দাশনগরে চপলাদেবী স্কুলের পাশের সাবেক বাড়িটায় আর দলীয় রাজনীতির ছায়া পড়ে না। গৃহকর্তা, অশীতিপর তরুণ চন্দ্রকুমার দাশ খেলাধুলো, শুটিংচর্চায় মত্ত। নিজের পেট্রল পাম্পের কারবারও সামলান। হেসে বললেন, “আমার বাবা আলামোহনের কাছে বিধান রায় আসতেন। জ্যোতিবাবু আর অতুল্য ঘোষ এক বার এক দিনে এসেছিলেন।"
সাড়ে পাঁচ দশক আগে প্রয়াত, দাশনগরের প্রাণপুরুষ ও শিল্পোদ্যোগী আলামোহন দাশের ছায়া প্রলম্বিত হয় এ তল্লাটে ভোট এলেই। শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রটির মধ্যে এখন আসল শিবপুর তত নেই। তবে হাওড়া শহরের পশ্চিমে একদা ‘প্রাচ্যের শেফিল্ড’-এর অবস্থান এখানেই। ১৯৩৭-এ ভারত জুট মিল পত্তনের সময়ে আলামোহনকে ‘কর্মবীর’ আখ্যা দেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। রাষ্ট্রায়ত্ত হওয়ার পরে তা আজ টেনেটুনে চলছে। উত্তমকুমারের পুরনো ছবিতে সচল, সজীব ইন্ডিয়া মেশিনারির নিস্পন্দ প্রাঙ্গণ ঘিরেও আশঙ্কা, এই বুঝি প্রভাবশালীরা প্রোমোটারির ছক কষলেন। কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে শ্রমিকদের অনিয়মিতবেতনে নামমাত্র টিকে আলামোহনের সাবেক আরতি কটন মিল। তা-ও আজ তৃণমূল-বিজেপি টক্করের রাজনীতির রঙ্গভূমি।
দাশনগর, বেলগাছিয়া, কদমতলায় ঢালাই বা লেদ কারখানায় শ্রমিকের ঘর্মাক্ত কলেবরের ছবিটা মুছে যায়নি শিবপুর কেন্দ্র থেকে। তবে আগের থেকে কারখানা কমেছে। পোড়খাওয়া তৃণমূল নেতারা প্রযুক্তির বিবর্তনের দোহাই পাড়েন। তবে এখনও রেলের নামজাদা ভেন্ডর, ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থার কর্ণধার আশিস ঘোষ আক্ষেপ করেন, “শুধু রেলের কলকব্জা তৈরি করে আজকাল বরাত মেলে না। দশ বছর লাভের মুখ দেখিনি।” তাঁর বাবা কাশীনাথের তৈরি ব্যবসাকে টেনে নিয়ে যাওয়া আশিসের ব্যাখ্যা, “যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবসা চালানো পশ্চিমবঙ্গে সোজা নয়। আমাদের ব্যবসার বৃদ্ধি কই! সচল বাজারের ইকো-সিস্টেমটাই (বাস্তুতন্ত্র) এখানে অদৃশ্য। পঞ্জাবে, গুজরাতে সরবরাহের পণ্য পরিবহণের বিপুল খরচ। ভবিষ্যৎ তাই ঘোরঅনিশ্চিত।” আলামোহনের ছোট ছেলে চন্দ্রকুমারও স্পষ্ট বলেন, “বাম আমল থেকেই শিল্পের চাকা ক্রমশ ঢিমে হয়েছে।”
শিল্পের জমিতে নতুন শিল্পের দাবি ভাল ভাবে দানা বাঁধতে পারে না শিবপুরেও। হাওড়া শহরের অন্যতম জীবনস্রোত পচা খালের মজা ফুসফুসে প্লাস্টিক, জঞ্জাল, বর্জ্যের আড়তে স্বপ্নগুলো কবেই বন্দি। বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ তাই ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের ভূতবাগানে জলে-ডোবা এলাকা পেলেই জায়গা মতো ফ্রেম ধরতে ‘পোজ়িশন’ নিচ্ছেন। ‘ফোনটা ওপরে ধর, আর একটু পিছিয়ে তোল’ বলতে বলতেই তৈরি সমাজমাধ্যমের লাগসই ছবি, ভিডিয়ো। নিজের ফোনের গ্যালারি খুলে দেখান, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডেও জলে দাঁড়িয়ে গাম্বুট পরা ছবি উঠেছিল।
হেঁটে বাড়ি বাড়ি ‘অরাজনৈতিক’ সংযোগেও মাইক হাতে এই কেন্দ্রে হাওড়ার ১০টি ওয়ার্ডে ‘ম্যানমেড রাজনৈতিক বিপর্যয়’ নিয়ে তেতে উঠছেন অভিনেতা রুদ্রনীল। তৃণমূল নেতা ভাস্কর ভট্টাচার্য, মহেন্দ্র শর্মারা বোঝাচ্ছেন, পচা খাল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নিকাশির মাস্টার প্ল্যান-এর কাজ করছে সেচ দফতর। বেনারস রোডে পচা খালের মোড় দিয়ে ঢুকে একটু এগিয়েই ডবল ব্যারেল খাল তৈরির কাজ চলছে। ২০১১-র পরে কিছু কাজ হলেও প্রায় এক দশক ভোট হয়নি হাওড়া, বালি পুরসভায়। পুরবোর্ডবিহীন নগরের পরিষেবা নিয়ে বিস্তর অভিযোগও দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। বালিটিকুরি থেকে বৈরাগীপাড়া, কদমতলা, বেলগাছিয়া, রামরাজাতলায় তোলাবাজি, বখরা নিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের নিরন্তর অভিযোগও রয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে, গত বার প্রায় ৩৩ হাজার ভোটে জেতা তারকা ক্রিকেটার, মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারিকে সরাতে হয়েছে।
তৃণমূলের এ বারের বাজি, ছোটদের ডাক্তারবাবু রাণা চট্টোপাধ্যায় গত বার পাশের কেন্দ্র বালিতে জেতেন। তিনি কি সেখানে ব্যর্থ হয়ে শিবপুরে পালিয়ে এলেন? লম্বা লম্বা পা ফেলে বালিটিকুরিতে ঘুরতে ঘুরতে রাণার পাল্টা তির, ‘‘আমি বালিতে ফেল করে শিবপুরে আসিনি! রুদ্রনীল ভবানীপুরে হেরে, এখানে এসেছেন।’’ বিধানসভায় রাজ্যপাল হাওড়া-বালি পুরসভা বিন্যাস সংক্রান্ত বিল তিন বছর ফেলে রাখাতেই পুরভোট হয়নি বলেও তৃণমূল যুক্তি দিচ্ছে।
জোট ভাঙায় অনেক বছর বাদে কংগ্রেস প্রতীক পেয়েছে। পুরনো কংগ্রেসিরা কিছুটা উৎসাহী একদা খাস কংগ্রেসি এলাকা শিবপুরে। রাজ্য মহিলা কংগ্রেসের সভাপতি, প্রার্থী শ্রাবন্তী সিংহ সব থেকে জোর গলায় দাশনগর, বেলগাছিয়ায় শিল্প ঐতিহ্য ফেরানোর কথা বলছেন। জগাছার ছেলে হলেও রুদ্র তাঁর টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট বা রাণা বালির বাড়িতে বসে ফোনই ধরবেন না বলে হাওয়ায় ভাসাচ্ছেন শ্রাবন্তী।
জটু লাহিড়ীকে হারিয়ে ২০০৬-এ জয়ী বিধায়ক, ফরোয়ার্ড ব্লকের জগন্নাথ ভট্টাচার্যেরও একটা প্রভাব রয়েছে। জ্যোতিবাবুর সরকারের আদি যুগের শিল্পমন্ত্রী কানাইলাল ভট্টাচার্যের ভাইপো, ভূমিপুত্র সত্তরোর্ধ্ব ডাক্তারবাবু জগন্নাথ। ২০১১ থেকে পর পর ভোটে হারলেও হাল ছাড়েননি। প্রচার, মিটিংয়ের কড়া রুটিনের ফাঁকেও দুপুরে হাসপাতালে রোগীর কাঁধের হাড় জোড়ার শল্য চিকিৎসা করছেন। তবে ভাঙা হাড় সারলেও বামেদের প্রতি জনতার ভাঙা মন কতটা জুড়বে, সন্দেহ থেকে যায়!
চাকরি থেকে শিক্ষা, মানুষের নানা হতাশাকে পুঁজি করছে বিজেপি। তবে গত লোকসভা ভোটেও এই এলাকায় লিড পায়নি তারা। তৃণমূল আত্মবিশ্বাসী, জনতার এসআইআর-জ্বালায় সুবিধা তারাই পাবে। টাটকা ভাতার জোরে সাত খুন মাপের আশা এ বারও সম্বল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)