ভিড় দেখে বোঝা দায় হাওয়ার মতিগতি, কাকে ‘শিক্ষা’ দেবে শিল্পাঞ্চল?

অন্যান্য বার ভোট এলেই এই শিল্পাঞ্চলের ১১টি চটকলের কুলি লাইন, পথঘাট যে ভাবে অশান্ত হয়ে ওঠে, মারধর, ভাঙচুর, মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটে— এ বার তার লেশমাত্রও নেই।

বিতান ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৭

— প্রতীকী চিত্র।

ভোটের হাওয়া গঙ্গাপারের শিল্পাঞ্চলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পথে-প্রচারে প্রার্থীরা। মাঝেমধ্যেই ভোট চাইতে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, বা সিনেমা জগতের তারকারা। জনসভা হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে। উন্নয়নের খতিয়ান দেওয়া থেকে আগামীর কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞার কথা বলছেন তাঁরা। লোকজন ভিড় করছেন সভায়। কিন্তু ভোট কাকে দেবেন, অথবা হাওয়া কেমন, এমন প্রশ্নের উত্তর এ বার রাজনীতিকদের ঢঙেই দিচ্ছেন ভোটারেরা। উন্নয়নের কথা উঠলে অনেকেরই বক্তব্য, ‘‘দেখতেই তো পাচ্ছেন চোখের সামনে।’’ এই দ্ব্যর্থবোধক উত্তরের রহস্য যে উন্মোচিত হবে আগামী ৪ মে, ফল প্রকাশের দিন, তা বলাই বাহুল্য।

তবে, অন্যান্য বার ভোট এলেই এই শিল্পাঞ্চলের ১১টি চটকলের কুলি লাইন, পথঘাট যে ভাবে অশান্ত হয়ে ওঠে, মারধর, ভাঙচুর, মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটে— এ বার তার লেশমাত্রও নেই। প্রতি বারই শাসকদলের হাতে মার খাওয়া বিরোধীরা অভিযোগ করেন অরাজকতার। মনোনয়ন প্রত্যাহার করানো থেকে ‘দুর্বল’ বিরোধীর বাড়ির সামনে বোমাবাজি, বাড়িতে সিঁদুর মাখা সাদা থান পাঠানো থেকে সরাসরি খুনের হুমকি— বাম আমল থেকে এ সবই দেখতে অভ্যস্ত এই শিল্পাঞ্চল। বিরোধীদের প্রচার করার মতো সাংগঠনিক জোরই ছিল না এত দিন। কিন্তু এ বার ভোটের প্রচারের টক্করে কে বিরোধী, কে শাসক, সেটাই বোঝা দুষ্কর।

ভোটারেরা এ বার কার্যত দর্শকাসনে থাকলেও প্রার্থীরা দুর্দমনীয় প্রচারে নেমেছেন। বীজপুর থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত ছ’টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ভাটপাড়া শুধু বিজেপির। বাকি পাঁচটিই তৃণমূলের দখলে। ভাটপাড়ার ‘কাঁটা’ উপড়ানোই তৃণমূলের পাখির চোখ এ বার। সেখানকার বিজেপি প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক পবন সিংহও স্বীকার করছেন, ‘‘এই আসন টিকিয়ে রাখা এ বার বড় চ্যালেঞ্জ।’’ তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে বীজপুরই ছিল রাজ্যের নির্বাচন পরিচালনার আঁতুড়ঘর। কাঁচরাপাড়া স্টেশনের কাছে সেই সময়ে রাজ্য রাজনীতির ‘চাণক্য’ মুকুল রায়ের বাড়ি থেকেই ভোটের হাওয়া কোন দিকে বইবে, কার্যত তা ঠিক করা হত। মুকুল-পর্ব অতীত। এ বারের ভোট শিক্ষণীয় হবে বলেই মনে করেন ব্যারাকপুরের প্রাক্তন ও বর্তমান সাংসদ অর্জুন সিংহ এবং পার্থ ভৌমিক। তৃণমূলের পুরপ্রতিনিধি, পুরপ্রধান থেকে বিধায়ক, এমনকি, সাংসদ থাকা অর্জুন এ বার নোয়াপাড়ায় বিজেপির প্রার্থী। এই নির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর কথায়, ‘‘শিল্পাঞ্চলে শিল্প ধুঁকতে ধুঁকতে এখন শেষ। শুধু প্রোমোটারি আছে, লুটের রাজনীতি আছে। কর্মসংস্থান থেকে সুস্থ জীবনের অধিকারের দাবিতে মানুষ যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, সেই হাওয়াটা অনুভব করতে পারছি। এ বারের ভোটে মানুষই শিক্ষা দেবেন ঘুণ ধরা রাজ্য সরকারকে।’’

হালিশহর, নৈহাটি, শ্যামনগর থেকে সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতি আগলে রাখা ব্যারাকপুর— বাস্তবিকই এক সময়ে ‘মিনি ভারত’ তৈরি হয়েছিল চটকলগুলির দৌলতে। উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের বাস এখানকার কুলি লাইনে। নানা ভাষা, নানা মত। একই সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠায় খামতি নেই এক আনা। ইদ, ছট, পোঙ্গল, দশেরা, দীপাবলি বা দুর্গোৎসবে যেমন ভাষা, মত মিশে যায়, তেমনটাই ঘটে ভোট উৎসবেও। মাঠ উপচে ভিড় হয় প্রধানমন্ত্রী এলে, মুখ্যমন্ত্রী এলেও। ভিড়ের মধ্যে থাকা সকলেই যে বিজেপি বা তৃণমূল নন, তা এখানকার প্রার্থীরাও বোঝেন। তাই গঙ্গাতীরের শিল্পাঞ্চলে নির্বাচনী সভার ভিড় দেখে ভোটের হাওয়া বোঝা যায়নি কখনও।

দীর্ঘদিন ধরে বাম শ্রমিক সংগঠন করে আসা, বীজপুরের সিপিএম প্রার্থী দেবাশিস রক্ষিত অথবা
নোয়াপাড়ার প্রার্থী গার্গী চট্টোপাধ্যায়ও মানছেন, ব্যারাকপুরের আনন্দপুরী মাঠে বাম সরকারের বিদায়বেলায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শেষ নির্বাচনী সভায় যে জনসমাগম হয়েছিল, তা দেখে শাসকদল ঠাহর করতে পারেনি যে, শিল্পাঞ্চলে খেটে খাওয়া মানুষের উপরে ভর করে গড়া লাল দুর্গ আদতে তাসের দেশ। শুধু বাম বা কংগ্রেসের নয়, ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে যুযুধান তৃণমূল ও বিজেপিরও নির্বাচনী হাতিয়ার ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, বন্দে মাতরম্ এবং নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায় তাঁর ভিটে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ মিলেমিশে থাকার এই শিল্পাঞ্চলের অস্মিতাকেই সকলে দেখাতে চাইছেন প্রচারের আয়নায়।

সাংসদ পার্থ ভৌমিকের হাতেই এ বার শিল্পাঞ্চলে কাঁটাহীন ফুল ফোটানোর দায়িত্ব দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। দিনে গড়ে দশটি প্রচারসভা সারার ফাঁকে প্রবল গরমে নৈহাটিতে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে পার্থ বললেন, ‘‘এখানে ভোট হয় আবেগে ভর করে। গঙ্গার পাড় বরাবর এত ঐতিহ্য আর ইতিহাস টিকে আছে এখানকার মানুষ আবেগপ্রবণ বলেই। দক্ষিণপন্থী দল তো আবেগে ভর করেই মানুষের কাছে ভোট চায়। রেজিমেন্টেড দলও এখন সেই পথেই হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। শিক্ষণীয় এটাই।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Barrackpore West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy