চৈত্রের দামোদর দেখলে কে বলবে, বর্ষায় এই ক্ষীণ ধারাই ফুলেফেঁপে ওঠে! গ্রামীণ হাওড়ার ভোট-চিত্রও কি অনেকটা সে রকম? দীর্ঘদিন নিস্তরঙ্গ। কিন্তু বান এলে, তা ভাসিয়ে দিতে পারে আশপাশের এলাকা। বান কবে আসবে, সেই সমীকরণের খোঁজে বিরোধীরা। শাসকের ভরসা সংগঠন।
আপাত ভাবে গ্রামীণ হাওড়ার উলুবেড়িয়া উত্তর, উলুবেড়িয়া দক্ষিণ, বাগনান, শ্যামপুর, আমতা— এই পাঁচটি কেন্দ্রের মতো (গত বিধানসভা ভোটে সব ক’টিতেই তৃণমূল জিতেছিল, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও এগিয়ে ছিল) হলেও,উদয়নারায়ণপুর একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী। ওই পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ৩০ শতাংশ করে সংখ্যালঘু ভোট আছে। কিন্তু উদয়নারায়ণপুরে সংখ্যালঘু ভোটার মাত্র সাত শতাংশ। গত লোকসভা ভোটে উদয়নারায়ণপুরেই গ্রামীণ হাওড়ার মধ্যে সব চেয়ে বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল।রাস্তার ধারে ধারে রামনবমীর গেরুয়া ধ্বজা। বাগনান-আমতা হয়ে আসা সেই রাস্তা উদয়নারায়ণপুর পেরিয়ে গিয়েছে লাগোয়া হুগলিরতারকেশ্বরের দিকে। রাস্তায় বুক কাঁপানো ডিজে বক্স বাজিয়ে তারকেশ্বর থেকে আসছেন ভক্তেরা। তার মধ্যেই বুলডোজ়ার নিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে গেলেন বিজেপি প্রার্থী প্রভাকর পণ্ডিত। সঙ্গে গাড়ির মিছিল। তা দেখতে বাড়ির সামনে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলেনমহিলারা। গাড়ি থেকে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা আশ্বাস ছুড়ে দিচ্ছিলেন, ‘‘আমরা মাসে ৩০০০ টাকা করে দেব...।’’ মিছিল চলে যায়। কী মনে হচ্ছে? বিজেপি এলে লক্ষ্মীরভান্ডারের মতো প্রকল্পের টাকা বাড়বে? উত্তর না দিয়ে হেসে বাড়ির পথ ধরেন বুলডোজ়ার দেখতে আসা মহিলারা।
বুলডোজ়ার কেন? উলুবেড়িয়ার মনসাতলায় বিজেপির গ্রামীণহাওড়ার দফতরে বসে জেলা সাধারণ সম্পাদক উমাশঙ্কর হালদার বলছিলেন, ‘‘প্রতিপক্ষ যেমন ভাষা বোঝে, বিজেপি সেই ভাষাতেই উত্তর দিতে জানে। নিশ্চিত বদল হচ্ছে।’’ পাল্টা উদয়নারায়ণপুরের বিদায়ী বিধায়ক সমীরকুমার পাঁজা বলছেন, ‘‘বদল হবে না।কারণ, বন্যা পরিস্থিতির বদল হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, ‘‘বিশ্ব ব্যাঙ্কের টাকায় দামোদরের বাঁধ সংস্কার হয়েছে। আগে ডিভিসি ৮০ হাজার কিউসেক হারে জল ছাড়লেই এলাকায় বন্যা হয়ে যেত। এখন দেড় লক্ষ কিউসেক হারে জল ছাড়লেও বিপদ হয় না। মানুষ কাজ দেখেন।’’
দেওয়াল লিখন, পোস্টার-ব্যানারে সর্বত্র তৃণমূলের উপস্থিতি প্রকট। তার মধ্যেই কয়েক জনসঙ্গীকে নিয়ে মাঝদুপুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন উদয়নারায়ণপুরের সিপিএম প্রার্থী ষষ্ঠী মাজি। স্বীকার করলেন, তাঁদের সমর্থক অনেকেই বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বার তা হবে না বলেওপ্রত্যয়ী তিনি। বললেন, ‘‘বিজেপি প্রথম বিপদ। তাই ভোটারেরা ফিরবেন আমাদের কাছে।’’ ভোট ফেরাতে সিপিএমের নিবিড় চেষ্টা দেখা যাচ্ছে আমতাতেও। ছাত্র নেতা আনিস খানের মৃত্যু ঘিরে লোকসভাভোটের আগে তোলপাড় হয়েছিল এই আমতা। আনিসের দাদা সাবির সক্রিয় সিপিএম কর্মী। বললেন, ‘‘রাজ্য ও কেন্দ্র, দুই সরকারের উপরেই মানুষ বীতশ্রদ্ধ।’’
আমতায় ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস জিতেছিল। এ বারেও ওই কেন্দ্রে জয়ের ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী বলে জানালেনহাওড়া গ্রামীণ জেলা কংগ্রেসের সভাপতি আলম দেইয়ান। আমতায় মূল লড়াই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে হবে, না বিরোধী ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাবে, তা নিয়ে চর্চা চলছে চায়ের দোকানে। তবে বিরোধীদের দিকে তাঁদের তাকাতে হয় নাবলেই দাবি করলেন জেলা তৃণমূল সভাপতি (হাওড়া গ্রামীণ) অরুণাভ সেন। বিদায়ী বিধায়ক তথা বাগনানের প্রার্থী অরুণাভ বললেন, ‘‘বিরোধীদের শুধু ভোটের সময়ে দেখা যায়। দুর্যোগ থেকে এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন), আমরা সারা বছর পাশে থাকি। সব কেন্দ্রের মানুষই তা মনে রাখেন।’’
এসআইআর যে মানুষ মনে রেখেছেন, তার আঁচ মিলল শ্যামপুর বাজারে। স্থানীয় বাসিন্দাসনৎ পাত্রের কথায়, ‘‘আমার নাম কাটা যায়নি। কিন্তু কাগজ জোগাড় করা, জমা দেওয়া, এ সবে হয়রানি তো হয়েছেই। যাঁদের লাইন দিতে হয়েছে, তাঁদের রুজি-রোজগারের তো ক্ষতি হয়েছে।’’ ‘‘এতদিন ভোট দিচ্ছি, এখানে জন্ম, এ সব করতে হবেই বা কেন?’’ সমর্থন করলেন সেই বাজারে আসা পাশের আর এক জন। শ্যামপুরে ২০০১ থেকে বিধায়ক থাকা কালীপদ মণ্ডলের বদলে এ বার ‘সংগঠনের লোক’ নদেবাসী জানাকে টিকিট দিয়েছে তৃণমূল। তিনি বললেন,‘‘আমাদের বিধানসভা কেন্দ্রে ৪২ হাজার মানুষের শুনানি হয়েছিল। সকলের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে আবেদন, নথিতে সাহায্য করেছি। শেষ পর্যন্ত বাদ গিয়েছেন মাত্র ২৭০০ জন। তাঁদেরও সকলের ট্রাইবুনালে আবেদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিজেপিভাগ করতে চেয়েছিল। এসআইআর হিন্দু এবং মুসলিমকে এক করে দিয়েছে।’’
যে সংগঠন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল, তাকে হারাতে উদয়াস্ত প্রচার করছেন বিজেপির তারকা-প্রার্থী হিরণ। খড়্গপুর থেকে কেন্দ্র বদলে হাওড়ার শ্যামপুরে প্রার্থী তিনি। দাবি করলেন, ‘‘উলুবেড়িয়া আমার জন্মভূমি। বিধায়ক হিসেবে কাজ করে খড়্গপুরের ভোল বদলে দিয়েছি। শ্যামপুরের মানুষকেও তাই বলছি।’’ তাঁর কটাক্ষ, ‘‘তৃণমূল এত শক্তিশালী হলে পাঁচ বারের বিধায়ককে বদল করতে হল কেন?’’
শাসকদলের প্রার্থী বদল হয়েছে উলুবেড়িয়া উত্তরেও। বিদায়ী বিধায়ক নির্মল মাজিকে পাঠানোহয়েছে অন্য জেলায়। তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, ‘অস্বস্তি’র জেরেই এই বদল বলে দাবি বিরোধীদের। বিজেপির জেলা নেতা রমেশ সাধুখাঁ বলছেন, ‘‘প্রার্থী বদলে লাভ হবে না। মানুষ সরকার বদলের জন্য তৈরি।’’ উলুবেড়িয়া দক্ষিণের তৃণমূল প্রার্থী, মন্ত্রী পুলক রায় অবশ্য বলছেন, ‘‘সব আসনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেই ভোট হয়। মানুষএসআইআরের হয়রানি, ভোগান্তিতে ক্ষুব্ধ। ভোটে সেটা তাঁরা বুঝিয়ে দেবেন।’’উদয়নারায়ণপুরে দামোদর পারের বাসিন্দা তারক প্রামাণিক বলেন, ‘‘বানের চরিত্র বোঝা ভার। এলে কী হবে, আগে থেকে বোঝা যায় না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)