Follow us on
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors

কলকাতায় অতীতের সেনাছাউনির এক গলিতেই লুকিয়ে আছে ধনশাকের মতো খাঁটি পার্সি খাবার

হনসোটিয়া দম্পতির কথায়, বাঙালি ভোজনরসিকরা খাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালবাসেন। তাই ক্রেতা কম হলেও বিক্রি একবারে বন্ধ থাকে না।

অর্পিতা রায়চৌধুরী
| ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২:২৮ শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৬:০৪
ধনশাক এবং সল্লী চিকেন
ধনশাক এবং সল্লী চিকেন

শুধুই বড়দিনের কেক বা ওয়াইন নয়। বো ব্যারাকের গভীরে আছে আরও এক অজানা ইতিহাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই এলাকা ছিল সেনাছাউনি। এখন পরিচিত মূলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের মানুষের পাড়া বলেই। এখানেই এক গলিতে আছে ‘মানেকজি রুস্তমজি ধর্মশালা’। পার্সি সম্প্রদায়ের জন্য এই ধর্মশালা তৈরি হয়েছিল ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে। উদ্দেশ্য ছিল, কোনও কাজ উপলক্ষে কলকাতায় আসা পার্সি সম্প্রদায়ের অতিথির যেন আশ্রয়ের অভাব না হয়। কিন্তু কে এই মানেকজি? প্রসঙ্গত কলকাতার প্রথম ভারতীয় শেরিফ ছিলেন মানেকজি রুস্তমজি। তিনিই কি নামকরণের নেপথ্যে? সে বিষয়ে অবশ্য নথি নীরব।

এক সময় এই অতিথিনিবাস সরব থাকত পর্যটকদের কল্যাণে। সে সময় একটি ঘরের এক দিনের ভাড়া ছিল ৮ আনা। থালাভর্তি খাবার মিলত ২ টাকায়। ১৯৩৬ সালের পরে ঘরভাড়া বেড়ে হয় ১২ আনা। খাবারের দাম হয় সাড়ে ৩ টাকা। এখন কলকাতার পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষ এবং পার্সি পর্যটক, কমেছে দুই-ই। সে রকমই এক সময়ে, আজ থেকে ৮ বছর আগে এ শহরে এলেন দারা এবং মেহর হনসোটিয়া।

হনসোটিয়া দম্পতির আদি বাস ছিল গুজরাতের আমদাবাদে। দারা সরকারি চাকরি করতেন। স্ত্রী মেহর ছিলেন শিক্ষিকা। কিন্তু কয়েক বছর পরে দারা চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নেন। নিজেদের সবরকম যোগ্যতা জানিয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেন তাঁরা। দেশের যে কোনও শহরে চাকরি চান। উত্তর পৌঁছয় কলকাতা থেকে। মানেকজি রুস্তমজি ধর্মশালায় একজন কর্মী দরকার, যিনি রান্নাঘরের সবরকম খেয়াল রাখবেন।

রান্না করতে ভালবাসতেন দারা। বিয়ের পর থেকে বাড়িতে তিনিই সামলাতেন রান্নাঘরের দায়িত্ব। নিয়ে নিলেন নতুন চাকরি। গত ৮ বছর ধরে তিনি সামলাচ্ছেন মানেকজি রুস্তমজি ধর্মশালার রসুইঘর।

কিমা প্যাটিস

কিমা প্যাটিস

স্ত্রী মেহরের ভূমিকা বরং প্রশাসনিক। কলকাতায় খাঁটি পার্সি খাবারের অন্যতম ঠিকানা এই ধর্মশালা। স্ত্রী মেহরের নামেই পরিষেবার নামকরণ করেছেন দারা। তাঁদের উদ্যোগকে রেস্তরাঁ বলতে নারাজ এই দম্পতি। বরং, তাঁদের কথায় বাড়িতে অতিথি আসার মতোই তাঁদের কাছে ক্রেতারা আসেন। আগে থেকে বুক করা না থাকলে খাবার পাওয়া দুষ্কর। কারণ, যে রকম অর্ডার আসে, সে রকমই রান্না হয়।

ভোরে উঠে বাজার করার পরে রান্নাবান্না সেরে ফেলেন দারা। তার পর অতিথিদের অপেক্ষা। সকালের জলখাবারের সঙ্গে পাওয়া যায় দুপুরের ও রাতের খাবারও। হনসোটিয়া দম্পতির কথায়, বাঙালি ভোজনরসিকরা খাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালবাসেন। তাই ক্রেতা কম হলেও বিক্রি একবারে বন্ধ থাকে না। ক্রেতার অর্ডার মতো খাবার তৈরি করেন তাঁরা।

পার্সি খাবার বললেই সবার আগে চলে আসে ধনশাক-এর কথা। দারা বললেন, ‘‘ধান মানে চাল। শাকের অর্থ শাকসব্জি। অর্থাৎ ভাত আর ডালের পদ। সঙ্গে চিকেন, মাটন অথবা মাছ।’’ সাধারণত চার রকম ডাল মেশানো হয়। অড়হর, চানা, দু’রকম মুসুর ডালের মিশ্রণে তৈরি হয় ধনশাকের ডাল। সব্জির মধ্যে থাকে আলু, টমেটো, বেগুন, কুমড়ো এবং মেথিপাতা। সবকিছু রান্না করা হয় ব্রাউন রাইসের সঙ্গে। আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর মশলায়। বাঙালি হেঁসেলের গরমমশলার মতোই একাধিক মশলার সঠিক অনুপানে তৈরি হয় ধনশাক মশলা।

লগান্যু কাস্টার্ড

লগান্যু কাস্টার্ড

তবে গরমমশলার থেকে এর ঝাল বেশ কম। বরং, স্বাদে কিছুটা মিষ্টি। দারা জানালেন, এখনও ধনশাকের মশলা তাঁদের আনাতে হয় মুম্বই থেকে।

তবে রীতি অনুযায়ী, ‘ধনশাক’ হল শোকের অনুষ্ঠানের খাবার। পার্সি পরিবারে কেউ মারা গেলে প্রথম কয়েক দিন মাংস খাওয়া যায় না। তার পর ধনশাকের মধ্যে দিয়ে পাতে মাংস ওঠে। সাধারণত, শুভ অনুষ্ঠানে এই খাবার বর্জন করা হয়। তার বদলে উৎসবে তৈরি হয় মোরি দার, সল্লী বোটি, সল্লী মরঘি, পত্র নি মচ্ছি, সল্লী কিমা, প্রন পাটিয়ো-র মতো খাবার। সঙ্গে মিঠ্ঠু দহি, সেভ, লগান্যু কাস্টার্ড এবং রাভো-র মতো মিষ্টিমুখের আয়োজন।

প্রন পাটিয়ো

প্রন পাটিয়ো

তবু বাঙালি বেশি চায় ধনশাক খেতেই। তাঁদের জন্য দারা-মেহরের হেঁসেলে আছে রকমারি বাকি পার্সি খাবারও। জলখাবারে থাকে পার্সি অমলেট, পার্সি স্ক্র্যাম্বলড এগ এবং ডিম ও পাউরুটির ঐতিহ্যবাহী পার্সি জলখাবার ‘আকুরি’। দারার তৈরি কাটলেটেও নাকি মু্গ্ধ ভোজনসরিকরা। জানালেন তিনি নিজেই।

হনসোটিয়া দম্পতির কাছে কলকাতাই এখন প্রাণের শহর। বাকি জীবন থাকতে চান এখানেই। দুর্লভ এবং জিভে জল আনা পার্সি খাবারের ডালি সাজিয়ে। যে খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল বাসু চট্টোপাধ্যায়ের সেই সিনেমার মতো—‘খট্টা মীঠা’।

আরও পড়ুন