একটি অসহনীয় ঘটনার ধাক্কা? না কয়েক প্রজন্মের বহমান সৌহার্দ্য? কোনটায় আস্থা রাখা ঠিক হবে, তবে?
বৃহস্পতিবার দুপুরে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েও এই প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে ধুলিয়ান। ধুলিয়ান বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জগন্নাথ ভাস্কর, মঙ্গল ভাস্কর বা সঙ্গীতা সরকারেরা বলছিলেন, “এটা ঠিকই, এক বছর আগের সেই বিভীষিকার দিনগুলোয় আমরা অনেকে রাতে ঘুমোতে পারিনি! তবে শিবমন্দির বাজারে বা আমাদের ঠাকুরপাড়ায় মুসলিমদের দোকানও কিন্তু ভাঙচুর হয়েছে। শুনেছি ঝাড়খণ্ড না কোথা থেকে হামলাবাজেরা এসেছিল!” সকলেই একমত, বিপদের দিনে এ শহরের মুসলিম, হিন্দু মুরুব্বিরা কাঁধ মিলিয়েই সবার পাশে থেকেছেন।
মুর্শিদাবাদের উত্তরে শমসেরগঞ্জ বিধানসভা এলাকার গঙ্গাতীরবর্তী শহর ধুলিয়ানে হিন্দুরা শতকরা ২০ ভাগ। আজকের পশ্চিমবঙ্গে বিভাজন-রাজনীতি গত এক বছরে এই তল্লাটকে নিশানা করলেও বাস্তব পরিস্থিতি পড়শির সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য গ্রন্থির কথা বলে। কাঠের আসবাবের কাজ করেন মঙ্গল। তিনি বলছিলেন, “আমার বাড়িতে ছাদ ঢালাইয়ের সময়ে মুসলিম মিস্ত্রিদের সাহায্য নিতে হল। এখানে অগুনতি মুসলিম ঘরে আমারও কাঠের আসবাব তৈরির কাজ লেগেই থাকে। চাইলেই কি পরস্পরকে অবিশ্বাস করে বাঁচা সম্ভব?”
মঙ্গল, সঙ্গীতাদের মতোই উৎকণ্ঠায় বিনিদ্র নিশিযাপনের কথা বলছিলেন ধুলিয়ানের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মহম্মদ পারভেজ আলম ওরফে পুতুলও। তাঁর কথায়, “আমি একা নই! স্থানীয় ব্যবসায়ী রমেশলাল মেমানি, অশোক আগরওয়াল, রামকৃষ্ণ চুন্নু সিংহ এবং সব দলের রাজনৈতিক নেতারাই একযোগে চেষ্টা করেছি।”
ধুলিয়ানের উত্তর-পুবে মাত্র ন’কিলোমিটার গেলেই বাংলাদেশ সীমান্ত। পশ্চিমে চাঁদপুরের পরেই ঝাড়খণ্ডের পাকুড়। এ সব বুঝেই গোলমেলে দিনকালে বাড়তি সতর্ক ছিলেন ধুলিয়ানের বিশিষ্টেরা। গঙ্গার ঘাট থেকে কয়েক হাত দূরে ধুলিয়ান পুরসভার গা-ঘেঁষা উপাসনালয় মিলন-মন্দির তখন গুজব প্রতিরোধ ও সতর্কতায় সবার মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তবে ভোটের তপ্ত দুপুরে ধুলিয়ানে ঘুরতে ঘুরতে স্থানীয় তরুণ সাগর আলি দেখান, সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য আছড়ে পড়েছিল এই শপিংমলে। তৃণমূলের গত বারের
বিধায়ক আমিরুল ইসলামকে এ বার দল শমসেরগঞ্জ থেকে সরিয়ে পাশের ফরাক্কা কেন্দ্রে দাঁড় করিয়েছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব বিষয়টি উপরতলার সিদ্ধান্ত বললেও, ওয়াকফ বিল নিয়ে এক বছর আগের আন্দোলনের সময়ে বিধায়কের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকাও উঠে আসছে।
রাজনীতির মারপ্যাঁচ অবশ্য জটিল এ তল্লাটে। ধুলিয়ানে গোলমালের সময়ে শহর লাগোয়া তিনপাকুড়িয়া পঞ্চায়েতে জাফরাবাদ গ্রামে বাবা-ছেলে হরগোবিন্দ-চন্দন দাসের নৃশংস মৃত্যুতে সাজাপ্রাপ্তদের একাংশের সঙ্গে বিজেপির অন্য রসায়ন চোখে পড়ছে। জাফরাবাদের পাশের গ্রামে শুলিতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে ফরাক্কা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সুনীল চৌধুরীর নির্বাচনী প্রতিনিধি লাল মহম্মদ শেখ। জাফরাবাদে বাবা-ছেলে খুনের অন্যতম আসামি কওসর আলির খুডতুতো ভাই লাল। তিনি ফুঁসে ওঠেন, “আসল খুনিরা অনেকেই আড়ালে। আমার দাদা এনজিও করত, এলাকার পরিচিত রক্তদাতা। আগের বিধায়কের সঙ্গে গোলমালেই কওসরকে ফাঁসানো হয়েছে। এর বিচার চাই বলেই বিজেপিতে ঢুকেছি।”
শমসেরগঞ্জের আগের বিধায়ক বা ফরাক্কার এ বারের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এড়িয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমান। তাঁর কথায়, “কয়েকটি জায়গায় স্থানীয় নেতাদের অবশ্যই আত্মসমীক্ষা দরকার। নইলে এত উন্নয়নের পরেও মমতাদি, অভিষেককে রাজ্য জুড়ে প্রচার করতে হত না।” বিজেপি নেতা সুবল ঘোষ শুধু বলছেন, “জাফরাবাদের ঘটনায় কেউ রেহাই পাবে না। এটা বিজেপি দেখবে।”
হরগোবিন্দ দাসের স্ত্রী পারুল বা এক বছর আগে গুলিতে নিহত সুতির কাশিমনগরের ইজাজ আহমেদের বাবা মানারুল শেখ চোখের জল মুছতে মুছতে ভোট দিয়েছেন। তবে সুতি, শমসেরগঞ্জ, ফরাক্কা সর্বত্র পাশাপাশি লাইনে হিজাবধারিণী, বা তিলকপরিহিতাদের সহাস্য ছবি। পদ্মাপাড়ে নিমতিতা লাগোয়া দেবীপুরে টোটোচালক জসিম হাসান, ডেলিভারি বয় নবাব রাজা, রাজমিস্ত্রি তাশিকুর রহমানদের মতো অনেকে কালো ব্যাজ পরেও ভোট দিয়েছেন। ভোট মিটলেও কারও বাবা, কারও ভাই, বোনের ভোট দিতে না-পারার উৎকণ্ঠার রেশ ছুঁয়ে থাকল তাঁদের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)