অসুস্থতার জন্য কেউ শয্যাশায়ী। কেউ দুর্ঘটনার কারণে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেকেরই শরীর ৮৫ বছরের বৃদ্ধের চেয়েও বেশিঅশক্ত। ষাট বা সত্তরেই বুথে গিয়ে ভোট দিতে শারীরিক ভাবে অক্ষম। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) পর্বে কোনও মতে ভোটার তালিকায় নাম তোলাতে পারলেও তাঁরা ভোটদিতে পারবেন কি? এ নিয়ে চর্চা বেড়েছে দ্বিতীয় তথা শেষদফার ভোটের আগে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে এমন ভোটার ও তাঁর পরিবারের লোকজন বলছেন, ‘‘ভোট প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বদলে কমিশন বাদ দিতেই ব্যস্ত।’’
৮৫ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে ভোট নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেই সঙ্গেই দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতা, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা এবংশারীরিক বা চলাফেরা সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বাড়ি গিয়ে ভোট নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিল কমিশন। ‘ফর্ম-৬’ পূরণ করে এই পদ্ধতিতে ভোটদানের ইচ্ছাপ্রকাশ করতে হবে ভোটারকেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু ক্ষেত্রেই ঘোষণা মতো কাজ হয়নি। বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের বড় অংশেরই অভিযোগ, ঘোষণা করেই দায়সেরেছে কমিশন। ৭০ বছরের কারও শারীরিক অবস্থা ৮৫ বছরের ব্যক্তির থেকেও খারাপ হতে পারে এবংতাঁর ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে ভোটদানের সুযোগ করে দিলে ভাল হয়— এ নিয়ে বলতে গেলেও তা শোনা হয়নি। নোয়াপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিএলও দেবাশিস বসুর দাবি, ‘‘কমিশনের প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ৭০ বছরের কারও শারীরিক অবস্থা বুথে গিয়ে ভোটদানের উপযুক্ত না-ও হতে পারে। হঠাৎ দুর্ঘটনায় পড়া বা অসুস্থকারও ক্ষেত্রেই বা কী করা হবে? কমিশন এর কোনও উত্তর দেয়নি।’’ মানিকতলা কেন্দ্রের আর এক বিএলও-র মন্তব্য, ‘‘ন্যায্য অনেকের ক্ষেত্রেই কমিশন বাড়ি গিয়ে ভোট নিচ্ছে না। সেই ক্ষোভও পড়ছে আমাদের উপরেই।’’
হঠাৎ কোনও দুর্ঘটনার কারণে ভোট দিতে না-পারার কথা সমাজমাধ্যমে লিখেছেন উত্তর কলকাতার একটি কলেজের শিক্ষিকা বর্ণালী পাইন। তিনি জানান, সিঁড়ি থেকে পড়ে মালাইচাকিতেগুরুতর চোট পেয়েছেন। ভিআইপি রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল রাতের এই ঘটনার পরে তিনি এখন ঘরবন্দি। তাঁর ভোট যাতে বাড়ি গিয়ে নেওয়া হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিএলও-কেঅনুরোধ করেছিলেন তিনি। কিন্তু কিছু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিএলও। এর পরে পরিস্থিতিজানিয়ে বাড়ি থেকে ভোট দিতে চেয়ে নির্বাচন কমিশনকে ইমেলকরেছিলেন তিনি। বাড়তি কয়েকটি তথ্য চেয়ে ইমেল আসা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। তাই এ বার আরভোট দেওয়া হবে না, ধরেইনিয়েছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, এটাই ‘বাস্তব বড়।হতবাক হই না।’ বর্ণালী বললেন, ‘‘বিএলও-র আর দোষ কী? কমিশন যে ভাবে বেঁধে দিয়েছে, সেই ভাবেই সব হচ্ছে।’’
যাদবপুরের বিএলও প্রিয়মা প্রামাণিক ঘোষ আবার জানালেন, ১২ জন প্রবীণ নাগরিক এবং এক জন বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তির বাড়ি গিয়ে ভোট করিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কম ঝক্কি হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘কমিশন বহু ঘুরিয়েছে। বয়স্ক, অসুস্থ মানুষদের তৈরি রেখে, পরে না করে দিতে হয়েছে।’’ তালিকায় ৮৫ বছরের বেশি বয়সি যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের ছাড়া কমিশন কারও কথাই যেন ভাবতে রাজি নয়— মনে করছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য দায় চাপিয়েছে সেই বিএলও-দের উপরেই। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, প্রশিক্ষণ শিবিরে এই ধরনের ভোটের ব্যাপারে বাড়তি গুরুত্ব দিতে বলাহয়েছে বার বার। সব বিএলও সব স্তরে ঠিকঠাক কাজ করেননি। তা ছাড়া, বাড়ি গিয়ে ভোট নেওয়ার কাজ মূল ভোটের দিনের আগেই হয়েযায়। এই মুহূর্তে আর কিছু করা সম্ভব নয়। এ নিয়ে ভবানীপুরের ভোটার সুলেখা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া নিয়েই যত আলোচনা চলছে। আদতে বড় অংশের মানুষকেই ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। মূল টার্গেট সেই প্রবীণেরাই।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)