ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত কালীঘাটের পটুয়াপাড়া। বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে লেখা ‘মনসা বিজয়ে’ (‘মনসামঙ্গল’) উল্লেখ আছে কালীঘাটের দেবীর। আর কালীঘাটের পট অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে প্রচলিত হতে শুরু করে। বিষয়বস্তু অনুযায়ী এই পটের দু’টি ভাগ, ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ। ঘটনাচক্রে, ২০২৬-এর ভোট মরসুমের এক ‘তারকা’, বিরোধী দলনেতা তথা ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী অন্য প্রেক্ষিতে জোর গলায় বলেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা চলবে না।’— ওঁরা তিন জন এই ভাষ্যের বিরোধী।
আর এক ‘তারকা’, যাঁর কেন্দ্র হিসাবে ভবানীপুরের বর্তমান পরিচিতি, তৃণমূল কংগ্রেসের সেই প্রার্থী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদায়ী বিধায়ক হিসাবে পটুয়াপাড়া, এই কেন্দ্রের মধ্যে থাকা সরকারি স্কুল, অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের হাল ফেরাতে কী করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ওঁরা তিন জন।
মমতা-শুভেন্দুর ‘তারকা-যুদ্ধ’-এর মধ্যেই ওঁরা তিন প্রার্থী— কংগ্রেসের প্রদীপ প্রসাদ, সিপিএমের শ্রীজীব বিশ্বাস আর এসইউসি-র অনুমিতা সাউ। দলীয় নীতি ও ভবানীপুরের স্থানীয় সমস্যাকে তুলে ধরে তাঁরা ভোট ময়দানে নেমেছেন। চষে বেড়াচ্ছেন ল্যান্সডাউন, যদুবাবুর বাজার, পদ্মপুকুর, বলরাম বসু ঘাট রোড, গোবিন্দ ঘোষাল লেন, পার্বতী চক্রবর্তী লেন, চেতলা কলোনি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট-সহ গোটা ভবানীপুরের রাজপথ থেকে তস্য গলি।
জন-অরণ্যের ভিড়ে যদুবাবুর বাজার হোক বা হাজরা মোড়, ভবানীপুরের নানা জায়গায় রাজ্য থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বছরভর পথসভা-সহ নানা কর্মসূচিতে দেখা যায় কংগ্রেসের প্রদীপকে। এলাকায় ‘পাড়ার ছেলে’ পরিচিতি তাঁর। একদা কংগ্রেস নেত্রী মমতার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। স্মৃতি ভেঙে প্রদীপ মনে করান, হাজরা মোড়ে মমতা আক্রান্ত হওয়ার সময়ে তিনিও মিছিলে ছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে কলকাতায় কার্ফুর মধ্যে তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী মমতার নির্দেশে রক্তদান শিবিরের আয়োজনেও ছিলেন তিনি। হেরম্বচন্দ্র কলেজের প্রাক্তনী সেই প্রদীপ তাঁর ধারাবাহিক ‘রাস্তার লড়াই’-এর জোরেই বলছেন, “অনেক প্রলোভন, ভীতি সত্ত্বেও কংগ্রেসের আদর্শ ছাড়িনি। নরেন্দ্র মোদীর স্বৈরাচারের ১২ বছর এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ১৫ বছর, এই দুইয়েরই বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। আমাকে দেখে ওই দু’পক্ষেরই বুকের ধুকপুক বেড়ে গিয়েছে। মানুষ এঁদের নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাঁদের ভোট-বাক্সে আনার লড়াই চলছে।” লড়াই চলছে এলাকার পুরনো কংগ্রেস পরিবারগুলির ভোট ফের হাতে আনারও।
অন্য পক্ষে, পৃথক ভাবে রয়েছে দুই বাম দল। ভবানীপুর কেন্দ্রটি তৈরির পর থেকে বিধানসভা নির্বাচনী ফলের নিরিখে বরাবরই তা তৃণমূলের গড়। সিপিএম প্রার্থী, পেশায় আইনজীবী শ্রীজীব ২০২১-এর উপনির্বাচনেও মমতার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এ বার দেওয়ালে সিপিএম লিখেছে, ‘না চোর, না দাঙ্গাবাজ। বিকল্পের লড়াই। বিকল্প বামপন্থীরাই’। আর সেই সূত্রেই ‘দুই তারকার লড়াই’, এই ভাষ্যকে নস্যাৎ করে শ্রীজীব বলছেন, “বিধায়ক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী থাকার পরেও আর্থিক কারণে ভবানীপুর প্রায় বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে। কয়েক জন নির্মাণ ব্যবসায়ীর জমি লুট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বর্ষায় চেতলা-সহ নানা অংশে জল জমা, বস্তি অঞ্চলের অনুন্নয়ন মানুষ দেখছেন। আর গত কয়েকটি ভোটে বিরোধী হিসাবে বিজেপিকে বেছে নেওয়াও যে ভুল ছিল, তা-ও বুঝেছেন তাঁরা। তৃণমূল-বিজেপি আঁতাঁতের বিরুদ্ধে ভোট হবে।” শ্রীজীবের প্রচারে বিশেষ ভাবে উঠে এসেছে এলাকার বিভিন্ন সরকারি স্কুলগুলির ‘অচল’ পরিস্থিতি।
স্কুল বেহাল, বলছেন ছাত্র রাজনীতি করে উঠে আসা এসইউসি প্রার্থী অনুমিতাও। মমতা যে কলেজের প্রাক্তনী, সেই যোগমায়া দেবী কলেজেরই ডিএসও-র প্রাক্তন সহ-সভানেত্রী অনুমিতা বলছেন, “সরকারি স্কুলগুলি বন্ধ। পটুয়াপাড়ায় মৃৎশিল্পীরা ত্রিপল টাঙিয়ে কাজ করছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র-সহ বহু বরেণ্য ব্যক্তির বাড়িগুলি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেহাল।” নির্বাচনকে ধারাবাহিক লড়াইয়ের অংশ হিসাবে দেখে এসইউসি। মমতা-শুভেন্দুর ‘তারকা লড়াই’কে আমল না দিয়ে অনুমিতা বলছেন, “নেতা নন, ভবানীপুরের জনতাই আসল তারকা। কেন্দ্র, রাজ্যের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই।” শম্ভুনাথ পণ্ডিত বাজারে সেই জনতার কাছেই অনুমিতার প্রশ্ন, “আপনারা কোনও না কোনও দলকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছেন। কিন্তু সেই জয়ের মধ্যে দিয়ে আপনারা কি জিতেছেন?”
প্রশ্নটা সহজ, উত্তরও কি জানা?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)