E-Paper

শোকের জ্বালা সয়ে মন বদলে ফেলেছে জাফরাবাদের সেই বাড়ি

ঠিক এক বছর পরের জাফরাবাদ। বহিরঙ্গে তফাত অনেক! আধা-সেনার ছাউনির কয়েক হাত দূরে সেই সজনে গাছটা অবশ্য এখনও দাঁড়িয়ে।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫১
জাফরাবাদের বাড়িতে নিহত হরগোবিন্দ দাসের স্ত্রী।

জাফরাবাদের বাড়িতে নিহত হরগোবিন্দ দাসের স্ত্রী। নিজস্ব চিত্র।

ভাঙা দরজা সরিয়ে নতুন দরজা লাগিয়ে দিয়েছিল প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী পাড়ায় আসতে পারেন বলে। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর পা আর এখানে পড়েনি। তবে সেই রাস্তা এখন আগাপাশতলা সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে মোড়া! বাড়ির অদূরে সিআরপিএফের অস্থায়ী ছাউনি। বাড়ির দুয়ারে নতুন সংযোজন কোলাপসিবল গেট।

ঠিক এক বছর পরের জাফরাবাদ। বহিরঙ্গে তফাত অনেক! আধা-সেনার ছাউনির কয়েক হাত দূরে সেই সজনে গাছটা অবশ্য এখনও দাঁড়িয়ে। রক্তাক্ত চন্দন দাসের শেষ কয়েকটা হৃদ্স্পন্দন যে গাছের তলায় নিভে গিয়েছিল। বাড়ির দরজার আরও কাছে পড়েছিল চন্দনের বাবা হরগোবিন্দ দাসের কোপানো শরীর। ছেলেকে দেখবেন, না স্বামীর কাছে দৌড়বেন, সে দিন ভেবে পাচ্ছিলেন না যিনি, তিনি ওই বাড়ির ভিতরে এখনও বিহ্বল। তবে বাইরের মতো অন্তরেও বদল এসে গিয়েছে!

‘‘ছোট নাতিটা ছুটে এসে বলল, এ দিকে দাদু, ও দিকে মামা পড়ে আছে। হামলাটা সবে থেমেছে তখন। পড়িমরি করে আমরা ছুটে বেরিয়েছিলাম। আর কিছু তেমন মনে পড়ে না। তবে চোখের সামনে যা দেখেছি, ভুলব কী করে?’’ আঁচলের হাল্কা ছোঁয়ায় চোখ সামলে বলছেন বৃদ্ধা। কী দেখেছিলেন? কারা এসেছিল, চিনতেন? ‘‘কী করে বলব? আমরা তো বাড়ির ভিতরে। দরজাটা মেরে ভেঙে ফেলল। একটা ইট বা পাথর কিছু ছুড়েছিল। ওঁর (স্বামী) মাথায় লেগে রক্ত পড়ছিল। দরজার সামনে থেকে টেনে নিয়ে গেল ওরা। বড় ছেলেটা বলল, তোমরা ভিতরে যাও। বলে বেরিয়ে গেল। আর ফিরল না। সে দিন ওদের যে বলব সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে যেতে, সেটাও পারিনি। কেন যে বললাম না!’’ এক দমে বলে মাথা নিচু করে থাকেন একই দিনে স্বামীহারা ও পুত্রহারা মহিলা। পরপর লাগোয়া ছাদ দিয়ে পালানোর রাস্তা ছিল বলে তাঁর কেবলই মনে হয়।

পারুল দাস আপাতত জাফরাবাদের বাড়িতে ভাঙা সংসার সামলাচ্ছেন উচাটন মন নিয়ে। তাঁর দুই বড় নাতিকে (নিহত চন্দনের দুই ছেলে) ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের আশ্রমিক স্কুলে। বড় বউমা আপাতত নিমতিতায় বাপের বাড়িতে। ‘‘নাতিদু’টো ওখানে এখন নিরামিষ খেয়ে থাকে। মাছ খাওয়া চলে না।’’ পড়ন্ত বেলায় উথলে ওঠে ঠাকুমার স্নেহ।

ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদের নামে হিংসার ঘটনার বলি যে বাড়িতে, এই ভোটের মরসুমে সেই ঠিকানায় আনাগোনা বাড়বেই। ঘটনার পরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দুই স্বামীহারা মহিলাকে বন্দোবস্ত করে নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতায়। বিধাননগরে ২২ দিন কাটিয়ে তাঁরা ফিরে এসেছেন। ধুলিয়ানের আদি বিজেপি নেতা এবং শমসেরগঞ্জের প্রার্থী ষষ্ঠীচরণ দাস এখন যোগাযোগ রাখেন পরিবারের সঙ্গে, পারুলকে একটি অনুষ্ঠানে সঙ্গে করে নিয়েও গিয়েছিলেন। ষষ্ঠীচরণের দাবি, দাস পরিবার এখন তাঁদেরই লোক। বাড়ির ছাদে বিজেপির ধ্বজা উড়িয়ে তার প্রমাণও টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাড়ির আর এক পাশে এক টুকরো কংগ্রেস পতাকা কেমন যেন বেমানান! কংগ্রেস প্রার্থী, বিড়ি সংস্থার মালিক নাজমে আলমের বাড়ি কয়েকশো মিটার দূরে। তিনি ঘুরে গিয়েছেন, ভোট চেয়েছেন। ওই পরিবারের প্রতি তিনি সহমর্মী। ঘটনার পরে কংগ্রেস নেতৃত্ব যে ছুটে এসেছিলেন, মনে করাচ্ছেন সেই কথাও। হরগোবিন্দ যে দলের লোক বলে পরিচিত ছিলেন, সেই সিপিএম শমসেরগঞ্জের লড়াই ছে়ড়ে দিয়েছে আইএসএফের হাতে! পারুলও বলেন, ‘‘মীনাক্ষী (মুখোপাধ্যায়) এসেছিল। কিন্তু তার পরে যা করার, শুভেন্দুবাবুই করেছেন।’’

শমসেরগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের এ বার নতুন প্রার্থী নূর আলম। শাসক দল বলে ‘সমাজসেবী’, লোকে চেনে বিড়ি মালিক বলে। তাঁর দলবল এই তল্লাটে এখনও আসেনি। ধুলিয়ানের তৃণমূল নেতা মহম্মদ পারভেজ আলম (পুতুল) অবশ্য বলেন, ‘‘সে দিন অন্যায় হয়েছিল। পুলিশের ভূমিকা একেবারেই ঠিক ছিল না। কিন্তু তার পর থেকে এলাকার লোকের পাশে তৃণমূলই আছে। এসআইআর-এও তৃণমূল লড়ছে।’’

পারুলের মন এতে মানে না। তাঁর কথায়, ‘‘এত লোকের নাম কাটা গিয়েছে শুনছি ভোটার তালিকা থেকে। আমাদের নাম যখন আছে, এই শরীর নিয়েও ভোটটা দিতে যাব।’’ কী চাইবেন ভোটে? ‘‘এই সরকারটা যাওয়া দরকার। সে দিন আমাদের কত ফোন, কত অনুরোধেও পুলিশ কয়েক ঘণ্টা কিচ্ছু করেনি। পরে কিছু লোককে গ্রেফতার করেছে। আর আমাদের বাড়ি এসে অপহরণের মিথ্যে অভিযোগে সই করতে বলেছে! এগুলো ভুলে যাব না।’’ প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিপুরে কী বলে গিয়েছেন, শুনেছেন? ‘‘এত সব জানি না। শুভেন্দুবাবুর দলই আমাদের দেখছে এই দিনগুলোয়…।’’

বাড়ি থেকে রাস্তায় এগিয়ে দিতে দিতে হরগোবিন্দ-পারুলের ছোট ছেলে সমর্থও বলছিলেন, ‘‘অনেক কিছু তো হল। এ বার একটু বদল হোক।’’

শোকের জ্বালায় মন বদলে গিয়েছে জাফরাবাদের চিলতে মহল্লায়!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Samsherganj

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy