সিন্ডিকেট, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বেই কি পতন চার জেলায়, চলছে কাটা-ছেঁড়া

অনুব্রত মণ্ডলের জেলা বীরভূমে ১১টি আসনের মধ্যে বিজেপি এ বার জিতেছে ছটিতে। তৃণমূল পাঁচটিতে। গত বার ফল ছিল তৃণমূলের পক্ষে ১০-১। বিজেপির ধারণা, তৃণমূলের মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোট-ব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাতে পেরেছে তারা।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৮:৪১

—প্রতীকী চিত্র।

শহরাঞ্চলে পুর-পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ, গ্রামাঞ্চলে বিরক্তি ‘সিন্ডিকেট-রাজ’ দেখে। দলের থেকে ভোটদাতাদের মুখ ফেরানোর কারণের অভাব ছিল না, উঠে আসছে ভোটের ফল নিয়ে তৃণমূলের নিজস্ব কাটাছেঁড়ায়। তার সঙ্গে অন্দরের কোন্দল যোগ হওয়াতেই বীরভূম, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো এক সময়ের ‘গড়ে’ তৃণমূলের ফল খারাপ হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা। তৃণমূলের অবশ্য দাবি, ভোটের ফলের পিছনে মেরুকরণের ভূমিকা বেশি।

অনুব্রত মণ্ডলের জেলা বীরভূমে ১১টি আসনের মধ্যে বিজেপি এ বার জিতেছে ছটিতে। তৃণমূল পাঁচটিতে। গত বার ফল ছিল তৃণমূলের পক্ষে ১০-১। বিজেপির ধারণা, তৃণমূলের মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোট-ব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাতে পেরেছে তারা। শান্তিপূর্ণ ভোট হওয়ায় মানুষ নিজের মতো ভোট দিয়েছেন। এলাকায় কাজের অভাব, দুর্নীতি, লুট, শাসকদলের নেতাদের একাংশের প্রশ্রয়ে দুষ্কৃতীদের দাপাদাপি, ধর্মীয় মেরুকরণের মতো বিষয়গুলিও উঠে এসেছে তৃণমূলের হারের সম্ভাব্য কারণ হিসাবে। সেই সঙ্গে বীরভূমে একাধিক আসনে হারের পিছনে উঠে আসছে কাজল শেখ ও অনুব্রত মণ্ডলের দ্বন্দ্ব।দুবরাজপুরে তৃণমূলের প্রার্থী, কাজল-ঘনিষ্ঠ নরেশচন্দ্র বাউড়ির কথায়, ‘‘কাজলের প্রার্থী বলে কোর কমিটির সদস্য সুদীপ্ত ঘোষ এবং অনুব্রত মণ্ডলরা আমাকে হারিয়ে দিলেন!’’

হাওড়ার ১৬টি আসনের মধ্যে রাত পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিজেপি এগিয়ে বা জিতেছে সাতটিতে। গত বার ১৬টি আসনই ছিল তৃণমূলের। শহর এবং গ্রামে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট-রাজের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ আট বছর ধরে হাওড়া পুরসভায় নির্বাচন হয়নি। পুর-পরিষেবা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ভোট-যন্ত্রে আছড়ে পড়েছে, মানছেন তৃণমূল নেতারা। প্রাক্তন তৃণমূল পুর-প্রতিনিধি শৈলেশ রাই বলেন, ‘‘মানুষ দিনের পর দিন পুর-পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। এ রায় সে ক্ষোভের কারণেই।’’ তৃণমূলের উদয়নারায়ণপুরের প্রার্থী সমীর পাঁজা-সহ অনেকের অবশ্য দাবি, ‘‘মেরুকরণের সুনামি বয়েছে।’’

কেউ কেউ আবার বিজেপির জয়ের পিছনে সংখ্যালঘু ভোট বাম জোট ও তৃণমূলের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়াকে কারণ বলে মনে করছেন। আমতায় তৃণমূল প্রার্থী সুকান্ত পাল হেরেছেন তিন হাজারের কিছুবেশি ভোটে। সেখানে সিপিএম পেয়েছে ২৩ হাজারের বেশি ভোট। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, সিপিএম সংখ্যালঘুদের বুঝিয়েছে, তারা ক্ষমতায় আসবে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক দিলীপ ঘোষের অবশ্য দাবি, ‘‘এটা বিজেপির মেরুকরণ ছাড়াও, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট। অনেকে মনে করেছেন, বিজেপিই তৃণমূলকে হারাবে।’’ বিজেপি নেতা রমেশ সাধুখাঁর বক্তব্য, এটা উন্নয়নের পক্ষে এবং তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের রায়।

পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৫টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে ২০২১ সালে জিতেছিল তৃণমূল। দু’টিতে জেতে বিজেপি। এ বার হিসাব সেই ১৩-২ আছে। তবে এ বার ১৩টিতে এগিয়ে বিজেপি, দু’টিতে তৃণমূল। সবংয়ে মানস ভুঁইয়া, ডেবরায় রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘ওজনদার’ প্রার্থীরা হেরেছেন। তৃণমূলের দাবি, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) নাম বাদ পড়াদের অনেকেই তাদের সমর্থক। কর্মসংস্থানের অভাব, মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোট-ব্যাঙ্কে ভাঙন এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও হারের বড় কারণ। দলের মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুজয় হাজরা বলেন, ‘‘একাধিক কারণ রয়েছে।’’ বিজেপির জেলা মুখপাত্র অরূপ দাসের মতে, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়নের কাজ দেখেই মানুষ‌ বিজেপিকেসমর্থন করেছেন।’’

পূর্ব বর্ধমানে ২০২১-এ ১৬টি আসনেই জিতেছিল তৃণমূল। এ বার তারা পেয়েছে দু’টি। বাকি ১৪টি জিতেছে বিজেপি। বিজেপির দাবি, বর্ধিত ভাতার প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’-এর কথা তারা প্রচার করেছিল। মহিলারা তাতে আস্থা রেখেছেন। আউশগ্রাম, ভাতার, মেমারি, মন্তেশ্বর, কালনার পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় অংশের ভোট তারা পেয়েছে। পরিযায়ীরা এলাকায় কাজ চান, তাই তাদের ভোট দিয়েছেন। পাশাপাশি, জেলায় ধানের দাম না মেলা, সহায়ক মূল্যে বিক্রির ক্ষেত্রে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ ফড়েদের দাপট, এ বার আলু চাষ করে দাম না পাওয়া, সহায়ক মূল্যে আলু কেনার বিষয়ে তৃণমূলের সরকারের ‘গড়িমসি’ ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছে নানা মহল। মন্তেশ্বরের পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল নিয়েভাবতে হবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Syndicate TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy