যে কাজ করার কথা নয়, সরকার সেটা করেছে। আর যে দিকে অগ্রাধিকার প্রয়োজন ছিল, সে দিকে নজর পড়েনি সরকারের। নিউ টাউনে এমনই অবস্থা।
দিঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরির পরেই নিউ টাউনে দুর্গাঙ্গন তৈরি করেছে রাজ্য সরকার। অথচ নব্য উপনগরী নিউ টাউন শহরে এ পর্যন্ত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার তেমন সরকারি পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। বিশ্ব বাংলা সরণিতেছোট-বড় দুর্ঘটনা আকছার লেগে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাগ্রস্ত রোগীকে পার্শ্ববর্তী এলাকাসল্টলেকের বিধাননগর মহকুমা হাসপাতাল কিংবা কলকাতায় আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায় পুলিশ। কখনও কখনও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় রোগীর। কিন্তু নিউ টাউনে কোনও সরকারি হাসপাতাল এপর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। অ্যাকশন এরিয়া-১ এ পাঁচ কোটি টাকার একটি ৩০ শয্যার হাসপাতালের প্রকল্প গত বছরচূড়ান্ত হলেও তার কাজ বিধানসভা ভোটের আগে শুরু হবে না বলেই খবর।
সেখানকার বাসিন্দাদের সংগঠন ‘নিউ টাউন সিটিজেনস ওয়েলফেয়ার ফ্রেটারনিটি’র অভিযোগ, শহর এলাকায় কয়েকটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে। কিন্তু দুর্ঘটনার পরে জরুরি চিকিৎসার পরিকাঠামো সেখানে নেই। সম্পাদক সমীরগুপ্তের কথায়, ‘‘কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে জরুরি চিকিৎসার জন্যে জখম ব্যক্তিকে সল্টলেকে কিংবাকলকাতায় সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। কখনও কখনও পুলিশ মুমূর্ষুকে বেসরকারি হাসপাতালেনিয়ে যায়। তবে পরে সেই সবজায়গায় রোগীর পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারে না। এখানে দুর্গা মন্দির হয় অথচ হাসপাতাল তৈরিহয় না।’’
এমনই আর একটি জরুরি পরিষেবার পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রচারে নেমে পড়েছে সিপিএম। নিউ টাউনে এক সময়ে একটি শ্মশান তৈরির দাবি ওঠে। কিন্তু দূষণের আশঙ্কা থেকে শহর নিউ টাউনে সেই শ্মশান তৈরির প্রস্তাব মানতে চায়নি তৎকালীন নিউ টাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনকেডিএ)। বিকল্প হিসেবে রাজারহাট-বিষ্ণুপুর পঞ্চায়েত এলাকায় খালের পাড়ে বর্তমান হাজরাতলা শ্মশানটির পরিকাঠামো উন্নয়নের সিদ্ধান্ত হয়। ঠিক হয় শ্মশানে দু’টি বৈদ্যুতিক চুল্লি তৈরি করে সেটির কিছু সৌন্দর্যায়ন হবে। উত্তর ২৪ পরগনার বহু মানুষের উপকার হবে। কারণ বারাসত, নিউ টাউন, রাজারহাট, ভাঙড়-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মৃতদেহ সৎকারের জন্যে মানুষকে নিমতলা, রতনবাবুর ঘাটে ছুটতে হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত সেই পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। পরবর্তী কালে এনকেডিএ ওই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসে।
রাজারহাট-নিউ টাউনের সিপিএম প্রার্থী সপ্তর্ষি দেবের প্রশ্ন, ‘‘পাঁচ বছরে একটি শ্মশানের পরিকাঠামো উন্নয়ন করা গেল না? শুনেছি স্থানীয় বিধায়ক চল্লিশ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু শ্মশানের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকা প্রয়োজন। কাজেই বিধায়কের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। মানুষের স্বার্থে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করারপ্রয়োজন ছিল।’’
তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়ের অবশ্য পাল্টা দাবি, “হাজরাতলা শ্মশান বেসরকারি। সেটিকে নিয়ে ট্রাস্ট তৈরি করে ৫০ লক্ষ টাকা দিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আইন বজায় রেখে কাজ চলছে। সময় তো লাগবেই। ওখানে দু’টি চুল্লি বসবে। সিপিএম তো আগে নিউ টাউন তৈরি করেছে। তারা করেনি কেন?” উল্লেখ্য, হাজরাতলা শ্মশান রাজারহাটে। আর বাম আমলে রাজারহাটে সিপিএম নেতা ছিলেন তাপস নিজেই। এ ছাড়াও নারায়ণপুর হাসপাতালে আইসিসিইউ চালু করা এবং রেকজোয়ানি হাসপাতালে ডায়ালিসিস মেশিন বসানোর কথা তাপস জানান।
একই ভাবে ভূপৃষ্ঠের পানীয় জল এখনও পৌঁছয়নি নিউ টাউনের প্রান্তিক এলাকার সিংহভাগেই।পঞ্চায়েতের অধীন ওই সব জায়গায় জমির দাম কম হওয়ায় বিভিন্ন আবাসন সংস্থাও নিউ টাউনের ভিতরে বহুতল আবাসন তৈরি করছে। সেগুলির অধিকাংশেই ভূপৃষ্ঠের জলের ব্যবস্থা নেই। সে সব আবাসনে ভূগর্ভস্থ জলই ভরসা।
সমস্যার কথা মানছে পঞ্চায়েতগুলিও। তবে রাজারহাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রবীর করের দাবি, “জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর ভূপৃষ্ঠের জল আনার কাজ করছে। পাইপলাইন বসানো শুরু হয়েছে। মানুষ জল পাবেন। চিন্তার কিছু নেই।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)