পরিকল্পনা থেকে নজরদারি—সরকারি ‘সার্কিট হাউসে’ থেকে নয়, কমিশনের চোখ-কান হয়ে মাঠে নেমে তা কার্যকর করতে হবে পর্যবেক্ষকদের। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ, ভোট পরিচালনার দায়িত্ব যেমন কার্যকর করবেন জেলাশাসক এবং রিটার্নিং অফিসারেরা, তেমনই সেগুলির নজরদারি এবং পরিকল্পনায় ভূমিকা থাকতে হবে পর্যবেক্ষকদের। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন বা ব্যবহারের পরিকল্পনা শুধুমাত্র থানার উপর না ছাড়তেও বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর। স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, জেলাস্তরের আধিকারিকেরা যেমন কমিশনের নজরে থাকছেন, তেমনই তাদের নজর থাকবে পর্যবেক্ষকদের ভূমিকার উপরেও। কর্তব্যে গাফিলতিতে শাস্তির প্রশ্নে জেলা-আধিকারিক থেকে পর্যবেক্ষক, আলাদা করা হবে না কাউকেই।
এ বারই প্রথম এক একটি বিধানসভায় একজন করে সাধারণ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এ পর্যন্ত ২৯৪ জনের মধ্যে ২৯১ জনই কাজে যোগ দিয়েছেন। বাকিরাও আসছেন শীঘ্রই। পুলিশ পর্যবেক্ষক থাকছেন ৮৪ জন এবং আয়-ব্যয়ের উপর নজর রাখতে ‘এক্সপেন্ডিচার’ পর্যবেক্ষকের সংখ্যা এ রাজ্যে একশো জন। ভোটমুখী পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের পর্যবেক্ষক সংখ্যা সর্বাধিক। অতীতের ভোটগুলিতে মনোনয়নের সময় থেকে পর্যবেক্ষকেরা দায়িত্ব নিতেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁদের সক্রিয় থাকতে দেখা যেত না। তা নিয়ে বরাবর বিরোধীরাই সরব থেকেছেন। এমনকী, অতীতের একটি ভোটে শীর্ষ এক পর্যবেক্ষক রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন বলেও যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু এ বার এখনও পর্যন্ত পর্যবেক্ষক ব্যবহারের ধরন অনেকটাই বদলেছে কমিশন। ভোট ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যে তথা জেলায় জেলায় যেতে শুরু করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকেরা (ভিন রাজ্যের আইএএস-আইপিএস অফিসার)। এত আগে থেকে তাঁদের আনার অর্থ—এলাকা, তার প্রকৃতি, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা, অতীতের ভোটে হিংসা-অশান্তি-ভয়ভীতি দেখানোর ইতিহাস সম্পর্কে প্রত্যেককে বুঝিয়ে দেওয়া। সমন্বয়ের প্রশ্নে জেলাশাসকদের সঙ্গে তাঁদের পরিচিতি বাড়ানোও এর আরেকটি লক্ষ্য।
ইতিমধ্যেই কমিশন প্রত্যেক পর্যবেক্ষকের সঙ্গে বৈঠক করে স্পষ্ট করে দিয়েছে, এলাকায় এলাকায় সাধারণ ভোটার, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলতে হবে। রাস্তায় থেকে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নজর রাখতে হবে ভোট-প্রস্তুতির উপর। কোথায় কেমন আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি, পুলিশ এবং প্রশাসনের সক্রিয়তা, অতীত-অশান্তির ঘটনা বুঝে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন, বাধাদান, হুমকি দেওয়ার সম্ভাবনা কোথায় কোথায় রয়েছে, তা বুঝে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, টহল এবং ব্যবহারের কৌশল তৈরি করতে হবে তাঁদেরই। আগে থানাগুলির দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকেরাই প্রধানত এই কাজটি করে দিতেন। এ বার তাতে রাশ টানা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষকে তাঁদের এলাকায় কে পর্যবেক্ষক রয়েছেন, তার সবিস্তার তথ্য জানানোর কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসনগুলি। তাতে কোন বিধানসভা কেন্দ্রের দায়িত্বে কোন পর্যবেক্ষক রয়েছেন, তাঁর ফোন এবং ই-মেল নম্বর, সশরীরে যে কেউ অভিযোগ জানাতে কোথায় এবং কখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন—এমন সব তথ্য থাকছে সবিস্তারে। ভোটের প্রচার চলাকালীন রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা, অশান্তি, তা রুখতে প্রশাসন কতটা সক্রিয়—সবই নজরে রাখতে হবে পর্যবেক্ষকদের।
ইতিমধ্যেই কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, বুথ-জ্যাম, এলাকায় বাধা, ভোটকেন্দ্রের মধ্যে গোলমাল বা অসাধু কাজ, ভোটযন্ত্রকে কব্জা করার মতো ঘটনা ঘটলে সেই কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের পথে হাঁটবে তারা। এ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টের আইনি গুরুত্ব অনেক। ফলে পর্যবেক্ষকেরা কমিশনের সেই বিধি মেনে কাজ করতে বাধ্য থাকবেন। রাজ্যের বিশেষ পর্যবেক্ষক এবং পুলিশ পর্যবেক্ষকের অধীনে সিনিয়র আধিকারিকদের একটি করে পৃথক দল থাকবে। তাঁরা জেলাস্তরে কর্মরত পর্যবেক্ষকদের কাজের উপর নজর রাখবেন এবং মূল্যায়ন করবেন। বিশেষ কন্ট্রোলরুম তৈরির প্রস্তুতিও চলছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) কার্যালয় এবং জেলাস্তরে। কন্ট্রোলরুম থাকবে দিল্লির নির্বাচন সদনেও। ভোটকেন্দ্রের ভিতর-বাইরে সর্বক্ষণের জন্য সচল ক্যামেরা, টহলদারি গাড়িগুলির মাথায় সব দিকের ছবি নেওয়ার প্রযুক্তিযুক্ত ক্যামেরার ‘ফিড’ পাবে কন্ট্রোলরুম। কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়িগুলি কোথায় কখন ঘুরছে, তা নজরে রাখতে সেগুলিতেও জিপিএস এবং ক্যামেরা বসানো থাকবে। বাহিনীকে ‘বডি-ক্যামেরা’ দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে কমিশন। অতীতের ভোটগুলিও অশান্তি-হিংসা-প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু বাস্তব বলছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি। কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকে পর্যবেক্ষক—সঠিক সময়ে দেখা মেলেনি কারও। ফলে হিংসা, রক্তপাত, প্রাণহানী ঠেকানো যায়নি। তাই এ বার কমিশন সেই অভিযোগগুলির থেকে মুক্ত হতে পারবে কি না, তা অবশ্যবোঝা যাবে শীঘ্রই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)