পেপ গুয়ার্দিয়োলা। ছবি: রয়টার্স।
দশ বছর আগে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির কোচ হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে হইচই হয়েছিল বটে। তবে প্রত্যাশার চেয়ে কমই। তিকিতাকা ফুটবল দিয়ে বার্সেলোনাকে বিশ্বজয়ী করালেও বা বায়ার্ন মিউনিখকে বিধ্বংসী দল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করালেও, সমালোচকদের নখদন্ত তখনও বাইরে ছিল। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এটা প্রিমিয়ার লিগ। তিনি যতই অন্য দেশে সাফল্য পেয়ে আসুন, বিশ্বের কঠিনতম ফুটবল লিগে সাফল্য পাওয়া অত সোজা নয়। প্রথম মরসুমে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি কোনও ট্রফি না জেতায় নতুন নামও পেয়ে গিয়েছিলেন পেপ গুয়ার্দিয়োলা। তাঁকে ডাকা হয়েছিল ‘ফ্রডিয়োলা’ নামে। ‘ফ্রড’, অর্থাৎ প্রতারক।
দশ বছর পর এখন সেই নাম অর্থহীন। ম্যাঞ্চেস্টার সিটির একটিও ম্যাচ না দেখা ফুটবল ভক্তও স্বীকার করে নেবেন, ইংল্যান্ডের ফুটবলের অন্যতম সেরা কোচ গুয়ার্দিয়োলাই। তাই স্পেনীয় কোচের পদত্যাগের সিদ্ধান্তে যে একটি যুগের অবসান হতে চলেছে এ কথা বলাই যায়।
এখনও সরকারি ভাবে পদত্যাগের কথা জানাননি গুয়ার্দিয়োলা। সিটির এক সূত্র জানিয়েছেন, আরও এক বছর চুক্তি রয়েছে তাঁর। তবে গত কয়েক মাস ধরেই গুয়ার্দিয়োলার দায়িত্ব ছাড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গত মরসুমের শেষের দিকে তিনি বলেছিলেন, “লোকে যে ভাবে চায় সে ভাবে মনে রাখুক আমাকে। সিটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার পর আমি থামব। অবসর নেব কি না জানি না। তবে বিরতি নেব অবশ্যই।”
৫৫ বছরের গুয়ার্দিয়োলা বিরতি নিতেই পারেন। সিটির হয়ে দশ বছরে তিনি যে সব ট্রফি জিতেছেন, তা অনেকে সারা জীবনেও জিততে পারেন না। ছ’টি লিগ, তিনটি এফএ কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। শুধু অ্যালেক্স ফার্গুসনের এর থেকে ভাল নজির রয়েছে। লিভারপুলের প্রাক্তন কোচ জুরগেন ক্লপ বলেছিলেন, “পেপই বিশ্বের সেরা কোচ। আমার ধারণা সকলেই এটা মানতে রাজি হবে।”
বাকিদের থেকে গুয়ার্দিয়োলা আলাদা হয়ে উঠেছেন সিটিকে ধারাবাহিক এবং অপ্রতিরোধ্য করে তোলার জন্য। খেলার কৌশল বদল, নতুন ফুটবলার আনা, তিনটি আলাদা প্রজন্ম তৈরি— এত কিছুর পরেও তাঁর দলের সাফল্য কমেনি। প্রথম যে ফুটবলারদের হাতে পেয়েছিলেন, সেই দল গড়ে উঠেছিল ডেভিড সিলভাকে কেন্দ্র করে। পরে সেই সৃষ্টিশীলতার ভার যায় কেভিন দ্য ব্রুইনের হাতে। এই দুই দলের খেলায় বার্সেলোনার পাসিং ফুটবলের ছাপ ছিল, যা ইংরেজ ফুটবল কোনও দিন দেখেনি। এক মরসুমে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট এবং সবচেয়ে বেশি গোলের নজিরও এই সময়েই।
সিটির পরের প্রজন্মে গুয়ার্দিয়োলার দলের ফুটবল আরও সরাসরি, আরও শত্তিশালী এবং আরও বেশি ইংরেজময়। সেই দল গড়ে উঠেছে গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডকে কেন্দ্র করে। এই সময়েই সিটি জিতেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। সেই সময়ে গুয়ার্দিয়োলা বলেছিলেন, “ক্লাবের কাছে এই ট্রফি বিরাট স্বস্তির। অবশেষে মানুষ আর প্রশ্ন করবে না যে, আমি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছি কি না।”
তিনটি পর্বেই ম্যাঞ্চেস্টার সিটি দলে যথেষ্ট বিকল্প ছিল। গুয়ার্দিয়োলার অধীনে সিটির মালিকেরা ১৯,৩৫৯ কোটি টাকা খরচ করেছেন, যাতে স্পেনীয় কোচের দর্শন অনুযায়ী ফুটবল খেলতে দলের অসুবিধা না হয়। বালঁ দ্যর জয়ী তারকা থেকে তরুণ প্রতিভা, সবই রয়েছে তাঁর দলে। কখনও ব্যয়ের জন্য প্রশ্ন তোলা হয়নি।
তবে এটাও ঠিক, আয়ের চেয়ে বেশি খরচ করার জন্য সিটির বিরুদ্ধে ১১৫টি মামলা ঝুলছে। ক্লাব সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। যদিও সেই অভিযোগ প্রমাণিত হলে সিটিকে খেলতে হবে দ্বিতীয় ডিভিশনে। তাতে অবশ্য গুয়ার্দিয়োলার কিছু যায় আসে না। তিনি প্রিমিয়ার লিগকে বদলে দিয়েছেন। গুয়ার্দিয়োলাকে থামাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন অনেক কোচ। বিশেষ কেউ সাফল্য পাননি। জুরগেন ক্লপের মতো কোচকেও বার বার হতাশ হতে হয়েছে। সিটি ড্যাংড্যাং করে গত আট বছরের মধ্যে ছ’বার লিগ জিতেছে।
এই সাফল্য গুয়ার্দিয়োলার একার নয়। তাঁর সহকারী ছিলেন, কিন্তু এখন অন্যত্র সফল হয়েছেন এমন কোচের সংখ্যাও প্রচুর। ভিনসেন্ট কোম্পানি খেলেছেন গুয়ার্দিয়োলার অধীনে। এখন তিনি গুয়ার্দিয়োলারই প্রাক্তন দল বায়ার্নের কোচ। বার্সেলোনায় গুয়ার্দিয়োলার অধীনে থাকা লুই এনরিকে গত বছর প্যারিস সঁ জরমঁকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়েছিলেন। এ বছরও তারা ফাইনাল খেলবে।
অত দূরে না গেলেও চলবে। মঙ্গলবার রাতে ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে আর্সেনাল। সেই দলের কোচের নাম মিকেল আর্তেতা, যিনি সিটিতে বেশ কিছু বছর গুয়ার্দিয়োলার পাশে বসেছেন। অর্থাৎ, গুয়ার্দিয়োলা নিজেই সাফল্য পাননি, তৈরি করে গিয়েছেন উত্তরাধিকার। তিনি কোচিং থেকে বিরতি নিলেও তাঁর দর্শন বিরতি নিচ্ছে না এখনই।