ভোটগণনা শুরু হওয়ার আগের রাতে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে দলকে নির্দেশ দিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের রাত জেগে স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার ডাক দিয়েছেন তিনি। রবিবার সন্ধ্যায় ভবানীপুরের কাউন্টিং এজেন্টদের নিয়ে কালীঘাটে নিজের বাড়িতে বৈঠক সেরেছেন মমতা। প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন নিজের আসনের কাউন্টিং এজেন্টদের। তার পরেই রবিবার গভীর রাতের দিকে রাজ্য জুড়ে দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা দিলেন তৃণমূলনেত্রী।
সমাজমাধ্যম পোস্টে মমতা লিখেছেন, “সতর্ক থাকুন। পাহারা দিন। রাত জাগুন। অভিযোগ করুন।” তৃণমূলনেত্রীর বক্তব্য, গণনার আগের রাতে বিভিন্ন জায়গায় পরিকল্পিত ভাবে লোডশেডিং করে দেওয়া হচ্ছে বলে খবর পেয়েছেন তিনি। কলকাতার ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র থেকে শুরু করে হুগলির শ্রীরামপুর, নদিয়ার কৃষ্ণনগর, পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম থেকে এই ধরনের অভিযোগ উঠে আসছে বলে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন তৃণমূলনেত্রী। তিনি আরও লেখেন, এই সব জায়গা থেকে দফায় দফায় লোডশেডিং, সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। স্ট্রংরুমে গাড়ি যাতায়াত করছে বলেও দাবি মমতার।
এ অবস্থায় দলের সকল কর্মীকে রাত জেগে স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার ডাক দিয়েছেন তিনি। উদাহরণ হিসাবে মমতা নিজের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি যে ভাবে রাত জেগে সমস্ত বিষয়ের ওপর নজর রাখছি, আপনারাও রাত জেগে স্ট্রংরুমে জনগণের ভোট পাহারা দিন। কোথাও কোনও সন্দেহজনক পরিস্থিতি কেউ সৃষ্টি করলে, তাদের ঘিরে ধরুন। সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করুন এবং সিসিটিভি ফুটেজ দাবি করুন। এই সমস্তটাই বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে করা হচ্ছে।”
ঘটনাচক্রে, রবিবার রাতেই ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার মনিটর নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন বেলেঘাটার তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষ। সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন তিনি (ওই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। ভিডিয়োয় সিসি ক্যামেরার মনিটর দেখা যাচ্ছে, যাতে বেশ কিছু স্ক্রিন কিছু ক্ষণের জন্য কালো হয়ে গিয়েছিল। দাবি করা হচ্ছে, সেটি ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের স্ট্রংরুমের সিসি ক্যামেরার মনিটর। ভিডিয়োটি পোস্ট করে কুণাল লিখেছেন, “সিসিটিভির স্ক্রিন কালো। ছবি নেই। ভেতরে কী হচ্ছে? স্ক্রিনে কিছু নেই কেন? ‘নো ভিডিয়ো’ কেন লেখা এই রাতে?” এই পরিস্থিতির মধ্যেই এ বার রাজ্য জুড়ে সর্বত্র দলীয় কর্মীদের স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন তৃণমূলনেত্রী।
দ্বিতীয় দফার ভোটের পর থেকেই ‘স্ট্রংরুমের নিরাপত্তা’ নিয়ে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে চাপানউতর সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের স্ট্রংরুমের বাইরে অবস্থান শুরু করেছিলেন কুণাল এবং শ্যামপুকুরের তৃণমূল প্রার্থী শশী পাঁজা। ওই রাতেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে পৌঁছে গিয়েছিলেন মমতা। তাঁর আসন ভবানীপুরের ‘স্ট্রংরুম’ করা হয়েছে এখানেই। প্রায় চার ঘণ্টা সেখানে ছিলেন মমতা। তৃণমূলনেত্রীর দাবি, স্ট্রংরুম ‘পাহারা’ দিয়েছেন তিনি। সেখান থেকে বেরিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেন। মমতা জানিয়েছিলেন, মানুষের দেওয়া ভোট লুট করার চেষ্টা হলে তিনি ‘জান দিয়ে’ লড়বেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে সাখাওয়াত মেমোরিয়ালের ‘স্ট্রংরুমে’ মমতা একাই নন, উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচনী এজেন্ট সূর্যনীল দাসও। শুভেন্দু নিজেই সেই ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। তাঁর দাবি, মমতা যত ক্ষণ সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের স্ট্রংরুমের কাছে হাজির ছিলেন, বিজেপির নির্বাচনী এজেন্ট সূর্যনীলও নিজে উপস্থিত থেকে তৃণমূলনেত্রীকে ‘কড়া নজরদারির’ মধ্যে রেখেছিলেন।
গণনা পর্ব শুরু হওয়ার আগে স্ট্রংরুমের পাহারা ঘিরে এই চাপানউতরের মাঝেই পর পর দু'দিন দু’টি বৈঠক সেরেছেন মমতা। প্রথমে শনিবার দলের কাউন্টিং এজেন্টদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিলেন মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই বৈঠকে দলের সমস্ত প্রার্থী এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও যোগ দিয়েছিলেন। তৃণমূল সূত্রে জানা যায়, ভোটগণনা নিয়ে কাউন্টিং এজেন্টদের একগুচ্ছ নির্দেশ দেন মমতা-অভিষেক। এর পরে রবিবার সন্ধ্যায় ভবানীপুর আসনের কাউন্টিং এজেন্টদের নিয়েও কালীঘাটের বাড়িতে বৈঠকে বসেন তিনি। গণনার দিন কী করতে হবে, কী করা চলবে না— সে বিষয়ে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন মমতা। সূত্রের খবর, বৈঠকে মমতা জানিয়েছেন, জয় নিয়ে তিনি নিশ্চিত। তবে প্রথম দিকে বিপক্ষ শিবির জিতছে— এমনটা দেখানো হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। এই অবস্থায় সকলকে তিনি বলেছেন, “শেষ পর্যন্ত গণনা টেবিল ধরে রাখবেন। দেখবেন শেষে আমরাই জিতেছি।”