সরকারি বাজেটের কি কোনও ‘দর্শন’ হয়? বাজেট মানে তো কতকগুলি আয়-ব্যয়ের হিসাব, তার আবার দর্শন কী? কিন্তু হয়, বাজেটের মধ্যে দিয়ে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক দর্শন প্রতিফলিত হয়। দক্ষিণপন্থী হোক কিংবা বামপন্থী— পুঁজিবাদী হোক বা সমাজবাদী— সরকারের দর্শন মোটামুটি ধরা পড়ে সরকারি বাজেটের মধ্যে। সব ক্ষেত্রেই যে কাঁটায় কাঁটায় মিলে যায়, তা নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই বাজেটে রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতির মেলবন্ধনের আভাস থাকে।
বাজেটে দু’টি খাতে খরচের টাকা বণ্টন করা হয়— রাজস্ব খাত, এবং মূলধনি খাত। রাজ্যের নিয়মিত যে খরচগুলি দরকার, তার জন্য রাজস্ব খাতে অর্থ ব্যয় হয়— যেমন বেতন, পেনশন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক ব্যয়, ভাতা, ভর্তুকি, ধারের সুদ মেটানো ইত্যাদি। আর মূলধনি খাতে খরচ হয় স্থায়ী পরিকাঠামোর জন্য— যেমন রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেচ ব্যবস্থা, বন্দর, জল সরবরাহ, নিকাশি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদি।
বেশির ভাগ রাজ্যেরই মূলধনি খাতে আয় প্রায় নেই বললেই চলে, কারণ একটি রাজ্যের সম্পত্তি বিক্রি করার সুযোগ কম। অর্থ মূলত আদায় হয় রাজস্ব খাতে, রাজ্যগুলির শুল্ক ও নানা রকম ফি-র মাধ্যমে। রাজস্ব আদায় এবং মোট ব্যয়ের মধ্যে যে ফারাকটা থাকে, তা ধার করে ভরাতে হয়। ধার নেওয়ার ব্যাপারটা অনেক সময়ই সরকারের নীতির উপরে নির্ভর করে— রাজস্ব খাতের জন্য ধার করব কি না। যে-হেতু মূলধনি খাতে আয় বিশেষ হয় না, তাই মূলধনি ব্যয়ের টাকাটা ধার করেই তুলতে হয়। কোনও সরকারের নীতি হতে পারে যে, মূলধনি ব্যয় তো বটেই, সেই সঙ্গে রাজস্ব ব্যয়ের জন্যেও কিছুটা ধার করব, কারণ বাজেটে যতটা পরিমাণ রাজস্ব ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, সবটুকু ব্যয় প্রস্তাবিত রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে পূরণ হবে না। আবার কোনও সরকার ভাবতেই পারে যে, রাজস্ব ব্যয়ের টাকা আসবে শুধু রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে, ধারের মাধ্যমে নয়। বরং রাজস্ব খাতে যদি কিছু উদ্বৃত্ত থাকে, তা হলে আরও ভাল— কারণ সেই উদ্বৃত্ত টাকা মূলধনি খাতে খরচ করা যাবে এবং মূলধনি ব্যয়ের জন্য ধার কম নিতে হবে।
এই দু’ধরনের অবস্থানকে দুটো দর্শনে ভাগ করা যেতে পারে— সমাজবাদী দর্শন এবং পুঁজিবাদী দর্শন। প্রথমটা অনেকটাই সরকারি কার্যকলাপ ভিত্তিক উন্নয়নের পথ দেখায়, দ্বিতীয়টা বাজার-কেন্দ্রিক। প্রথম নীতিতে ধার করে হলেও রাজ্যের জনগণের দুঃখকষ্ট মোচনের চেষ্টা হয়, অনেক সময় মানুষের হাতে টাকা দিয়েও তা করা হয়। আর দ্বিতীয় নীতির মাধ্যমে পরিকাঠামো সৃষ্টি করে বাজারকে চাঙ্গা করার চেষ্টা হয়। প্রথম নীতি বাজারে চাহিদা তৈরির মাধ্যমে উন্নয়ন করতে চায়, কারণ অধিক রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে মানুষের হাতে টাকা গেলে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। দ্বিতীয় নীতি বাজারে জোগানের রাস্তা মসৃণ করতে চায়, কারণ পরিকাঠামো বাড়লে শিল্প-বাণিজ্য-কৃষি সবই বাড়বে।
কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ, তা এক কথায় বলা মুশকিল। অর্থনৈতিক মন্দার সময় অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে চাহিদা বাড়ানোর নীতি মন্দ নয়, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সহায়ক নয়। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পরিকাঠামোর উন্নতি ঘটিয়ে জোগানের রাস্তা মসৃণ করাটাই উৎকৃষ্ট উপায়। জোগানের রাস্তা মসৃণ হলে উৎপাদন উৎসাহ পাবে। উৎপাদন বাড়লে জিডিপি, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব তিনটেই বাড়বে। পরিকাঠামোর অভাব আছে, অথচ একটা দেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এমন উদাহরণ যদি থাকেও, তা অত্যন্ত বিরল।
ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত খুব ধীর গতিতে এগিয়ে চলছিল দেশ। বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩-৪%। ১৯৯০ সালে পি ভি নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কংগ্রেস সরকার উদারীকরণ নীতির মাধ্যমে একটা বিপ্লব ঘটাল। যার ফলে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে লাগল এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে গতি আসতে শুরু করল। কিন্তু অন্যান্য শিল্পে তখনও তেমন গতি নেই, বিশেষ করে নির্মাণ ক্ষেত্রে। সমগ্র শিল্পে গতি আনতে গেলে পরিকাঠামো বাড়াতে হবে। কিন্তু পরিকাঠামো বৃদ্ধির অর্থ কোথা থেকে আসবে? এটা কি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়? তারা রাস্তা বানাবে, ব্রিজ বানাবে, বিদ্যুতের ব্যবস্থা করবে এবং তার জন্য ব্যবহারকারীর কাছ থেকে পয়সা নেবে। ঘটনা হল, বেসরকারি সংস্থা সেই অঞ্চলেই অর্থ বিনিয়োগ করবে, যেখানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি। তা হলে দরিদ্র অঞ্চলগুলির কী হবে? গ্রামাঞ্চলের কী হবে? গোটা দেশকে তো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে!
তাই পরিকাঠামোর বিষয়টি সম্পূর্ণ রূপে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। যেমন কলকাতা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে একটি বেসরকারি সংস্থা, কিন্তু কলকাতার বাইরে করে রাজ্য সরকার। কিন্তু, সরকার কী ভাবে পরিকাঠামোয় এই বিপুল বিনিয়োগ করবে— সে আমলে তো রাজ্য সরকারগুলির নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা! মূলধনি ব্যয়ের জন্যে ধার তো নিতেই হয়, এমনকি রাজস্ব ব্যয়ের জন্যেও ধার নিতে হয়। যে কারণে মূলধনি ব্যয় খুব একটা বাড়ানো যায় না, কারণ ঋণ বেড়ে যায়। ফলে, পরিকাঠামোর অভাবে অর্থনীতিও আর চাঙ্গা হয় না। এই দুষ্টচক্রটি তখন একটা কাঠামোর রূপ নিয়েছিল, যাকে ভাঙা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
২০০২ সালে তৎকালীন ভারত সরকার অর্থনীতিবিদ সি রঙ্গরাজনের নেতৃত্বে দ্বাদশ অর্থ কমিশন (যার সময়কাল ছিল ২০০৫-১০) গঠন করে দায়িত্ব দিয়েছিল কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির বাজেটে ইতিবাচক দিশা দেখানোর জন্য। সেই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সব সরকার ‘ফিসক্যাল রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’— সংক্ষেপে এফআরবিএম অ্যাক্ট— পাশ করল। স্বাধীনতার পরে এ পর্যন্ত বাজেটের ইতিহাসে এই আইনটির ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনের বহু ধারার মধ্যে একটি বিষয় ছিল এ রকম: রাজস্ব ব্যয়ের জন্যে কোনও ধার নেওয়া চলবে না— রাজস্ব ব্যয় মেটাতে হবে রাজস্ব আদায়ের টাকায়; এবং রাজস্ব খাতে সম্ভব হলে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সেই উদ্বৃত্ত অর্থ মূলধনি খাতে খরচ করা যায়। একান্তই যদি উদ্বৃত্ত সৃষ্টি না হয়, তবে শূন্য ব্যালান্স রাখতে হবে, কোনও রাজস্ব ঘাটতি চলবে না। এর ফলে বেশ কয়েকটি রাজ্য রাজস্ব খাতে ঘাটতির কাঠামোগত ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, কয়েকটি এখনও পারেনি। যারা বেরিয়ে আসতে পেরেছে, তাদের রাজকোষের স্বাস্থ্য উন্নত হয়েছে। কারণ রাজস্ব খাতে ঘাটতির চাপ কমার ফলে মূলধনি খাতে ব্যয় বেড়েছে। ধার নেওয়ার প্রবণতার উপরেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ক্ষমতাসীন দল যে রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই রাজ্যের অর্থব্যবস্থা পরিচালনা করুক না কেন, এই প্রাথমিক যুক্তি লঙ্ঘন করলেই বিপদ ঘটে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে