Advertisement

জোট করে মিলেছিল শূন্য! আলাদা লড়ে পাঁচ বছর পরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কংগ্রেস এবং সিপিএম দু’পক্ষই আসন জিতেছে মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা থেকে। কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছে রানিনগর এবং ফরাক্কা। সিপিএম জিতেছে ডোমকল আসনে।

সায়ন ত্রিপাঠী

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ২১:৪১

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গত ১০ বছরে পর পর দু’টি বিধানসভা ভোটে আসন সমঝোতা করে লড়েছে কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট। কিন্তু এ বার তা হয়নি। ভোটের ফল বলছে, আলাদা ভাবে লড়াই করে সামান্য হলেও দু’পক্ষেরই লাভ হয়েছে। কংগ্রেস জয়ী হয়েছে দু’টি আসনে। অন্য দিকে, সিপিএম একটি এবং তাদের সহযোগী আইএসএফ একটি আসনে জিতেছে।

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কংগ্রেস এবং সিপিএম দু’পক্ষই আসন জিতেছে মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা থেকে। কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছে রানিনগর এবং ফরাক্কা। সিপিএম জিতেছে ডোমকল আসনে। অন্য দিকে ২০২১-এ সিপিএম এবং কংগ্রেসের সমর্থনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে জেতা আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি আবার জিতেছেন সেখানে। ফল বলছে, মুর্শিদাবাদের কয়েকটি আসনে বাম এবং কংগ্রেসের পাওয়া ভোট জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের থেকে বেশি। সামগ্রিক ভাবে শতাংশের হিসাবে বাম জোট পাঁচ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে প্রায় চার শতাংশ ভোট।

শুধু ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট নয়, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও জোট গড়ে লড়েছিল কংগ্রেস এবং বামেরা (এমনকি, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটেও কংগ্রেস তার জেতা দুই আসন, বহরমপুর এবং দক্ষিণ মালদহে সিপিএমের সমর্থন পেয়েছিল)। কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাজ্যের ছ’টি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে একা লড়তে গিয়ে কংগ্রেসের ফল হয়েছিল শোচনীয়। তারও পরে আবার ২০২৫ সালের জুন মাসে কালীগঞ্জে বিধানসভা উপনির্বাচনে বামেদের সমর্থনে প্রার্থী দিয়ে আগের চেয়ে তুলনায় ভাল ফল হয়েছিল কংগ্রেসের। আবার কংগ্রেসের সাহায্য ছাড়াই ২০২২ সালের এপ্রিলে বালিগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপিকে পিছনে ফেলে দ্বিতীয় হয়েছিল সিপিএম।

এই পরিস্থিতিতে এ বার বিধানসভা নির্বাচনে একলাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কংগ্রেস। ফলে বামেদেরও আলাদা লড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কংগ্রেসের একটি সূত্র জানাচ্ছে, মূলত প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ’ নেতাদের দাবি মেনেই বাম-সঙ্গ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এআইসিসি। ঘটনাচক্রে, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বামেদের সঙ্গে সমঝোতার সময়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন অধীর চৌধুরী। সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের বড় অংশের সঙ্গে অধীরের যোগাযোগ ছিল ‘স্বচ্ছন্দ’। রাহুল গান্ধী-মল্লিকার্জুন খড়্গেরা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অধীরকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদ থেকে সরানোর পরেই রাজ্যে বাম-কংগ্রেস জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। কংগ্রেসের একটি সূত্র জানাচ্ছে, রাহুল-ঘনিষ্ঠ এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কেসি বেণুগোপাল এ বার নিজে কেরলে কংগ্রেসের সরকার গঠনে বেশি উৎসাহী ছিলেন। তাই পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সঙ্গে সমঝোতায় এগোতে কোনও আগ্রহই দেখাননি।

কিন্তু সমঝোতা হলে তা কতটা ফলপ্রসূ হত, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। কারণ, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জোট করে লড়েও বাম এবং কংগ্রেস ‘শূন্য’ হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর প্রথম বার এমন ঘটেছিল। এর পরে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সাগরদিঘিতে বাম-সমর্থিত কংগ্রেসপ্রার্থী হিসাবে বাইরন বিশ্বাসের জয় রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ওই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীকে ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন তৃণমূলের সুব্রত সাহা। সাকুল্যে ৩৬ হাজার ভোট পেয়ে বাম-সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন তৃতীয় স্থানে। কিন্তু সুব্রতের মৃত্যুতে খালি হওয়া সংখ্যালঘু অধ্যুষিত সাগরদিঘিতে তার দু’বছরের মাথাতেই তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রায় ২৩ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন বাইরন! ফলে একদা ‘শক্ত ঘাঁটি’ মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা ঘিরে তৈরি হয়েছিল জল্পনা। যদিও বাইরন জেতার তিন মাসের মধ্যে তৃণমূলে শামিল হয়ে সেই জল্পনা স্তিমিত করে দিয়েছিলেন। আর তাতে জল ঢেলে দিয়েছিল ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট। বামেদের সমর্থন সত্ত্বেও বহরমপুরের পাঁচ বারের কংগ্রেস সাংসদ অধীর ৮৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাস্ত হন তৃণমূলের প্রার্থী গুজরাতের প্রাক্তন ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানের কাছে! যদিও ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের তুলনায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোটের ভোট অনেকটাই বেড়েছিল। কোনও বিধানসভা আসন দখলে না থাকলেও মালদহ দক্ষিণে জিতেছিলেন কংগ্রেসের ঈশা খান চৌধুরী।

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের হিসেবে বাম-কংগ্রেস জোট এগিয়ে ছিল মোট ১২টি বিধানসভা আসনে। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত রানিনগরে এগিয়ে ছিল সিপিএম। বাকি ১১টিতে কংগ্রেস। বহরমপুর লোকসভার অন্তর্গত বহরমপুর বিধানসভা এবং জঙ্গিপুর লোকসভার অন্তর্গত সুতি এই তালিকায় ছিল। দক্ষিণ মালদহ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মুর্শিদাবাদের দুই লোকসভা আসন ফরাক্কা এবং শামসেরগঞ্জেও এগিয়ে ছিল ‘হাত’। মালদহ দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মালদহ জেলার মোথাবাড়ি এবং সুজাপুরের পাশাপাশি ওই জেলারই মালদহ উত্তর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত রতুয়া, মালতীপুর, হরিশ্চন্দ্রপুর, চাঁচোলেও ‘লিড’ ছিল কংগ্রেসের। এ ছা়ড়া উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ লোকসভার অন্তর্গত চাকুলিয়া ছিল এই তালিকায়। এর মধ্যে কতটা ভোট কংগ্রেসের, কতটা বামের সেই প্রশ্নের আংশিক জবাব মিলেছে এ বারের ভোটে। সেই সঙ্গে জল্পনায় চলে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভবিষ্যতের সমীকরণের সম্ভাবনার কথা।

Congress CPIM
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy