স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি, তবু বেহালার লড়াইয়ে এ বারও আছেন পার্থ

ত্রিসীমানায় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর ছায়া দেখা না-গেলেও এখানকার বিজেপি প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁ রাস্তায় রাস্তায় ‘২৬ হাজার চাকরি চুরি’র কথা বলছেন। সে কথা মনে করিয়ে দিতে বেকারদের সহায়তায় বিজেপির ভাতার প্রতিশ্রুতিকে জুড়েদিচ্ছেন ওই চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা হিসেবে।

রবিশঙ্কর দত্ত

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১৬
পার্থ চট্টোপাধ্যায়।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।

কোথাও কোনও চিহ্ন নেই। মিছিল, মিটিং, দেওয়াল— কোথাও না।

গত বিধানসভা নির্বাচনেও এ মাথা-ও মাথা ছুটে বেড়ানো, ‘হেভিওয়েট’ নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় এ বার কি সত্যিই কোথাও নেই? অন্য কোথাও না-থাকলেও বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে তিনি আছেন। কারণ, পার্থের অনুপস্থিতিই তাঁকে এই কেন্দ্রের নির্বাচনে পুরোদস্তুর ধরে রেখেছে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির যে অভিযোগে এক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার নড়ে গিয়েছিল, এ বারের ভোটে বিরোধীদের প্রচারে তা পুরোমাত্রায় রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই সেই বড় মাপের দুর্নীতির অভিযোগ যাঁকে ঘিরে, তাঁর কেন্দ্রে সেই প্রচারের সূত্রে তিনি তো থাকবেনই।

ত্রিসীমানায় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর ছায়া দেখা না-গেলেও এখানকার বিজেপি প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁ রাস্তায় রাস্তায় ‘২৬ হাজার চাকরি চুরি’র কথা বলছেন। সে কথা মনে করিয়ে দিতে বেকারদের সহায়তায় বিজেপির ভাতার প্রতিশ্রুতিকে জুড়েদিচ্ছেন ওই চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা হিসেবে। এখানে সিপিএমের প্রার্থী নীহার ভক্ত স্থানীয় মুখ ও অনেক দিনের পুরপ্রতিনিধি। তিনি আরও নির্দিষ্ট করে পার্থকে টেনে আনছেন নির্বাচনে। করোনা-কালের ‘রেড ভলান্টিয়ার’ নীহার ঘুরে ঘুরে বলছেন, ‘‘আমার খাটের নীচে কোটি কোটি টাকা পাওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অসুস্থ মানুষের জন্য রক্তের কার্ড বা অক্সিজেনের সিলিন্ডার পাওয়া যেতে পারে!’’

ভোটের হিসাবনিকাশে পার্থ সরাসরি নেই ঠিকই, কিন্তু নিয়োগ সংক্রান্ত সেই অভিযোগ নিশ্চিত ভাবে রয়েছে তৃণমূলের বিপরীতে। আবার পাঁচ বারের বিধায়ক হিসাবে বেহালার জন্য তাঁর কাজ রয়ে গিয়েছে তৃণমূলের জন্য। দলের সঙ্গে দূরত্ব আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না-পেয়ে রাজনীতির এই বসন্তে আপাতত স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি এক সময়ের সেই ‘হেভিওয়েট’। এখন সর্বার্থেই ওজনহারা। ভোটে কি আছেন তিনি? অভিযোগ আর অভিমানে ধ্বস্ত প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থের উত্তর, ‘‘জনমত যাচাইয়ে হয়তো নেই। কিন্তু এই কেন্দ্রের জনমনে আছি। কারণ, পাঁচ বার বিধায়ক থাকাকালীন তাঁদের কথাও আমি তো কখনও ভুলিনি।’’ তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘বিদ্যাসাগর হাসপাতাল, ডায়মন্ড হারবার রোডের সম্প্রসারণ, পলিটেকনিক কলেজ বা বেহালা থানাকে কলকাতা পুলিশের অধীনে নিয়ে আসার কথা কি তাঁরা ভুলে যাবেন?’’

কিন্তু তাঁরই বিরুদ্ধে যে সাম্প্রতিক অতীতের সব থেকে গুরুতর অভিযোগ? আপাতত স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি পার্থের জবাব, ‘‘তার বিচার আইন করবে।’’ একটু থেমে তিনিইবললেন, ‘‘জেল থেকে বাড়ি ফেরার পরে আমি যে দু’-এক দিন বেরিয়েছিলাম, মনে হয়নি, বেহালার মানুষ তা বিশ্বাস করেছেন। এক দিন প্রমাণ হবে।’’ সেই আলোচনা এগোতে না-চাইলেও রাজনীতির সঙ্গে এই দূরত্বের সময়েও বেহালা পশ্চিমের সব খবর রেখেছেন তিনি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) কত নাম বাদ গেল, কোন অঞ্চল থেকে বাদ গেল বা কত যোগ হয়েছে, নির্বাচনী কেন্দ্রের সে সব খুঁটিনাটি তাঁর কাছে আছে। সে সব চিরকুট এখন তাঁর ফতুয়ার পকেটে পড়ে রয়েছে ঠিকই, তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভোটের চর্চায় তিনি আছেন।

সাংগঠনিক প্রভাব বেশি হলেও এই কেন্দ্রে গত ১০ বছরে তৃণমূলের কমতে থাকা ভোট অবশ্যই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৬ থেকে ২০২১ তো বটেই, বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে ২০২১ সালের বিধানসভাভোটের তুলনায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট কমেছে ৭%। তবে একই সঙ্গে বিরোধী ভোটে বিজেপি ও সিপিএমের ভাগাভাগিই (যথাক্রমে ৩৬ ও ১৭%) হয়তো কিছুটা ‘নিশ্চিন্ত’ থাকার সুযোগ দিয়েছে তৃণমূলকে। পাশাপাশি, এসআইআর নতুন চিন্তাও যোগ করেছে। এখানে ভোট কমেছে ৫১ হাজারের বেশি। এই ধাক্কা কতটা, অঞ্চলভিত্তিক পর্যালোচনায়তৃণমূলকে তার অনেক রকম অঙ্ক কষতে হয়েছে। এ সব মেনে নিয়েই ১২ মাস সংগঠনের কাজে যুক্ত, দলের এক নেতার দাবি, ‘‘প্লাস আছে, মাইনাসও আছে। তবে মনে রাখতে হবে, তৃণমূলের সংগঠনও এখানে শক্তিশালী। বিপুল সংখ্যক ক্লাবকে সরকারি অনুদান পেতে সাহায্য করে তাদের দলের ভাবনায় যোগ করেছিলেন পার্থদা।’’

এই মাঠে ঠিক পাশের কেন্দ্র বেহালা পূর্বের বিদায়ী বিধায়ক রত্না চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। স্বাভাবিক ভাবেই বিদায়ী বিধায়ক তথা দলের পুরনো ‘হেভিওয়েট’-এর প্রসঙ্গ প্রচারে এড়িয়েই চলছেন তাঁরা। তৃণমূল সরকারের নানা প্রকল্পের কথা বলছেন, পূর্ব থেকে পশ্চিমে আসার ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন। প্রচারে বলছেন, তাঁর বাবা বিধায়ক, মা বিধায়ক ছিলেন, ভাই এ বার বিধায়ক হতে প্রার্থী হয়েছেন। সভায় সভায় এই পারিবারিক পরিচিতি জানিয়ে ভোট চাইছেন রত্না। বিধায়ক হিসাবে বিধানসভায় পাঁচ বছরের ‘নীরবতা’ নিয়ে আলোচনাও কাটিয়ে ফেলেছেন কেন্দ্র বদলের সুযোগে। তবে খুব কঠিন না-হলেও রাজনীতির এই লড়াইয়ে রত্না নেমেছেন পার্থের পরিবর্ত হিসাবে। তাই স্বীকার করুন বা না করুন, নীরবেই পূর্বসূরির ‘প্লাস-মাইনাস’ কষতে হচ্ছে তাঁকে!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government TMC Partha Chatterjee Behala Paschim

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy