রোদ এসে ঘরের যে কোণটা আলো করে রেখেছে, সেখানে বসে শেখ আক্রম বড় করে জিভটা বার করে দিলেন। সাদা অ্যাপ্রন-পরা দিদিমণি আয়নার মতো করে ধরলেন চৌকোনা ট্যাব। খচাং করে ছবিতে উঠে গেল জিভের ঘা। রোগী আর দিদিমণি, দু’জনেই ছবি দেখে মাথা নাড়ার পর ডাক্তার সেই ছবি দেখলেন। রোগীকে দু’চারটে প্রশ্ন করলেন। বিড়ি খাবেন না, কথা দিয়ে প্রেসক্রিপশন হাতে পেলেন আক্রম। ঝাড়খন্ড সীমান্ত-লাগোয়া গ্রামে বসে কলকাতার ডাক্তারকে দেখানো হয়ে গেল মিনিট কুড়ির মধ্যে। এর নাম টেলিমেডিসিন।
ব্যাপারটা নতুন নয়। আবার খুব যে পরিচিত, এমনও নয়। বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের বড়রা গ্রামে বছর দেড়েক চলছে ‘রুরাল হেলথ কিয়স্ক।’ সেখানে টেলিমেডিসিনের চেহারাটা এই রকম: রোগীর নাম, বয়স, সমস্যার বিবরণ প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা তুলে নেন ট্যাবে। ওজন, রক্তচাপ মাপা হয়। সব তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৌঁছে যায় কলকাতার ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার ফোনে রোগীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রেসক্রিপশনের প্রিন্টআউট স্বাস্থ্যকর্মীরা দিয়ে দেন রোগীকে।
স্কাইপ-এ রোগীর সঙ্গে কথা বলতে পারলে আরও ভাল হত, বলছিলেন ডাক্তার সত্যব্রত আচার্য। হেলথ কিয়স্কের দিদিদের ভাষায় ‘রিমোট ডাক্তার’। কিন্তু গ্রামে ইন্টারনেট-এর স্পিড কম ছিল এত দিন। সদ্য থ্রি-জি নেটওয়ার্ক এসেছে। এ বার হয়তো হবে। প্রযুক্তি বলতে নেট-যুক্ত কম্পিউটার আর মোবাইল (বিপদ লোডশেডিং)। তবে আসল উদ্ভাবন নিজস্ব ‘অ্যাপ’। ট্যাবে প্রশ্ন ভেসে ওঠে, কেবল বোতাম টিপে টিপে কেস হিস্ট্রি লিখে ফেলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। এক অক্ষরও লিখতে হয় না। নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি টিম অ্যাপকে আরও ‘স্মার্ট’ করার কাজ করছে। চৌকস ডাক্তাররা যে তথ্যের ভিত্তিতে যে প্রশ্ন করেন, অ্যাপ পর পর তেমন প্রশ্ন করবে এর পর। বিশদ কেস হিস্ট্রি পেলে রোগ নির্ণয় সহজ হবে ডাক্তারের কাছে।
চাহিদা-জোগানের ফাঁদ
এত নতুন উদ্ভাবন সেই পুরনো সমস্যার মোকাবিলায়। গ্রামে ডাক্তার নেই। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সমীক্ষা বলছে, ভারতে যত ডাক্তার অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করছেন তাঁদের ৫৭ শতাংশেরই ডিগ্রি নেই। এঁদের বাদ দিলে ভারতে ডাক্তারের হিসেব দাঁড়ায় এক লক্ষ মানুষে ৩৬ জন। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর সমান হাল ভারতের।
সরকার কী করছে? স্বাস্থ্য রাজ্যের বিষয়। এ রাজ্যে গত বছর পাঁচেকের হিসেব নিলে ভাল-মন্দ দুটোই চোখে পড়ে। ফ্রি বা ন্যায্যমূল্যের ওষুধ, কম খরচে পরীক্ষা, ফ্রি বেড, চিকিৎসার খরচ কমিয়েছে। সরকারি হিসেব, জেলা বা মহকুমা স্তরে নতুন ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার’ ব্যবস্থা হওয়ায় ৪২ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন। এঁদের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হত, নইলে কপালের ভরসায় পড়ে থাকতে হত। জেলাতে সস্তায় উন্নত পরিষেবা দেওয়ার একটা ঝোঁক সরকারি নীতিতে দেখা যাচ্ছে।
মন্দ দিকটা হল আউটডোর পরিষেবা। কাশি থেকে কোমর ব্যথা, যে কোনওটায় রোগীর প্রথম প্রয়োজন পরামর্শ। গোটা রাজ্যে রয়েছে মাত্র ৯০৯টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, গড়ে ৬৮ হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য একটা কেন্দ্র। এই নিরিখে লাস্ট বয় ঝাড়খন্ড। তার পরেই আমরা, বলছে কেন্দ্রের তথ্য। কিন্তু গড় দিয়েও পুরো সমস্যা মাপা যায় না। উত্তর দিনাজপুরের জনসংখ্যা পুরুলিয়ার চাইতে কিছু বেশি, কিন্তু পুরুলিয়াতে ৫২টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে, উত্তর দিনাজপুরে ১৮টি। জেলার ভিতরেও বৈষম্য, মানচিত্রে দেখা যায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো জড়ো হয়ে আছে বড় সড়কগুলোর কাছাকাছি। এক কথায়, রাজ্যে দারিদ্রের ম্যাপ তৈরি করলে অ-চিকিৎসা, অপচিকিৎসার ম্যাপও তৈরি হয়ে যায়। তবু রাজ্য নতুন সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল খুলতে চায়, নতুন প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র খোলার কোনও পরিকল্পনা আপাতত নেই।
অভাবের উপর রয়েছে অনাস্থা। পূর্ণচন্দ্র ঘোষ সরকারি সমীক্ষায় রেশন কার্ডে গরিব তালিকায় (পিএইচএইচ), কিন্তু যক্ষ্মার চিকিৎসা করাচ্ছেন টেলিমেডিসিন কেন্দ্রে। ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ খেয়ে তিনি এখন রোগমুক্ত। প্রায়ই অন্য রোগী সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। কারণ ওই— সরকারি হাসপাতালে ভরসা নেই।
টেলিমেডিসিন এই পরিস্থিতিতে কাজে লাগতে পারে। গ্রামবাসীর হাতুড়ে-নির্ভরতা ঘুচবে। গ্রামের লোকের ট্রেনিং, চাকরি হবে। চিকিৎসার ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় রোগের নকশার তথ্য মিলবে।
চিন্তাটা সাড়া ফেলেছিল নব্বইয়ের দশকে। আজ দেখা যাচ্ছে, টেলিমেডিসিন ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে অনেকটা সৌরবিদ্যুতের মতো। আইডিয়াটা যত ভাল, ঠিক ততটা কাজের নয়। নানা রাজ্যে আটাশটি টেলিমেডিসিন প্রকল্পের সমীক্ষা করে একটি রিপোর্ট বলছে, সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রকল্প চালানো মুশকিল। কারণ সরকারি ডাক্তারদের জন্য টেলিমেডিসিন বাধ্যতামূলক নয়, বাড়তি টাকাও মেলে না। একটি প্রকল্পে ইসরো ৪২৫টি কেন্দ্রের জন্য যন্ত্রপাতি দেয়। তার ৮৫ শতাংশ ব্যবহার হয়নি। কিছু অসরকারি সংস্থা সরকারি সহায়তায় ভাল কাজ করেছে। কিন্তু তাদের ঝুঁকি, সরকারি ছাড়পত্র মিলতে দেরি, সরকার বদলালে প্রকল্প বাতিল হওয়া। খড়্গপুর আইআইটি ২০০৫ সালে কেন্দ্রের টাকায় টেলিমিডিসিন প্রকল্প শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা। মেয়াদ ফুরোতে ত্রিপুরা সরকার তা চালু রেখেছে, পশ্চিমবঙ্গ রাখেনি।
মাপার উপায়
এখন রাজ্যে টেলিমেডিসিন প্রয়োগ হচ্ছে চোখের চিকিৎসায়। বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে কুড়িটি কেন্দ্র হয়েছে। কর্মীরা (অপথালমোলজিস্ট) চোখ পরীক্ষা করেন, প্রয়োজনে টেলিসংযোগে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারদের পরামর্শ নেন। তিন বছরে এক লক্ষেরও বেশি লোক পরীক্ষা করিয়েছেন। লোকে খুশি, কিন্তু তিন বছরে খরচ পাঁচ কোটি টাকা। কেন্দ্র সহায়তা বন্ধ করলে রাজ্য কি চালু রাখতে পারবে? নতুন নতুন কেন্দ্র খুলতে পারবে কি?
রিপোর্ট বলছে, টেলিমেডিসিনের বড় সমস্যা ‘স্কেল-আপ’ নিয়ে। কয়েকটি কেন্দ্রে যা ভাল কাজ করে, ব্যাপক হারে করতে গেলে সেটাই পড়তায় পোষায় না। বড়রার কেন্দ্রটি চলে ‘ক্রস-সাবসিডি’ মডেলে, জানালেন কর্ণধার শতদল সাহা। একই প্রকল্পের অধীনে হাসপাতাল, ট্রেনিং কোর্স চালিয়ে কিয়স্কের টাকা জোগাড় হয়। নইলে মাথাপিছু চল্লিশ টাকা ফি-তে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাইনে ওঠে না। এই মডেলে কিয়স্কের সংখ্যা বাড়ানো মুশকিল। অথচ ভাল প্রাথমিক স্বাস্থ্যের শর্তই হল ঘরের কাছে চিকিৎসা।
সমস্যা রোগীর দিক থেকেও। বড়রা-র কিয়স্কে আসা রোগীরা প্রায় সকলেই গোড়ায় হাতুড়েকে দেখিয়েছেন। এখনও দেখাচ্ছেন অনেকে। ফলে টেলিমেডিসিন বৈধ চিকিৎসার দরজা খুলে দিলেও অবৈধ চিকিৎসা বন্ধ করতে পারবে বলে ভরসা হয় না। গ্রামের মানুষের আর একটা ‘চয়েস’ বাড়বে শুধু— সরকারি আউটডোর, ডাক্তারের চেম্বার, হাতুড়ের হোম ভিজিট না টেলিমেডিসিনের কিয়স্ক।
তবে সেটুকুও সামান্য নয়। শহরে চিকিৎসা যত ঝকঝকে হচ্ছে, গ্রামের ছেঁড়া-ফাটা ছবিটা অসহ্য হয়ে উঠছে। অনেক ডাক্তার সেই আঘাত অনুভব করেন। প্রত্যন্ত গ্রামে শিবির করে, হাতুড়েদের প্রশিক্ষিত করে, কিংবা টেলিমেডিসিন প্রকল্প করে ‘কিছু একটা করা’-র তাগিদ থেকে মুক্তি পেতে চান। ভাল কথা। কিন্তু সরকারি নীতিকে নজরে না রেখে টুকরো টুকরো কাজ করে বেশি দূর এগোনো মুশকিল। বিশেষত প্রাথমিক স্বাস্থ্যে। সে দিকে তাকালে দুটো কথা মনে হয়।
এক, যে কোনও সরকারি পরিষেবা এখন সূচক-সর্বস্ব। কী টার্গেট, আর কত দূর হল, তার কোনও সহজবোধ্য পরিমাপ না থাকলে কাজটাই দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। মাতৃমৃত্যু, ম্যালেরিয়া বা অপুষ্টির সূচক তৈরি হয়েছে বলেই তা কমাতে এত প্রকল্প। আউটডোর পরিষেবার কোনও সূচক নেই, তাই তার ফাঁক নিয়ে কথা হচ্ছে না। কী পরিষেবা মিলছে, কত জন তা পাচ্ছে, কত সময় লাগছে, অথবা অন্য কোনও পরিমাপ দিয়ে সূচক তৈরি করা, আর তার ফল নিয়মিত প্রকাশ করা, খুব জরুরি।
দুই, সরকারি নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে চিকিৎসাকে, চিকিৎসককে নয়। এর আগেও প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়ে ডাক্তারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা হয়েছে। প্রধানত ডাক্তার সংগঠনগুলোর আপত্তিতে স্বল্পমেয়াদের ডাক্তারি কোর্স, বা নার্স প্র্যাকটিশনার তৈরি হয়নি। ডিজিটাল প্রযুক্তি যদি কাজে লাগাতেই হয়, তাকে ডাক্তারের ক্রাচ করে রাখলে চলবে না। ডাক্তারের সীমা অতিক্রম করতেই
তা কাজে লাগাতে হবে। চিকিৎসার ঝুঁকি নিয়ে শোরগোল তুললে মনে করিয়ে দিতে হবে, অচিকিৎসার ঝুঁকি অনেক বেশি।