E-Paper

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কোলাহলে অদৃশ্য বিশেষ ভাবে সক্ষমদের অধিকার

ভোটের আগে ফের উঠেছে প্রতিশ্রুতির ঝড়। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

সুনীতা কোলে

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৫
রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের স্থান নিয়ে আলোচনা। শুক্রবার, প্রেস ক্লাবে।

রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের স্থান নিয়ে আলোচনা। শুক্রবার, প্রেস ক্লাবে। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিটি দলই তাদের ইস্তাহারে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা— চেনা প্রতিশ্রুতির তালিকা সাজিয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই যেন এক বৃহৎ নাগরিক গোষ্ঠী অদৃশ্য— বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষেরা। তাঁদের জীবন, অধিকার, দৈনন্দিন সংগ্রাম—রাজনৈতিক ভাষ্যে কতটা গুরুত্ব পায়?

২০২৪ সালের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পাঁচ লক্ষেরও বেশি প্রতিবন্ধকতা যুক্ত ভোটার রয়েছেন। অথচ, নির্বাচনী ইস্তাহারে তাঁদের উপস্থিতি কার্যত নেই। শাসক তৃণমূল, প্রধান বিরোধী বিজেপি, কংগ্রেস— তিন দলের সাম্প্রতিক ঘোষণাপত্র খতিয়ে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট, সুসংহত নীতির উল্লেখ নেই। তৃণমূলের ইস্তাহারে শুধুমাত্র বলা হয়েছে, ৭ লক্ষ ৫৯ হাজার প্রতিবন্ধকতা যুক্ত ব্যক্তি প্রতি মাসে মানবিক ভাতা পাচ্ছেন। বিজেপির ইস্তাহারেও বরাদ্দ মাত্র একটি লাইন— ক্ষমতায় এলে ভাতা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি। কংগ্রেসের ইস্তাহারে নেই কোনও উল্লেখই। কেবল সিপিএমের ইস্তাহারে শিক্ষায় সহায়তা, গণপরিসরে চলাচলের সুবিধা, স্বনির্ভর হওয়ার জন্য স্বল্প সুদে ঋণ এবং বিশেষ কোর্স চালু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

প্রতিবন্ধকতা যুক্ত মানুষদের জন্য শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনালস (এনআইপি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে, শুক্রবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে উঠে এল ভোটের রাজনীতিতে এই নীরবতার বিষয়টিই। বিশেষ ভাবে সক্ষমদের পাশাপাশি সমাজকর্মীরাও জানাচ্ছেন, শুধু শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা নয়, প্রতিবন্ধকতা জটিল সামাজিক বাস্তবতা। সবার জন্য স্বাস্থ্য বিমা বা সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে ভাতা প্রদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কি তাঁদের বিশেষ প্রয়োজনকে সত্যিই স্পর্শ করে?— প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা। তাঁদের আরও প্রশ্ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কি যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক? গণপরিসর ও গণপরিবহণ কি হুইলচেয়ার-বান্ধব? কর্মসংস্থানের কি বাস্তব সুযোগ তৈরি হচ্ছে? এই উত্তরগুলি খোঁজার দায় রাজনৈতিক দলগুলিরও কি নেই?

অভিভাবকদের তরফে বলতে উঠে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এক তরুণের মা সুমন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুরা স্কুলে ভর্তি হলেও সেখানে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকাঠামো আছে কিনা, চাকরি পেয়ে সেখানে কাজ করার পরিবেশ আছে কিনা— এই বিষয়গুলি দেখতে হবে।’’ বিশেষ ভাবে সক্ষমদের শিক্ষার সুযোগ যাতে শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও বেশি পাওয়া যায়, সেই দাবি তুললেন বঙ্গবাসী সান্ধ্য কলেজের দৃষ্টিহীন শিক্ষক পঞ্চানন হালদার। সেই সূত্রেই উঠে আসে সরকারি স্কুলগুলিতে স্পেশাল এডুকেটরের অভাব, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা এক-দু’জন শিক্ষক নিয়ে চলার সমস্যার দিকগুলিও।

এই প্রেক্ষিতে ইস্তাহারগুলির নীরবতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপির ইস্তাহারে বলা হয়েছে, মানবিক ভাতা ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার কথা। এ দিনের সভায় বিজেপির প্রতিনিধি বিমলশঙ্কর নন্দ সেই প্রসঙ্গই তোলেন। তাঁর আশ্বাস, ক্ষমতায় এলে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। যদিও তার কোনও উল্লেখ নেই ইস্তাহারে। এ দিনের সভায় তৃণমূলের তরফে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের তরফে সৌম্য আইচ রায়ের প্রতিনিধিত্ব করার কথা থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন তাঁরা।

ভাতার গুরুত্ব মেনে নিয়েও এ দিন রাজনৈতিক দলগুলির ভাতা-কেন্দ্রিক মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললেন এনআইপি-র সম্পাদক দেবজ্যোতি রায়। তিনি বলেন, ‘‘প্রতিবন্ধী-অধিকার মানে কেবল ভাতা বা অনুদান নয়। এটি মর্যাদা, স্বনির্ভরতার প্রশ্ন। সরকারি চাকরিতে ৪ শতাংশ সংরক্ষণ রয়েছে, কিন্তু নিয়োগ কই? সমাজ আজও তাঁদের কানা-খোঁড়া হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত— সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা কোথায়? এ রাজ্যে ভাতা মাত্র ১০০০ টাকা, ২০১১ থেকে যা বাড়েনি। অথচ, অন্য ভাতার পরিমাণ বেড়েছে, নতুন নতুন ভাতা তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া, জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে এক জনও বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তি নেই। এ ক্ষেত্রেও আসন সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।’’

প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষেরা যে সমাজের অংশ, আর পাঁচ জনের মতো তাঁদেরও অধিকার সমান— এই বোধ প্রতিষ্ঠার জন্য সওয়াল করেন এসইউসিআই-এর প্রতিনিধি রাজকুমার বসাক। ভাতা-নির্ভর মনোভাব থেকে সরে এসে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে লড়াই করতে হবে, মত তাঁর। একই সুর সিপিএমের প্রতিনিধি কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্যেও। প্রতিবন্ধী-অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘‘প্রতিবন্ধী অধিকার আইন, ২০১৬-এ যা যা বলা আছে, তার বাস্তব প্রয়োগটা আগে জরুরি। আইনে বলা ছিল, অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে আধিকারিকের শাস্তি হবে, কিন্তু কোথাও তা হয় না।’’

বিশেষ ভাবে সক্ষমরা ছড়িয়ে রয়েছেন বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে, শুধু তাঁদের ভোটে বড়সড় বদলের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই কি তাঁরা ব্রাত্য? তাই কি তাঁদের মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক বা হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের মতো গুরুত্ব মেলে না? উঠে আসে এই আক্ষেপও। তার সঙ্গেই শোনা যায় ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার জেরে এই মানুষদের নানা হয়রানির কথা।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে, নাগরিক সমাজে, আদালতের দ্বারস্থ হয়ে তাঁরা নিজেদের দাবি সামনে আনছেন। নির্বাচনের এই সময়টিই হতে পারে সেই দাবিগুলিকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার উপযুক্ত মুহূর্ত। কারণ, ইস্তাহার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও। সেখানে যদি বিশেষ ভাবে সক্ষমদের কথা স্পষ্ট ভাবে না ওঠে, তবে বোঝা যায়, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁরা প্রান্তিকই রয়ে গিয়েছেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics Specially Abled

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy