক্ত জল আসেনি। তৃণমূলের মা-মাটি-মানুষের মাটিই এখানে আসল। এলাকা জুড়ে অবৈধ জমির কারবার চলছে।” শাসকদলের সংগঠনের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবেন? গৌতম বলেন, “কিসের সংগঠন? মানুষকে তো ভোটই দিতে দেওয়া হয় না। গণতন্ত্রে শেষ কথা বলেন মানুষ। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তাঁরা ঘুরে দাঁড়াবেনই।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Diamond Harbour TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy