E-Paper

নাম তুলবেন কী করে, জানেন না ওঁরা

এত দিন ভোট দিয়েছেন। এ বারে নাম নেই। এই প্রৌঢ়াও জানেন না, এখন কী হবে। ক্ষীণ গলায় বললেন, ‘‘ভোটটা দিতে পারব তো?’’

দেবাশিস চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৬
বকুল ঝা। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক

বকুল ঝা। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক

বকুল ঝা-কে চেনেন?

খুব ছোটবেলায় সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিলেন বনগাঁয়। বিয়ে হয় বিহারে। এখন ফের বাপের বাড়ির এলাকার বাসিন্দা। নিম্নবিত্ত বকুল এত কাল ভোট দিয়েছেন। এ বারে তাঁর নাম কাটা গিয়েছে। ‘‘২০০২-এ আমার নাম ছিল না এখানে। তবে বাবা-মায়ের নাম ছিল। জমির দলিলও ছিল। কিন্তু বিএলও জিজ্ঞেস করলেন, দাদুর দাদুর নাম কী? আমি দাদুর বাবার নাম পর্যন্ত বলেছি। তাও...,’’ থেমে থেমে কথাগুলো বললেন বকুল। তার পরে বাড়ি ফিরে গেলেন। অসুস্থ ছেলেকে দরজা বন্ধ করে রেখে এসেছেন যে!

চেনেন অনিমা সাঁতরা-কে?

বাপের বাড়িতে ভোটার তালিকায় নাম ছিল। বিয়ে হয়ে বনগাঁয় চলে আসেন। ২০০২ সালে বাবা মেয়ের নাম কাটিয়ে দেন সে বাড়ির এলাকা থেকে। কিন্তু সন্তান, সংসার সামলে শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় তখন আর নাম তোলা হয়নি অনিমার। পরে নাম উঠেছে, ভোটও দিয়েছেন। কিন্তু এ বারে তাঁর নাম বাদ। বাদ স্বামী, ছেলেমেয়ের নামও।

মানসী হালদার?

এত দিন ভোট দিয়েছেন। এ বারে নাম নেই। এই প্রৌঢ়াও জানেন না, এখন কী হবে। ক্ষীণ গলায় বললেন, ‘‘ভোটটা দিতে পারব তো?’’

ঘরভর্তি ভিড়ের মধ্যে প্রশ্নটা ঘুরতে থাকে। জনা দশ-বারো রয়েছেন তখন ঘরে। দু’জন পুরুষ। বাকিরা মহিলা। সকলেই মতুয়া। পাঁচ বছর আগে সম্ভবত এঁদেরই অনেকের ভোটে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়া। দু’বছর আগে এঁদের ভোটে জিতেই কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন শান্তনু ঠাকুর। এখন ভোটহারা হয়ে এঁদের আশঙ্কা, দেশহীন না হয়ে পড়েন!

কেন দেশহীন? সুপ্রিম কোর্ট তো বলেই দিয়েছে, এসআইআরের সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই। ওঁরা বলেন, ‘‘আজ যদি ব্যাঙ্কে কেওয়াইসি করতে গিয়ে ভোটার কার্ড চায়? ব্যাঙ্কের বই বন্ধ হয়ে যাবে না তো? তখন কী করব? যে সব সরকারি সুবিধা পাই, সে সব বন্ধ হবে না তো!’’

চৈত্রের ঘুঘু ডাকা দুপুরে, বনগাঁ পুরসভায় ১১ নম্বর ওয়ার্ডের দেবগড়ের সেই অপরিসর ঘরটিতে আচমকা সবাই চুপ। তার পরে গুনগুন স্বর ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দা সন্তোষ মজুমদার বলেন, ‘‘যে নথি জোগাড় করা কঠিন, কেওয়াইসি-তে সব সময় সেটাই চায়। এ বারে তো ব্যাঙ্ক থেকে পাসপোর্ট, সব জায়গায় ভোটার কার্ড আর ভোটার তালিকাই দেখতে চাইবে।”

এই ওয়ার্ডে বাদ ও বিচারাধীন মিলিয়ে সংখ্যাটা সাড়ে সাতশো প্রায়। তার মধ্যে মতুয়াই সাতশোর কাছাকাছি। নাম যাঁদের বাদ গিয়েছে, তাঁদের অনেকেরই এই দেশে জন্মকর্ম। বাপ-দাদা এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। সন্তোষ বলছিলেন, “এখানে প্রান্তিক মানুষজনের বাস। নথি তৈরি করতে তাঁদের অনেক সময় লেগেছিল। আবার ২০০২ সালের বন্যায় বহু মানুষের নথিই ভেসে গিয়েছে। নষ্ট হয়েছে।” সঙ্গীতা বিশ্বাস, সবিতা মণ্ডলরা বলছিলেন, “আমরা এখন সন্তানদের নথি তৈরি করে রাখি। কিন্তু আমাদের বাবা-মায়েরা তখন সচেতন ছিলেন না। জন্মের শংসাপত্রই বা কার আছে এখানে!”

আর মাধ্যমিকের মার্কশিট? এ ওর মুখ চাইছেন। সন্তোষ বললেন শেষে, “তখন মেয়েরা সব বাড়িতেই পড়ত। মাধ্যমিকই দেয়নি। মার্কশিট কোথায় পাবে?”

এই অবস্থায় নোটিস পেয়ে যে যাঁর মতো নথি দিয়েছিলেন। গীতা দাস বললেন, “আধার কার্ড, প্যান কার্ড তো আছেই, সঙ্গে বাড়ির দলিলও দিয়েছি। সেটা স্বামীর নামে। কিন্তু আমার, বরের, ছেলের— সকলের নাম বাদ গিয়েছে।” প্রায় খড়কুটো ধরার মতো বললেন, “কী করব, বলে দিন!”

বিচারাধীন থেকে নাম উঠেছে অপর্ণা বিশ্বাসের। কিন্তু ছেলেমেয়ের নাম কাটা গিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, এ বারে ওদের কোনও বিপদ হবে না তো! ঘরে আরও যাঁরা উপস্থিত তখন, সকলেই খুঁজছেন তালিকায় নাম তোলার পথ।

সিএএ বা নতুন নাগরিক আইনে কি কিছু সাহায্য হতে পারে? বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের নাগরিকত্ব পেতে এই আইনে আবেদন করতে বলছে কেন্দ্রীয় সরকার। দ্রুত নিষ্পত্তির ইঙ্গিতও দিয়েছে অমিত শাহের মন্ত্রক। কার্যক্ষেত্রে কী হচ্ছে? সিএএ-তে আবেদন করেছেন অসিত বিশ্বাস। তবে তার নিষ্পত্তি কবে হবে, জানেন না।

এই ওয়ার্ড থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গাইঘাটায় মতুয়া ঠাকুরবাড়ি প্রাঙ্গণে একটি সিএএ সহায়তা কেন্দ্র দেখা গেল। দুপুরে ঝাঁপ বন্ধ। পাশেই অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসংঘের ‘গদিঘর’ খোলা। সেই অফিস থেকে ‘হিন্দুত্ব ধর্মীয় সার্টিফিকেট’ দেওয়া হয়। কিন্তু সে শংসাপত্র কি ভোটার তালিকার নাম রাখার কাজে লাগবে?

সন্তোষ বলছিলেন, “শুনেছি লক্ষাধিক আবেদন পড়েছে সিএএ-র জন্য। কিন্তু ক’টা গৃহীত হয়েছে?” পরে চাকদহে অল ইন্ডিয়া গোঁসাই পরিষদের সম্পাদক রঞ্জিৎ বাইন প্রশ্ন তুললেন, “যে মানুষগুলোর জন্মকর্ম এ দেশে, সিএএ-র জন্য তাদের বলতে হবে, তারা বাংলাদেশি? কেন্দ্রে যদি কাল সরকার বদলে যায়, অন্য কোনও দল আসে, তখন তারা যদি আইন বদলায়, এই লোকগুলো নতুন করে বিপদে পড়বে না তো?”

ভোটার তালিকায় নাম তোলার দ্বিতীয় পথ, ফর্ম ৬ জমা দেওয়া। তা নিয়ে বিস্তর বিভ্রান্তি রয়েছে সর্বত্র। সন্তোষ, সবিতা, অনিমাদের কথায়, ১৫ মার্চের পরে আর ফর্ম-৬ জমা নিচ্ছে না কমিশন। আগে যাঁরা ফর্ম জমা করতে পেরেছেন, তাঁরাও জানেন না, সেই আবেদন এক পা-ও এগিয়েছে কি না।

এই নিয়ে কমিশনের দিক থেকে কোনও প্রচার ছিল না এত দিন। সম্প্রতি রাজনৈতিক ভাবে ফর্ম-৬ জমা নেওয়া নিয়ে চাপানউতোর শুরু হতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কাগজের নথিতে ফর্ম-৬ গ্রাহ্য হয় না। তা অনলাইনে নথিবদ্ধ করতেই হবে আইন অনুযায়ী। কোথায়, কত জন, কী ভাবে সেই ফর্ম জমা করলেন বা করতে পারলেন? সিইও মনোজ আগরওয়াল সম্প্রতি বলেন, “কত নথি প্রতি দিন জমা পড়ছে, তার উপর নজর রাখা সম্ভব নয়।”

সাধারণ মানুষ, যাঁরা এত দিন ভোট দিয়ে এসেছেন, বিশেষ করে মতুয়ারা, তাঁরা এই সব রাজনৈতিক চাপানউতোরের বাইরে। তাঁরা এই পদ্ধতি এত দিন জানতেনও না।

ভোটার-তালিকায় নাম তোলা নিয়ে এই উদ্বেগ শুধু বনগাঁয় নয়। রাজ্যের এই সীমান্তবর্তী শহরে দাঁড়ালে দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে পরপর এমন বিধানসভা কেন্দ্র আছে, যেখানে মতুয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্ক। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ উত্তর, দক্ষিণ, বাগদা, গাইঘাটা তো আছেই, পাশের জেলা নদিয়ায় আছে এমন আরও গোটা সাতেক আসন। এই সব আসনে বিজেপির আধিপত্যের অন্যতম কারণও মতুয়া ভোট নিজেদের পক্ষে রাখা।

এ বারে এসআইআর প্রক্রিয়ার পরে দেখা যাচ্ছে, এই সব কেন্দ্র থেকেই মতুয়াদের বহু নাম হয় বাদ গিয়েছে, নয়তো বিচারাধীন। ফলে ‘দেশহীন’ হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে একদা ও-পার থেকে চলে আসা ছিন্নমূল মানুষদের মধ্যে। আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প নিয়েও।

সন্তোষ বলছিলেন, “কেউ যাতে আত্মহত্যা না করে, সে জন্য সবাইকে বোঝাচ্ছি।” পাশ থেকে এক জন বলে উঠলেন, “কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি, তাকে কী হয়, কে বলতে পারে!”

(শেষ)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR West Bengal Assembly Election

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy