বিরাট কোহলি। —ফাইল চিত্র।
আইপিএলের মাঝেই রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর পডকাস্টে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিরাট কোহলি। উপস্থাপিকা মায়ান্তি ল্যাঙ্গারের সঙ্গে কথা বলার সময় উঠে এসেছে নানা প্রসঙ্গ। ভারতীয় দলের অধিনায়ক থাকার সময় থেকে এখনকার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। নিজের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ক্রিকেটপ্রেমীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন কোহলি।
টেস্টজীবন
টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে কোহলি বলেছেন, ‘‘অনেক দিন টেস্ট খেলেছি। ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছি। বেশ কিছু দুর্দান্ত জয় পেয়েছিলাম আমরা। আমার মনে হয়, আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের একটা সোনালি অধ্যায় ছিল সেটা। তখন আমাদের দলে এমন সব তরুণ ক্রিকেটার ছিল, যারা টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চাইত। আমরা সকলে তরুণ বয়সেই জীবনের সেরা সুযোগটা পেয়েছি। আমাদের মধ্যে বয়সের পার্থক্য খুব বেশি ছিল না। ধরুন চেতেশ্বর পুজারা, অজিঙ্ক রাহানে, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ইশান্ত শর্মা, মহম্মদ শামি, রবীন্দ্র জাডেজার কথা বলব। সকলের বয়স ছিল কুড়ির ঘরে। এমন একটা দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি, যে দলের গড় বয়স ছিল বেশ কম। আমরা দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা সব ভাগ করে নিতাম। বিদেশের মাটিতেও আমরা প্রচুর সাফল্য পেয়েছি।’’
টেস্ট দলের নেতৃত্ব
টেস্ট দল নিয়ে কোহলি আরও বলেছেন, ‘‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমাদের দলে সিনিয়র এবং জুনিয়র ক্রিকেটারদের মধ্যে বয়সের বেশি তফাত ছিল না। সকলেই শুরুর দিকে সিনিয়রদের সঙ্গে খেলেছি। পরে জুনিয়রদের সঙ্গেও আমরা বন্ধুর মতো মেশার চেষ্টা করেছি। আমি হয়তো অধিনায়ক ছিলাম। টিম ম্যানেজমেন্ট আমাদের পথ দেখাত। তবে সকলের বয়স কাছাকাছি হওয়ার সব কিছু ভাগ করে নেওয়ার একটা ব্যাপার ছিল। কয়েক জন মিলে দল চালাবে এমন কোনও ব্যাপার ছিল না। সকলে দায়িত্ব নিত। আমাদের মনে হয়েছিল, কী করে কয়েক জন তরুণ মিলে আগামী ছয়, সাত বা আট বছরের একটা দল গড়ে তোলা । কী করে আরও ভাল পারফর্ম করা যায়। আমরা নিজেদেরই প্রশ্নের মুখে ফেলতাম।’’ ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতের টেস্ট অধিনায়ক হয়েছিলেন কোহলি। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি চোটের জন্য খেলতে পারেননি। সে সময় সহ-অধিনায়ক কোহলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিরাট কোহলি। — ফাইল চিত্র।
বেঙ্গালুরুর আইপিএল জয়
আরসিবির সাক্ষাৎকারে স্বাভাবিক ভাবেই এসেছে আইপিএল এবং বেঙ্গালুরুর প্রথম বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রসঙ্গ। গত বছর আইপিএল জয়ের অনুভূতি নিয়ে কোহলি বলেছেন, ‘‘ফাইনালের শেষ ওভারের শেষ চার বলের অনুভূতি এখনও বলে বোঝাতে পারব না। একটা কথা বলতে পারি, আগে যদি কখনও আইপিএল জিততাম, তাহলে হয়তো ওই আনন্দের পাঁচ শতাংশও পেতাম না। সব ধরনের মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ বলতে পারেন। টানা ১৮ বছরের চেষ্টায় আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি আমরা। এটুকু বলব, ক্রিকেটজীবনে এর চেয়ে ভাল অভিজ্ঞতা আর হয় না।’’ আইপিএল জিততে না পারলে কতটা আক্ষেপ থাকত? কোহলি বলেছেন, ‘‘না, জিততে না পারলে সারাজীবন আক্ষেপ থাকত, এমন নয়। তবে একটা অতৃপ্তি থাকত। হয়তো ভবিষ্যতে কখনও ভাবতাম, বিশেষ মুহূর্তটার অনুভূতি কেমন হত।’’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘‘শুরুর দিকে শিরোপাকে স্বীকৃতি বা অর্জন হিসাবে দেখতাম। পরে ভেবেছি, সেটাই সব নয়। সেমিফাইনাল বা ফাইনাল নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি থাকে। কারণ এই ম্যাচগুলোর সঙ্গে একটা অনিশ্চয়তা জড়িয়ে থাকে। খেতাব জেতার সুযোগ রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে কাজটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষের নজর থাকে। প্রত্যাশা থাকে। তাই শুধু ট্রফি জেতা নয়, মাঠে পারফর্ম করার সময় ক্রিকেটপ্রেমীদের অনুভূতি, আবেগের মর্যাদা দেওয়াও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে কতটা প্রভাব তৈরি করতে পারছি, সেটাই আসল।’’
বিরাট কোহলি। — ফাইল চিত্র।
উত্তেজক সময় মাঠের বাইরে থাকলে
ম্যাচের উত্তেজক সময়ে ডাগআউটে বসে থাকার অনুভূতি কেমন? কোহলি বলেছেন, ‘‘মাঠের বাইরে বসে খেলা দেখলেও একটা চাপ থাকে। যেমন কয়েক দিন আগে ক্রুণাল পাণ্ড্যের মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে ইনিংসটার সময়ের কথাই বলছি। ও রকম সময় একটা উত্তেজনা কাজ করে। ভিতরে একটা শক্তি তৈরি হয়। যেটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। এই ধরনের মুহূর্তগুলো এখনও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।’’
টি-টোয়েন্টিতে ক্রুণাল, ভুবনেশ্বরদের সাফল্য
এক ঝাঁক তরুণের মধ্যেও ক্রুণাল, ভুবনেশ্বর কুমারদের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারেরা যে ভাবে পারফর্ম করে চলেছেন, তাতে খুশি কোহলি। এ নিয়ে বলেছেন, ‘‘একই লক্ষ্য অর্জনের ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। প্রত্যেকের খেলার নিজস্ব ধরন রয়েছে। যেমন ধরুন গ্রেম স্মিথ। খেলা দেখে মনে হত, ওর পক্ষে সোজা ব্যাটে অফ সাইডে শট খেলা কঠিন। আবার অন সাইডে আটকে রাখা কঠিন। অথচ তিনি অত্যন্ত সফল টেস্ট ব্যাটার এবং অধিনায়ক। সচিন তেন্ডুলকর বা এবি ডিভিলিয়ার্সের মতো নিখুঁত ছিলেন না। ব্যাটিংয়ে ধরন অত গোছানো ছিল না। এমন অনেক ক্রিকেটারই রয়েছেন। তাঁরাও তো সফল হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন। এটা দর্শকদের জন্য যেমন আনন্দের তেমনই ক্রিকেটের জন্যও ইতিবাচক। আবার লোকেশ রাহুল বা ভুবনেশ্বরেরাও সফল।’’ এ প্রসঙ্গে কোহলির ব্যাখ্যা, ‘‘খেলার কিছু কৌশলগত দিক রয়েছে। যেগুলো কখনও পুরনো হবে না। টেকনিক প্রয়োজন। ভারসাম্য প্রয়োজন। আমরা যেহেতু ছোট থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে চর্চা, পরিশ্রম করেছি, তাই টেস্ট খেলার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। দক্ষতা থাকলে সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।’’
অবসরের ভাবনা
মায়ান্তির সঙ্গে কথায় উঠে এসেছে অবসরের প্রসঙ্গও। কোহলি বলেছেন, ‘‘আমার দৃষ্টিভঙ্গি খুব পরিষ্কার। যে পরিবেশ বা আবহের মধ্যে রয়েছি, তাতে যদি আমার ভূমিকা বা অবদান থাকে, তা হলে ঠিক আছে। যদি দেখি আমাকে দক্ষতা এবং যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হচ্ছ, তা হলে সরে যাব। কারণ আমি সব সময় নিজের প্রস্তুতি নিয়ে সৎ থাকি। মন দিয়ে খেলি। কঠোর পরিশ্রম করি। ক্রিকেটজীবনে যা কিছু পেয়েছি, তার জন্য ঈশ্বরের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এমন সব সুযোগ পাওয়ার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। মাঠে নামলে সব সময় নিজের ১০০ শতাংশ দেওয়ার চেষ্টা করি। কোনও খামতি রাখতে চাই না। এ ব্যাপারে সব সময় সৎ থাকি।’’
বিরাট কোহলি। — ফাইল চিত্র।
ক্রিকেটীয় প্রস্তুতি
কী ভাবে প্রস্তুতি নেন? ৩৭ বছরের কোহলি বলেছেন, ‘‘সকলের মতোই পরিশ্রম করি। অনেকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করি এখনও। ক্রিকেটটা যে ভাবে খেলা উচিত, ঠিক সে ভাবেই খেলার চেষ্টা করি। কেউ যদি চান একটা এক দিনের ম্যাচে ৪০ ওভার ধরে শুধু বাউন্ডারি মারি, তা হলে সেটাই করব। এ সব নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই। কারণ আমি দলের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিই। ক্রিকেটজীবনের শেষ বল ভেবে ৫০ ওভার ধরে ব্যাট করে যেতে পারি। সে ভাবেই খুচরো রান নেওয়ার জন্য দৌড়োব। দল যেমন চাইবে, সব কিছু তেমন করার চেষ্টা করি।’’ প্রস্তুতি নিয়ে আরও বলেছেন, ‘‘আমি কী করতে পারি, জানি। জীবনে সে ভাবেই চলার চেষ্টা করি। কোনও সিরিজ়ের দু’তিন সপ্তাহ আগে থেকে হঠাৎ কঠোর পরিশ্রম শুরু করি না। সারা বছর এক ভাবে চলার চেষ্টা করি। বছরের যে কোনও সময় আমাকে যদি বলা হয়, একটা সিরিজ় খেলতে হবে, তা হলেও মাঠে নেমে পড়তে পারব। সব সময় প্রস্তুত থাকি। দৈনন্দিন জীবন সে ভাবেই সাজিয়ে নিয়েছি। নিয়মিত শরীরচর্চা করি। নিয়ম মেনে ভাল খাওয়াদাওয়া করি। এ ভাবেই জীবন কাটাতে ভালবাসি। শুধু ক্রিকেটের জন্য নয়। নিজের জন্যও কিছু বিষয় মেনে চলি। ২০২৭ সালের বিশ্বকাপ খেলতে চাই বলেই নিয়ম মেনে চলছি। আগামী বিশ্বকাপ নিয়ে প্রায়ই কথা বলতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা তো সবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছি।’’
২০২৭ বিশ্বকাপ খেলবেন?
কোহলি বলেছেন, ‘‘আমার উত্তর খুব পরিষ্কার। অবশ্যই বিশ্বকাপ খেলতে চাই। সে জন্যই তো খেলে যাচ্ছি। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার অনুভূতিই আলাদা। জামাকাপড় নিয়ে বাড়ির বাইরে এত দিন কেন রয়েছি? বিশ্বকাপ খেলব কি না জানি না— এ রকম কথা বলতে রাজি নই। তবে শুধু আমি চাইলেই হবে না। দলের চাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি খেলা চালিয়ে যেতে চাই। কারণ ক্রিকেট খেলতে ভালবাসি। ক্রিকেট, ব্যাটিং এখনও উপভোগ করি। এখন শুধু নিজের খেলাতেই মনোযোগ দিতে চাই। লক্ষ্য স্থির না থাকলে, কী করে নিজেকে পরিচালিত করব। এত দিন ধরে খেলছি। এটাই কি যথেষ্ট উৎসাহের নয়?’’ দলে থাকা নিয়ে আপনি কি নিশ্চিত? কোহলি বলেছেন, ‘‘চাইব আমাকে প্রথমেই যা বলার বলে দেওয়া হোক। মনে হলে সরাসরি বলে দিক, আমি যথেষ্ট ভাল নই বা আমাকে আর দরকার নেই। কিন্তু যদি মনে করেন আমি এখনও যথেষ্ট ভাল এবং আপনাদের অন্য ভাবনা নেই, তা হলে চুপ থাকুন। শুধু ফলাফলের জন্য বার বার দলে পরিবর্তন করলে ধারাবাহিকতা থাকে না। এটা আমার অপছন্দ। আগেই বলেছি, আমি জানি কী করতে পারি, দলকে কতটা সাহায্য করতে পারি। নিজের মধ্যে কোনও দ্বিধা নেই আমার।’’