পবিত্র মণ্ডলের ‘বন অধিকারহীন সুন্দরবন’ (৩১-৩) সম্পর্কে কিছু কথা। সুন্দরবনের মূল বৈশিষ্ট্য এখানকার বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদ। এই ব-দ্বীপটির দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে এবং এক-তৃতীয়াংশ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিস্তৃত। বতর্মানে সুন্দরবনে ১০২টি দ্বীপ আছে। তাদের মধ্যে ৪৮টিতে মানুষের বসবাস। মূল অরণ্যে যেখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার থাকে, সেটি মোটামুটি সুরক্ষিত এবং এটি সুন্দরবন টাইগার রিজ়ার্ভ (এসটিআর)-এর অধীন। এই অঞ্চলে সুন্দরবনবাসীর গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত। পশ্চিমবঙ্গ বন দফতর বা এসটিআর-এর অনুমতি বিনা এই অরণ্য অঞ্চলে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
এই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই দারিদ্র সীমার নীচে বসবাসকারী। এঁদের মূল জীবিকা মাছ ও কাঁকড়া ধরা। অনেকেই আবার নির্দিষ্ট মরসুমে মধু সংগ্রহে যান। কিন্তু তার সময়সীমা দু’-তিন মাস। কৃষিকাজ এখানে খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। তার কারণ, লবণাক্ত জল, ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার প্রাবল্য। এই মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহের জন্য এঁদের পশ্চিমবঙ্গ বন দফতর কিংবা সুন্দরবন টাইগার রিজ়ার্ভ কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র নিতে হয়। প্রতি বছর মাছ, কাঁকড়া এবং মধু সংগ্রহকারীদের মধ্যে কেউ না কেউ বাঘের শিকার হন। এঁদের মধ্যে যাঁরা অনুমতি না নিয়ে গিয়ে বাঘের শিকার হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের পক্ষে সরকারি সাহায্য পাওয়াও দুষ্কর হয়ে ওঠে।
এখানে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। অনুমতিপত্র দেওয়ার সময় শর্ত থাকে— একটি নির্দিষ্ট সময়ে এবং দলবদ্ধ অবস্থায় জঙ্গলে যেতে হবে। ওই সময় বনরক্ষী বাহিনী এঁদের সুরক্ষার জন্য নিয়োজিত থাকে। তারা বনের বেশি গভীরে যেতে অনুমতি দেয় না। তা ছাড়া, বাঘের চলাফেরার রাস্তা ম্যাপিং ও বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে বন দফতর এই মানুষদের সতর্কও করে দেয়। যদিও বেশি মাছ, কাঁকড়া পাওয়ার আশায় অনেকেই একা একা ভোরবেলা বা বিকেলে, সন্ধ্যার মুখে মাছ-কাঁকড়া ধরতে বেরিয়ে যান। এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রবন্ধকার বর্ণিত বন অধিকার শেষ পর্যন্ত বনবাসীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠবে না তো?
তবে বিএলসি আর নতুন করে বণ্টন করা হয় না। বংশ পরম্পরায় বিএলসি অধিকারীরা বিএলসি পেয়ে থাকেন। দেখা গেছে, বিএলসি প্রাপকরা আদৌ এই সব কাজে আর নিযুক্ত নন। যাঁরা যুক্ত, তাঁদের বিএলসি জোটে না। অনুমতিপত্রের জন্য তাঁদের কুড়ি থেকে ষাট হাজার টাকা দিতে হয়। ফলে আয়ের অনেকটাই চলে যায় এই খাতে।
সর্বোপরি, এই সব জীবিকা আর তেমন আকর্ষণীয় নেই, প্রতিযোগিতাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, তার উপর প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা, জীবনের, জীবিকার। তাই এই এলাকার বাসিন্দারা কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে চলে যান।
সজল কুমার মাইতি, কলকাতা-৯৭
ভাষা
বিশ্বজিৎ রায়ের “‘অকারণ’ নয় ‘আনখাই’” (২৯-৩) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। শৈশবে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত আমি পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে প্রথমেই লজ্জা পেয়েছিলাম নিজের ভাষার জন্য। তখনও বোঝার বয়স হয়নি যে, এই আঞ্চলিক বাংলা ভাষাই আমার মাতৃভাষা। আঞ্চলিক ভাষা কোনও এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যাপনের কথ্যরূপ, যার উচ্চারণ, শব্দভান্ডার, বাক্যগঠন প্রমিত ভাষা থেকে ভিন্ন হয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির পরিচয় বহন করে। কিন্তু পাঠ্যবই বা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য খাস বাংলা ব্যবহার করা হয়। তাই লেখাপড়ার জন্য ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ভাষা ছেড়ে প্রমিত ভাষায় নিজেকে অভ্যস্ত করে নিতে হয়।
আঞ্চলিক ভাষার এমন অনেক শব্দ আছে, যেগুলোর প্রমিত শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের ভাষা বুঝতে না পেরে হাসাহাসি করে। আঞ্চলিক ভাষার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতেই প্রমিত ভাষা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আঞ্চলিক ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং শিক্ষার অন্তর্ভুক্তিকরণ বৃদ্ধি পায়। তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলা ও ইংরেজি ভাষা জানার প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম।
কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি
ব্রাত্য পরিবেশ
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলির ভোট-ইস্তাহার সাধারণ মানুষের কাছে ভবিষ্যতের দিশা দেখায়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে নির্বাচন-পূর্ব ইস্তাহারগুলি খুঁটিয়ে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও এ দেশে প্রান্তিক অবস্থায় রয়ে গিয়েছে। কিছু ইস্তাহারে পরিবেশের উল্লেখ থাকলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সীমিত ও সাধারণ প্রতিশ্রুতি। দূষণ কমানো, জল সংরক্ষণ বা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির কথা বলা হয়, কিন্তু কী ভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা, সময়সীমা বা পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য প্রায়শই অনুপস্থিত। ফলে প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, প্রশ্ন থেকে যায়।
শিল্পায়ন ও পরিকাঠামো উন্নয়নের উপর জোর ক্রমশ বাড়ছে। নতুন রাস্তা, সেতু, নগরায়ণ— এ সব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এর ফলে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে, স্পষ্ট আলোচনা খুব কমই দেখা যায়। কোথাও দূষণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নেই, কোথাও পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব নেই। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় থাকছে না। পশ্চিমবঙ্গের বাস্তব পরিস্থিতি এই অবহেলাকে আরও গুরুতর করে তোলে। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল অঞ্চল ঝুঁকির মুখে পড়ছে, নদীভাঙনে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন, গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহ বাড়ছে, শহরে বায়ুদূষণ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এগুলি আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা।
কেন এই অনীহা? পরিবেশের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ কম। তাই ভোটের রাজনীতিতে এটি অগ্রাধিকার পায় না। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। কারণ পরিবেশগত ক্ষতি এক বার হলে তা সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পরিবেশকে আলাদা কোনও খাত হিসেবে নয়, উন্নয়নের মূল অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শিল্পায়নের সঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নগরায়ণের সঙ্গে সবুজ এলাকা সংরক্ষণ, কৃষির সঙ্গে জল ব্যবস্থাপনা— এই সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভোট-ইস্তাহারে তাই শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা। কী ভাবে দূষণ কমবে, জল সংরক্ষণ হবে, কী ভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা পাবে— এই প্রশ্নগুলির পরিষ্কার উত্তর থাকা উচিত। গণতন্ত্রে মানুষের চাহিদাই শেষ কথা। মানুষ যদি পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেয়, তা হলে ইস্তাহারেও তার প্রতিফলন ঘটতে বাধ্য।
রণজিৎ পাল, খোসবাগান, পূর্ব বর্ধমান
খুচরো নেই
দশ, কুড়ি টাকার খুচরো বাজার থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে মূলত ছোট মুদিখানা, কাঁচা আনাজের বাজারে। দরিদ্র আনাজ বিক্রেতারা বাজারে অস্থায়ী ভাবে বসেন। এঁদের কাছে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা থাকে না বললেই চলে। ক্রেতারা বিশ-ত্রিশ টাকার জিনিস কিনে একশো টাকার নোট ধরাচ্ছেন। ফলে উভয়েরই নাভিশ্বাস উঠছে। বাস কন্ডাক্টরদের কাছেও দশ-কুড়ি টাকার খুচরো থাকছে না, অটো-টোটোর অবস্থা আরও খারাপ।
অরূপ মুখোপাধ্যায়, শ্রীরামপুর, হুগলি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে