জনঘনত্বে হারিয়েছে উন্নয়ন, বেহাল পরিষেবাই হাতিয়ার বিরোধীদের

বিধাননগর পুরসভার ১৬টি এবং দক্ষিণ দমদম পুরসভার ৮টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্র। ফলাফল বলছে, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে এই বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল এগিয়েছিল মাত্র ৭৪ ভোটে। অনেকগুলি ওয়ার্ডেই এগিয়ে ছিল বিজেপি।

আর্যভট্ট খান , কাজল গুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৩

— প্রতীকী চিত্র।

ছিল রুমাল। হয়ে গেল বেড়াল। কিন্তু অভিযোগ, বেড়াল হয়েও তা রুমাল হয়েই থেকে গিয়েছে।

ছিল রাজারহাট-গোপালপুর পুরসভা। ২০১৫ সালে রাজারহাট-গোপালপুর পুরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ড বিধাননগর পুরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়। বাসিন্দাদের তেমনই দাবি ছিল এবং তার পরে ভাবা হয়েছিল, এলাকার পরিষেবার উন্নতি হবে। কিন্তু সেই দাবি পূরণ হয়েছে কি? অনেকের মতে, পরিষেবার হয়তো ছিটেফোঁটা উন্নতি হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে রাজারহাট-গোপালপুরের জনসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সেই উন্নয়ন কার্যত চোখে পড়ছে না। তাই পরিষেবার উন্নতি চাইলে ‘চলো পাল্টাই’— বিধানসভার ভোট প্রচারে বিরোধী দল বিজেপির এটাই স্লোগান। অন্য দিকে, সিপিএম ও কংগ্রেসের প্রচারেও উঠে এসেছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার দাবি।

বিধাননগর পুরসভার ১৬টি এবং দক্ষিণ দমদম পুরসভার ৮টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্র। ফলাফল বলছে, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে এই বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল এগিয়েছিল মাত্র ৭৪ ভোটে। অনেকগুলি ওয়ার্ডেই এগিয়ে ছিল বিজেপি। আসন্ন নির্বাচনে সেটাই বাড়তি অক্সিজেন দিচ্ছে বলে মত বিজেপির। ওই লোকসভা ভোটে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ৭৫২৩৬টি, বিজেপি পেয়েছিল ৭৫১৬২, সিপিএম এবং কংগ্রেস জোট পেয়েছিল ৩০৩৮৬টি ভোট। বিজেপি প্রার্থী তরুণজ্যোতি তিওয়ারির মতে, ‘‘পরিষেবার বেহাল অবস্থা নিয়ে বাসিন্দাদের ক্ষোভ রয়েছে। তাই সেই ভোট বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। এখানে সংখ্যালঘু ভোট মাত্র তিন শতাংশ। সেই ভোটেরও কিছুটা আমাদের পক্ষে যাবে।’’

রাজারহাট-গোপালপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা তৃণমূলের প্রার্থী অদিতি মুন্সির পাল্টা দাবি, ‘‘লোকসভার ফল দেখে বিধানসভার ফল আলোচনা করা মূর্খামি। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে দমদম লোকসভা কেন্দ্রে সৌগত রায় জিতলেও রাজারহাট-গোপালপুরে তৃণমূল বিজেপির থেকে প্রায় হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে আমি বিজেপির শমীক ভট্টাচার্যের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীকে ২৫২৯৬ ভোটে হারিয়েছি। গত লোকসভায় আমরা ৭৪ ভোট হলেও এগিয়ে ছিলাম। এ বার জয়ের ব্যবধান অনেক গুণ বাড়বে।’’

বিধাননগর পুরসভায় অন্তর্ভুক্তির পরে জল, নিকাশি-সহ পরিষেবার বিভিন্ন দিকে উন্নতি হয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের। তবে বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে এলাকায় বেড়েছে বসতি, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বহুতলও। সেই নিরিখে পরিষেবা রয়েছে সেই তিমিরেই। বিশেষত বিবি খাল, কেষ্টপুর খাল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, টানা দু’ঘণ্টার বৃষ্টিতে বিবি খাল সংলগ্ন এলাকা যেমন রবীন্দ্রপল্লি, জর্দাবাগান, জগৎপুর বাজার, বিদ্যাসাগর পল্লি, অশ্বিনীনগর, জ্যাংড়া দক্ষিণ মাঠ, জ্যাংড়া উত্তর মাঠ, শচীন্দ্রলাল সরণি, সাহাপাড়া, শাস্ত্রীবাগানের একাংশ হাঁটুজলে ডুবে যায়। রবীন্দ্রপল্লির কয়েক জন বাসিন্দার কথায়, ‘‘প্রতি বর্ষায় একতলার ঘরে জল ঢুকে যায়। অনেকে বাড়ি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।’’ হলদিরাম সংলগ্ন ভিআইপি রোডের সার্ভিস রোড সংলগ্ন আবাসনের আবাসিকেরাও জানাচ্ছেন, প্রতি বর্ষায় হাঁটুজলে কাটে তাঁদের বন্দী-জীবন। সে সময়ে অ্যাম্বুল্যান্সও ঢুকতে পারে না।

নিকাশির সমস্যার কথা মেনে নিয়েও অদিতির দাবি, ‘‘ভৌগোলিক কারণে এখানে জল জমে। তবু পরিকল্পনামাফিক কাজ হওয়ায় আগে যেখানে তিন দিন জল জমে থাকত, সেখানে এখন ঘণ্টা ছয়েক থাকে। নিকাশি নালার উন্নতি হয়েছে, পাম্প বসেছে। বিবি খাল, বাগজোলা
খালের সংস্কার হয়েছে। বিবি খালের উপরে কালভার্টের কাজও শুরু হয়েছে। খালগুলি যেখানে মিশেছে, অর্থাৎ লোয়ার বাগজোলা ও
বিদ্যাধরী নদীর পলি তোলার কাজও শুরু হয়েছে। শুধুমাত্র রাস্তা ও নিকাশির সংস্কারের জন্য গত পাঁচ বছরে ২৬০ কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। এ ছাড়া পানীয় জল, বাগুইআটিতে দমকল কেন্দ্র তৈরি, আধুনিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল-সহ নানা উন্নয়নূলক কাজে মোট ৭৪১ কোটি টাকারও বেশি কাজ হয়েছে। জোড়ামন্দিরে বাগুইআটি উড়ালপুলের নীচে ফুটবল, ক্রিকেট-সহ নানা ধরনের খেলাধুলোর জন্য আধুনিক টার্ফ তৈরি হয়েছে।’’

যদিও সিপিএম প্রার্থী শুভজিৎ দাশগুপ্ত ও কংগ্রেস প্রার্থী পার্থ ভৌমিক মনে করেন, এই উন্নয়ন সীমাবদ্ধ খাতায়-কলমেই। পার্থ বলেন, “নিকাশির সমস্যা মেটেনি। ১৮, ২১ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গির প্রকোপ বেশি। মানুষ বদল চাইছেন। কংগ্রেসের যে ভোট চলে গিয়েছিল, সেগুলি এ বার ফিরছে।” তৃণমূল কর্মীদের একাংশের দাবি, বিরোধীরা পরিষেবা নিয়ে তথ্য না জেনেই কথা বলছেন। আর বিরোধীদের পাল্টা দাবি, তাঁরা বলছেন সাধারণ মানুষের অভিযোগের কথা। রাজারহাট-গোপালপুরে শাসকদলের নেতাদের পকেটে কাটমানি আর সিন্ডিকেটের বখরার টাকা যে ভাবে ঢুকেছে, তা সাধারণ মানুষ ভাল চোখে দেখেনি।

সিপিএম প্রার্থী শুভজিতের মতে, “বেহাল পরিষেবার পাশাপাশি, পরিস্থিতি জটিল করেছে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা বহুতল। সিন্ডিকেট-রাজ চলছে। তাতে মদত রয়েছে তৃণমূল প্রার্থীর স্বামী তথা পুরসভার চেয়ারম্যান পারিষদ দেবরাজ চক্রবর্তীর। মানুষ ভীত ও বীতশ্রদ্ধ। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস মিলিয়ে ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। বামের ভোট এ বার বামে ফিরছেই।“

যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বামের ভোট বাড়লে তাতে লাভবান হবে তৃণমূলই। এলাকার রাজনৈতিক সচেতন মানুষদের মতে, দক্ষিণ দমদম পুরসভার যে ওয়ার্ডগুলি রাজারহাট বিধানসভার অধীনে, সেখানে বামেদের সংগঠন মজবুত। সেখানে যদি এ বার বামের ভোট বাড়ে, তা হলে তৃণমূলের ফের জয়ের ছবিটা আরও পরিষ্কার হবে।

ভোটের অঙ্ক যা-ই হোক, বাসিন্দারা চাইছেন পরিষেবার উন্নতি। অভিযোগ, সাবেক রাজারহাট-গোপালপুর অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছিল। উপরন্তু গত কয়েক বছরে কেষ্টপুর, বাগুইআটি-সহ বিধানসভার একাধিক প্রান্তের ঘিঞ্জি
এলাকায় অপরিকল্পিত ভাবে বহুতল গজিয়েছে। কেষ্টপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, আজও পরিস্রুত পানীয় জল মেলে না। যদিও বিধাননগর পুরসভার দাবি, পানীয় জল প্রকল্পের কাজ চলছে। কয়েকটি ওয়ার্ডে তার সুফল মিলেছে। বাকি অংশে পাইপলাইন বসার কাজ চলছে।

অভিযোগ রয়েছে গণপরিবহণ নিয়েও। বাগুইআটি হয়ে সেক্টর ফাইভ, নিউ টাউনে যাওয়ার বাস চালুর দাবি রয়েছে স্থানীয়দের। কেষ্টপুর থেকে বিধাননগর-সহ সেক্টর ফাইভে যাওয়ার রাস্তা বাড়লেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সেই রাস্তা যথেষ্ট সঙ্কীর্ণ, কোথাও তার বেহাল দশা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) বহু নাম বাদ পড়েছে। বিজেপি প্রার্থীর মতে, তাতে সুবিধা তাঁদেরই। যদিও তৃণমূল মনে করছে, তাতে ভোট বাক্সে প্রভাব পড়বে না।

পাশাপাশি, এ বার কয়েকটি আবাসনে ভোট গ্রহণ কেন্দ্র হবে। তাতেও বিরোধীদেরই সুবিধা বলে মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলি। বিজেপি প্রার্থী তরুণজ্যোতির মতে, “এ বার অন্তত ভীতির পরিবেশ সরিয়ে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারবেন আবাসনের ভোটারেরা।’’ তৃণমূল প্রার্থীর মতে, “আবাসন-সহ সকলেই জানেন, গত পাঁচ বছরে আমরাই সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছিলাম।”

ভোটবাক্স কার মুখে হাসি ফোটাবে, তা সময় বলবে। তবে যত্রতত্র বহুতল এবং জনঘনত্বের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা না হলে যে বিপদ অবশ্যম্ভাবী, সে বিষয়ে নিশ্চিত বাসিন্দারা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rajarhat Gopalpur West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy