সরু, জীর্ণ, ঢালু এবং অরক্ষিত সিমেন্টের ফেরিঘাট। সেখানেই একরত্তি ছেলে কোলে অপেক্ষমাণ মহিলা বেসামাল মোটরবাইকের ধাক্কায় সপাটে পড়লেন নদীর পাড়ে। উঁচু থেকে পড়লেও নরম কাদা ও অল্প জল থাকায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেন দু’জনে।পরিকাঠামোর বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন বাকি যাত্রীদের অনেকেই। কারণ, ‘রোরো-আরসিসি’ জেটি থাকলেও, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গদখালিতে এমন ঘাটেই যাত্রিবাহী নৌকা বাঁধার ছবি খুব পরিচিত স্থানীয়দের কাছে। মানুষ, গবাদি পশু, মোটরবাইক ওঠানামা করে এমন সরু পথেই। সুন্দরবন এলাকায় থাকা গোসাবা-সহ একাধিক দ্বীপে বাসন্তী থেকেযাতায়াত করতে হয় এ ভাবে, কার্যত প্রাণ হাতে।
বৈচিত্রে ভরা সুন্দরবনকে দীর্ঘ চার দশক আগে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ হিসাবে ঘোষণা করেছিল ইউনেস্কো। অথচ, এত দিনেও এলাকার পরিস্থিতির বড়সড় উন্নতি হয়নি বলেই অভিযোগ। একের পর এক ভোটে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকে ভূরি ভূরি। কিন্তু তার পরেও পরিস্থিতির আমূলবদল না হওয়ায় এই বৈশাখের উত্তাপ আরও বাড়াচ্ছে অপ্রাপ্তির বিস্তর অভিযোগ।
রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক ভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিধানসভা কেন্দ্র— গোসাবা এবং বাসন্তী। রাজনৈতিক ভাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই এলাকাগুলিকে শাসকদলের ‘গড়’ বললেও অত্যুক্তি হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সব এলাকার সমীকরণ বদলেছে। ২০০৯ সালের মে মাসে আয়লা ধাক্কা দিয়েছিল সুন্দরবনকে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির মধ্যে ছিল গোসাবাও। বাঁধ ভেঙে, সমুদ্রের জল ঢুকে প্লাবিত হয় চাষের জমি। জমি নোনা হয়ে যাওয়ায় চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পরেও সেই ক্ষত মোছেনি। অভিযোগ, আগে ধান ছাড়া বেশ কিছু আনাজ চাষ হলেও এখন নোনা জমি তার অন্তরায়। ধান চাষের পরিমাণও কমেছে। অবস্থাপন্ন যাঁরা সেচের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন, তাঁরা কিছুটা ভাল চাষ করতে পারেন।
আয়লার পরে বাম আমলে সুন্দরবন এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৭৭৮ কিলোমিটার এলাকা অতি বিপজ্জনক হিসাবে চিহ্নিত হয়। তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়েরআমলে ওই এলাকায় কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ হয় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এলাকাবাসী এবং স্থানীয় সেচ-আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য বলছে, এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের (১৮৩ কিলোমিটার) কাজই শেষ করা যায়নি এখনও। ফলে, আসেনি বরাদ্দের বাকি বেশির ভাগ অর্থ।
প্রতিশ্রুতি ছিল আরও। অভিযোগ, ক্যানিং-ঝড়খালি রেলপথ তৈরির কাজও বিশ বাঁও জলে। বাম আমলে সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের তৎকালীন সদস্য লোকমান মোল্লা কেন্দ্রের কাছে তদ্বির করলেও জমি সমস্যার কারণে সেই প্রকল্প বন্ধ। গোসাবা-গদখালি সেতু এবং চুনাখালি-শম্ভুনগর সেতুর প্রতিশ্রুতি এখনও অন্ধকারে। পানীয় জলের সঙ্কট থাকায় জল কিনে খেতে হয় স্থানীয়দের। পাঁচ লিটারের ব্যারেল বিক্রি হয় ২০ টাকায়। এক টোটোচালকের কথায়, “উচ্চ মাধ্যমিকের পরে পড়ার সুযোগ ছিল না। বাবার চাষ ভীষণ ভাবে মার খায়। জমিতে নুন থাকায় চাষ ভাল হচ্ছে না। চাকরির সুযোগ নেই। কারও শরীর খারাপ হলে বাসন্তী বা ক্যানিং হাসপাতালই ভরসা। বড় কিছু হলেই কলকাতা ছুটতে হয়। স্কুলগুলিও ধুঁকছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ তৈরি হয়নি। বেসরকারি কিছু পর্যটন-উদ্যোগ হয়েছে। শীতকালে খানিকটা আয় বাড়ে।”
বিজেপি প্রার্থী বিকর্ণ নস্করের অভিযোগ, “পানীয় জল, নদী বাঁধ, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, পর্যটন, চাষের জমির কোনও উন্নয়ন এত বছরে হয়নি। অনেক হেভিওয়েটকে ১৫ বছর ধরে মানুষ দেখেছেন, কেউ কিছু করেননি। নদী বাঁধ, পর্যটন, স্বাস্থ্য উন্নয়নের রূপরেখা তৈরির কাজ আমরা শুরু করে দিয়েছি।”আরএসপি প্রার্থী আদিত্য জোতদারের কথায়, “সুন্দরবনের মানুষকে জন্ম থেকেই লড়াই করতে হয়। আয়লার পরে বামফ্রন্ট সরকার চলে যাওয়ায় বর্তমান সরকার স্থায়ী বাঁধের কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। বাঁধের বেশির ভাগ টাকা ফেরত গিয়েছে। স্বাস্থ্যের হাল বেহাল। আয়লার পরে নোনা জমির কোনও উন্নয়নই হয়নি। মানুষকে অন্য রাজ্যে যেতে হচ্ছে কাজের সন্ধানে। কাটমানি-দুর্নীতি এখনকার শিল্প। শিক্ষা-চাকরি শেষ। বিরোধীরাও সরব হননি।” তৃণমূল প্রার্থী সুব্রত মণ্ডলের জবাব, “উপনির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছিলাম। আগের কথা বলতে পারব না। বাঁধ এলাকার ২৭২ কিলোমিটারের মধ্যে ৮০ কিলোমিটার বিপজ্জনক রয়েছে। ২৫-২৬ কিলোমিটারের টেন্ডার শেষ হয়েছে। গোসাবার ন’টি-সহ ৩৯টি দ্বীপে কাজ করতে চাইছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। কেন্দ্রের কারণে এই কাজ গতি পায়নি। পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের ৫২ কোটি টাকায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ। গোসাবায় সাতটি সেতু দরকার বলে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তিনটের ঘোষণা হয়েছে। পরিকল্পিত গ্রাম তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। সেতু হলেই স্বাস্থ্য-শিক্ষা-কৃষির উন্নয়ন হবে।উন্নয়নের পথে অন্তরায় যোগাযোগ ব্যবস্থা।”
তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে গোসাবা কেন্দ্রে। সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের উপাধ্যক্ষ, তিনটি পঞ্চায়েতের প্রধান-সহ ২৩ জন তৃণমূল নেতা-সংগঠক-পদাধিকারী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, এঁরাই সাংগঠনিক ভাবে এই এলাকায় শক্তিশালী রেখেছিলেন তৃণমূলকে। ঘটনাচক্রে, ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে সুর চড়িয়েছিলেন।
১২টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে তৈরি, পাশের বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্র বড়ই চুপচাপ। ভোটের উত্তাপ যেন গায়েই লাগছে না সাধারণের। তবে কর্মসংস্থান নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। অন্য এলাকার মতো এই এলাকাতেও ভিন্ রাজ্যে চাকরির সন্ধান করতে যাওয়ার সংখ্যাটা কম নয়। ভাতা-নির্ভরতার পাশাপাশি, অনেকেই চাইছেন স্থায়ী আয়। এই কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ তুলছেন অনেকেই। জানাচ্ছেন, ‘বেশি কথা’ বলা যায় না। কোনও এলাকায় বিরোধীরা জিতলে সেখানে বন্ধ হয় পরিষেবা। আবাস প্রকল্পে কড়ি না খসালে মেলে না বরাদ্দ। অবশ্য ভোটের আবহে সাম্প্রতিক সরকারি বরাদ্দে সেই চাহিদা নেই। জল জীবন মিশনের কাজ এগোলেও জলের জোগান অনিয়মিত। এই কেন্দ্রে এ বার রাজনৈতিক বিন্যাসও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তৃণমূল-বিজেপি মূল প্রতিপক্ষ হলেও আরএসপি এবং আইএসএফ প্রার্থী দিয়েছে। ফলে, ভোট কাটাকাটিতে কার সুবিধা হবে, তা নিয়ে রয়েছে চর্চা। সেই চর্চা আরওজোর পেয়েছে শাসকদলের আদি-নব্য দ্বন্দ্বে।
বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সর্দারের অভিযোগ, “আইনশৃঙ্খলার সমস্যা, ভোট লুট, সন্ত্রাস মানুষ ভোলেননি। এখনও ভয়ের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। প্রথম দফার ভোট শান্তিপূর্ণ হলে মানুষ আরও নির্ভয়ে ভোট দেবেন। স্বাস্থ্য-শিক্ষা-পরিবহণ-পরিকাঠামো-চাকরির অভাব আছে। আমরা সে সবের উন্নতি নিশ্চিত করব।” অবশ্য তৃণমূল প্রার্থী নীলিমা বিশালের প্রতিক্রিয়া, “এত শান্তিপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র রাজ্যে নেই। বিরোধীরা অপপ্রচার করছে। সরকারি উদ্যোগে শিক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট ভাল। ২০১১ সালের আগের তুলনায় এখন অনেক ভাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। মানুষের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু রাজ্যের আয় সীমিত। বহু সিভিক, আশা-অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী নিয়োগ হয়েছে। তুলনামূলক ভাবে কর্মসংস্থানও বেড়েছে।”
এর সঙ্গে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। এক-একটি বুথ এলাকায় সেই ঘটনা ভোটার-বিন্যাস বদলে দিয়েছে অনেকটাই। তাই সব ধরনের সমীকরণের মধ্যে কোনটি কার পাল্লা ভারী করবে, তা নিশ্চিত হবে ২৯ এপ্রিলের ভোটে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)