আসন্ন নির্বাচনে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা আর ধর্মীয় মেরুকরণের ‘ওজন’ মাপছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই নিয়ে দলের প্রাথমিক পাঠ উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) পরিস্থিতি দিয়ে তার কতটা মোকাবিলা করা সম্ভব, আপাতত সেই অঙ্কই করছেন দলের ভোট-কুশলীরা। দলীয় সূত্রের খবর, স্থানীয় স্তরে এই প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা এতই তীব্র যে, শহরাঞ্চলে তা দূর করতে কার্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে শাসক দলকে। একই ভাবে সাম্প্রতিক অতীতের নিরিখে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনেই সব চেয়ে বেশি মেরুকরণের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে দলীয় নেতৃত্বের একাংশ। একেবারে কেন্দ্রভিত্তিক সমীক্ষা আর তার বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই প্রস্তুতি-পর্বের কাটাকুটি চলছে।
পরিবর্তনের বছর তো বটেই, তার পরে বিধানসভার দু’টি নির্বাচনের তুলনায় তৃণমূলের কাছে কঠিন ২০২৬ সালের ভোট। রাজনীতির নিয়মেই বেড়েছে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা। সেই স্বাভাবিক অবস্থা আন্দাজ করেই সরকারি অনুদান আর আর্থিক আনুকূল্যে কার্যত খোলা হাতেই এ বারের ভোটের প্রস্তুতিতে নেমেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধিতার ঢেউয়ের সামনে সমষ্টিগত প্রয়োজন মেটানো আর সরকারি ভাতা প্রকল্পের বাঁধ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তাঁরা। সরকারি বাড়ি, ১০০ দিনের কাজের পাশাপাশি পুরনো ভাতা বৃদ্ধি এবং নতুন ভাতা চালু করে বৃহত্তর অংশের সমর্থন নিশ্চিত করতে চাইলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনও নিশ্চিন্ত নন শাসক শিবিরের নেতারা।
তৃণমূল নেতৃত্বের মতে, শিক্ষক নিয়োগ বা আর জি কর কাণ্ড-সহ দুর্নীতি, অপশাসনের নানা অভিযোগ অনেকটাই পিছনে চলে গিয়েছে সাম্প্রতিক এসআইআর সংক্রান্ত পরিস্থিতির জেরে। তবে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের ভাবনাকে তাজা রাখতে ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ গোছের প্রকল্প নেওয়া হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ‘নেতিবাচক’ মনোভাব কতটা কাটবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে দলের অন্দরে। জেলা স্তরে পর্যালোচনায় এই প্রকল্পের সুবিধা স্পষ্ট হয়েছে। ভোটের মুখে চোখে দেখা যায়, সরকারের এমন কাজে নিজেদের যুক্ত হতে পারার সুযোগ কাজে লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বহু জায়গায় এই বিধায়কদের একটা বড় অংশের কাজকর্মের জেরে তৈরি অসন্তোষকেই অন্য পাল্লায় তুলে মাপজোখ চলছে। সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক ভাবে সরকার সম্পর্কে অসন্তোষের তুলনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিরাই চিন্তায় রেখেছেন দলের নেতাদের। তাঁদের মতে, এর সঙ্গে পঞ্চায়েত বা পুরসভা পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভও যোগ হয়েছে। ‘অন্তর্ঘাত’ এড়িয়ে কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থী বদল করে এই ধাক্কা এড়াতে চান দলীয় নেতৃত্ব। কিছু জায়গায় বিরোধী ভোট ভাগের অঙ্ক দেখলেও এ বার সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় আবার সেই কারণেই নিজেদের নিশ্চিত আসনে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে তাদের।
এই অবস্থায় এসআইআর-এ মানুষের হয়রানির জেরে তৈরি ক্ষোভকে অবশ্য দলের পক্ষে কাজে লাগাতে চেয়েছে তৃণমূল। প্রাথমিক ভাবে ফর্মপূরণ এবং শুনানি-পর্বে নীচের তলার সংগঠনকে রাস্তায় নামিয়ে জনসংযোগের কাজ অনেকটা গিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু নাম বাদের অঙ্ক নিয়ে এখনও দলের ধারণা খুব স্পষ্ট নয়। সংখ্যালঘু এলাকায় মানুষের অভিজ্ঞতা তৃণমূলকে সাহায্য করলেও বাকি অংশের হিসেব সামগ্রিক মেরুকরণে কতটা ভারসাম্য রাখতে পারবে, তা-ও ভাবাচ্ছে তাদের। দলের এক নেতার কথায়, ‘‘শহুরে ভোটারদের মধ্যে মেরুকরণের প্রভাব আগে ছিল। এসআইআর-এর পরে তা কিছুটা কেটে গেলে পরিস্থিতি লোকসভা ভোটের মতো থাকবে না।’’ রান্নার গ্যাস জোগান নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা-ও ভোটের আবহে দলের পক্ষে ‘ইতিবাচক’ হতে পারে। তবে এ সব বিষয় ভোট পর্যন্ত কার্যকর না-ও থাকতে পারে বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)