ইভিএম যন্ত্র খতিয়ে দেখছেন ভোটকর্মীরা। —ফাইল চিত্র।
রাজ্যের প্রতিটি বুথে নজরদারির জন্য এ বার কৃত্রিম মেধা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে নির্বাচন কমিশন। কোনও বুথে কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়লেই, তা সরাসরি কন্ট্রোল রুমে জানিয়ে দেবে এআই। ভোটের দিন প্রত্যেক বুথে কমিশনের ‘চোখ’ হয়ে ৩৬০ ডিগ্রি নজরদারি চালাবে ক্যামেরা।
পশ্চিমবঙ্গে অবাধ এবং সুষ্ঠু ভোট করানোর জন্য একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বুথে বুথে নজরদারিকে যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা শনিবার বিকেলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ কুমার আগরওয়াল। তিনি জানান, ওয়েব কাস্টিংয়ের জন্য প্রতিটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরবে, এমন ক্যামেরা লাগানো হবে। প্রতিটি বুথে এমন দু’টি করে ক্যামেরা বসানো হবে। বুথের ভিতরে যেমন ক্যামেরা বসবে, তেমনই বসবে বুথের বাইরেও। প্রয়োজন অনুযায়ী, কোনও বুথে তিনটি ক্যামেরাও লাগানো হতে পারে।
এ বারের ওয়েব কাস্টিংয়ে চার ধাপে নজরদারি চালানো হবে। প্রথম ধাপে থাকছেন রিটার্নিং অফিসার। এর পরে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক, তার পরে সিইও এবং দিল্লির নির্বাচন সদন থেকেও চলবে নজরদারি। পাশাপাশি এই ওয়েব কাস্টিংয়ের উপর নজরদারির জন্য নির্দিষ্ট ভাবে একটি দলও কাজ করবে।
কমিশন সূত্রে খবর, বুথে বসানো এই ক্যামেরাগুলিতে বিশেষ এআই প্রযুক্তি থাকবে। কোনও বুথের ভিতরে একসঙ্গে অনেকে ঢুকে গেলে তা ধরা পড়ে যাবে ক্যামেরায়। কন্ট্রোল রুম থেকে যাঁরা নজরদারির দায়িত্বে থাকবেন, তাঁদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে যাবে। আবার ইভিএম-এর সামনে এক জনের বদলে দু’জন চলে গেলে, তা-ও ধরা পড়বে ক্যামেরার সেন্সরে।
রাজ্যে নিযুক্ত কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত জানান, মক পোলের সময় থেকেই নজরদারি শুরু হয়ে যাবে। সব জেলাতেই কন্ট্রোল রুম চালু থাকবে। সিইও অফিসের কন্ট্রোল রুমে দু’জন আধিকারিক নিয়োগ করা হবে এই নজরদারির জন্য— এক জন স্ক্রিন দেখে বলবেন এবং অন্য জন তা নোট করবেন। সব বুথে ক্যামেরা সচল রয়েছে কি না, তা ভোটের আগের দিনই নিশ্চিত করা হবে।
কমিশন আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ইতিমধ্যে নজরদারির কাজ শুরু করেছে ফ্লাইং স্কোয়াডের গাড়ি। ওই গাড়িতে লাগানো ক্যামেরা সিইও অফিস থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সব মিলিয়ে মোট ৬৬০টি টিভিতে নজরদারি চালানো হবে। সব বুথের ছবি দেখা যাবে সিইও অফিসে। কোনও ধরনের অশান্তি যে বরদাস্ত করা হবে না, তা শনিবার বিকেলের সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন সিইও এবং বিশেষ পর্যবেক্ষক।
কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রত্যেক বুথের বাইরে ওই বুথ সংক্রান্ত তথ্য টাঙিয়ে রাখা থাকবে। ভোটকক্ষে প্রবেশের মুখে মোতায়েন থাকবেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জন জওয়ান। তাঁর মোবাইল নম্বরও টাঙানো থাকবে বুথের বাইরে। প্রিসাইডিং অফিসার, সেক্টর অফিসারদের মোবাইল নম্বরও প্রকাশ করা হবে সেখানে। কমিশন আশ্বস্ত করেছে, কোথাও কোনও অসুবিধা হলে সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ করা হবে। ভোটের লাইনে ভোটারদের পরিচয়পত্র যাচাইয়ের কাজ করবেন বুথ লেভেল অফিসারেরা।
কমিশন আরও জানিয়েছে, কোথাও বুথদখল বা ভোটারদের হুমকি, ভোটদানে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে কমিশন মনে করলে, সেখানে ভোটপর্ব বাতিল করে পুনর্নির্বাচন করানো হবে। সরকারি আধিকারিকেরাও কেউ ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে তিন-পাঁচ বছরের জেল এবং জরিমানা হতে পারে তাঁদের। কমিশন এ-ও জানিয়ে দিয়েছে, এ বার আধাসেনা এবং পুলিশকে সক্রিয় ভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোন ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ করতে হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের ভাষায়, “কেউ যদি গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করেন, তিনি নিজ দায়িত্বে সব কিছু করবেন। কারণ পুলিশ এবং আধাসেনাকে সক্রিয় ভাবে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
প্রতিটি বুথে তিন-চারটি ঘড়ি লাগানো থাকবে বলেও জানিয়েছে কমিশন। ভোটগ্রহণের শেষ সময় বিকেল ৫টা। ওই সময় পর্যন্ত যাঁরা লাইনে দাঁড়াবেন, তাঁদের ভোট নেওয়া হয়। কমিশন জানিয়েছে, বিকেল ৫টা বেজে গেলেই প্রিসাইডিং অফিসার লাইনের শেষ থেকে প্রত্যেকের হাতে হাতে স্লিপ বিলি করবেন। বিকেল ৫টার পরে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছোনোর পরে কেউ যাতে বেআইনি ভাবে ভোট দিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে।