E-Paper

বঙ্গেও কি ডি-ভোটার

যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তা হলে অসমের মতো পশ্চিমবঙ্গেও ‘ডিটেনশন সেন্টার’ তৈরি হতেই পারে। সেখানে সন্দেহভাজন নাগরিকদের আটক করে রাখা এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশে পাঠানো বা ‘ডিপোর্ট’ করার পথে হাঁটতে পারে সরকার।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৬:১৫

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম বিবেচনাধীন বা ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ তালিকায় ছিল। মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ৩২ লক্ষের যোগ্যতা নিয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কম-বেশি ৪০ শতাংশ বাদ যেতে পারে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে যাবে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের কি অসমের মতো সন্দেহজনক ভোটার বা ‘ডি-ভোটার’-এর তালিকায়ফেলে দেওয়া হবে? না কি সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে ‘ডিটেনশন সেন্টার’-এ আটক করে রাখা হবে?

রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ মনে করছে, সবটাই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পরে কারা ক্ষমতায় আসছে, তার উপরে। যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তা হলে অসমের মতো পশ্চিমবঙ্গেও ‘ডিটেনশন সেন্টার’ তৈরি হতেই পারে। সেখানে সন্দেহভাজন নাগরিকদের আটক করে রাখা এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশে পাঠানো বা ‘ডিপোর্ট’ করার পথে হাঁটতে পারে সরকার। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে এই বাদ পড়া ভোটারদের নতুন ভোটার হিসেবে তালিকায় নাম তোলা হবে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিহারে এসআইআর শুরুর পরে সংসদে বলেছিলেন, এসআইআর-এর উদ্দেশ্য হল অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করা। যার অর্থ, ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে, নাম বাদ দিয়ে, দেশ থেকে বিতাড়ন করা। শাহের যুক্তি, অনুপ্রবেশকারীরা এ দেশের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, বা কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা ঠিক করতে পারে না।

সরকারি সূত্রের ব্যাখ্যা, পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ বিবেচনাধীন ভোটারদের নথি বিচারকরা খতিয়ে দেখছেন। তাঁরা নাম বাদ দিলে ট্রাইবুনালে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ট্রাইবুনালও যদি কাউকে ভোটার হিসেবে অযোগ্য বলে, বিশেষ করে নাগরিকত্বের মাপকাঠিতে? তা হলে আইন অনুযায়ী তাঁরা ‘নন-সিটিজ়েন’ হয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের ডিটেনশন সেন্টারে রেখে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোরই কথা।

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, বিজেপি আসলে পশ্চিমবঙ্গে অসম-মডেল চালু করতে চাইছে। অসমেও ডি-ভোটার হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে, ফরেনার্স ট্রাইবুনাল তৈরি করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোর বন্দোবস্ত হয়েছে। তাঁদের উচ্চতর আদালতে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বিরোধীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্র সিএএ-এনআরসি করার কথা বলেছিল। তাতে বিরূপ ফল হয়েছে দেখে এখন এসআইআর-এর মাধ্যমে কার্যত এনআরসি করা হচ্ছে।

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে শুধু ভোটাধিকার নয়, ভোটে লড়ার অধিকারও ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অসমে ট্রাইবুনালের মাধ্যমেই ডি-ভোটার বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ মানুষ কী ভাবে ট্রাইবুনালের সামনে গিয়ে লড়বেন?’’ তিনি জানান, তাঁরা মানুষকে আইনজীবী দিয়ে সাহায্য করবেন। বিরোধী শিবিরের মতে, প্রয়োজনে ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে মামলা হবে। প্রদেশ কংগ্রেসের এসআইআর কমিটির প্রধান প্রসেনজিৎ বসু বলেন, ‘‘ট্রাইবুনালে ব্যক্তিগত ভাবে ভোটারদের শুনানি হবে, না কি শুধু ইতিমধ্যেই দায়ের হওয়া নথি দেখে নির্ণয় হবে, সেটা স্পষ্ট নয়। যাঁদের আপিল ট্রাইবুনালে খারিজ হয়ে যাবে, তাঁরা কি অসমের মতো ডি-ভোটার হলে সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এর প্রভাব পড়বে। জনগণনার আগে এনপিআর-এনআরসি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হবে।’’

তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছেন, এর কিছুই হবে না। কারণ বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসবে না। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর বিরুদ্ধে মামলাকারী তৃণমূল সাংসদ দোলা সেন বলেন, ‘‘আশঙ্কার কারণ নেই। এটা অসম নয়। তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরবে। তখন ফর্ম-৬ পূরণ করে সকলের নাম ভোটার তালিকায় তুলে দেওয়া হবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘কেন্দ্র কাউকে ডি-ভোটার করে, বা বেনাগরিক করে দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকানোর সাহস দেখাতে পারবে না।’’

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, কোনও হিন্দুর নাম যাতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায়, তার জন্য তাঁরা সচেষ্ট। শমীক বলেন, ‘‘ভারতে যাঁরা জন্মেছেন, এমন মুসলিমদের নাম বাদের বিপক্ষে আমরা। তবে অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়াটাই স্বাভাবিক।’’ কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য, কোনও ভারতীয়ের নাম যাতে বাদ না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের নাম তালিকায় থাকা কাম্য নয়। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলা এখনও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ গেলে কী হবে, তা নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy