BJP Organisational Meeting

বৈঠকের ব্যানারে ছবির বিন্যাস নিয়ে আপত্তি তুললেন শমীক, নিজের ছবি সরিয়ে শুভেন্দুর ছবি সামনে আনার নির্দেশ দিলেন!

শুক্রবারের বৈঠকে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফ থেকে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল এবং সহকারী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অমিত মালবীয়।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ ২১:২৩
Share:

শমীক ভট্টাচার্য। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

শৃঙ্খলা, সংগঠন সজ্জা এবং প্রশাসনের ‘পবিত্রতা’ রক্ষা। ভোটের পর প্রথম সাংগঠনিক বৈঠকে এই তিন ‘মন্ত্র’ দলকে মুখস্থ করালেন বিজেপি নেতৃত্ব। দলের এই বার্তা যে ‘কথার কথা’ নয়, তা বোঝাতে বিজেপির ব্যানারে নেতৃত্বের ছবির বিন্যাসও বদলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শৃঙ্খলার বাইরে গেলে কেউই যে ছাড় পাবেন না, সে বার্তাও রাজ্য সভাপতি দিলেন। আর কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসলের সতর্কবার্তা— এত দিনের সব ভুল মাফ, কিন্তু এর পর থেকে আর নয়। সাংগঠনিক ফাঁকফোকড় বোজানোর জন্য সময়সীমাও বেঁধে দিলেন তিনি।

Advertisement

শুক্রবার বিধাননগর সেক্টর ফাইভের একটি প্রেক্ষাগৃহে বিজেপির এই বৈঠক হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফ থেকে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক বনসল এবং সহকারী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অমিত মালবীয়। রাজ্য নেতৃত্বের তরফ থেকে ছিলেন সভাপতি শমীক এবং সাধারণ সম্পাদক, সংগঠন সংম্পাদক-সহ অন্য রাজ্য স্তরের পদাধিকারীরা। ডাকা হয়েছিল জেলা সভাপতি এবং জেলা ইনচার্জদেরও। বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই দলকে শৃঙ্খলা এবং সংযমের যে সব বার্তা শমীক বার বার শোনাচ্ছেন, শুক্রবার তা আরও কঠোর ভাষায় তিনি তা মনে করিয়ে দেন। দলের কেউ অত্যাচার, তোলাবাজি বা অন্য কোনও রকম শৃঙ্খলাভঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ করতে দল দ্বিধা করবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। সাধারণ কর্মী, সাংগঠনিক পদাধিকারী বা নবনির্বাচিত বিধায়ক— শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রমাণ মিললে কেউই ছাড় পাবেন না বলে তিনি জানান। তাতে দলের বিধায়কসংখ্যা কয়েকটি কমে গেলেও কিছু যায়-আসে না বলে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মন্তব্য করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি।

দল তথা সংগঠন এবং প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্কের সমীকরণ কেমন হবে, তা অবশ্য আরও আগেই শমীক বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। দলের বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যানার এত দিন যে নকশায় তৈরি হচ্ছিল, শমীক শুক্রবার সেই নকশা নিয়ে আপত্তি তোলেন। বিজেপির সাংগঠনিক রীতি অনুযায়ী, যে কোনও রাজ্যেই দলীয় কর্মসূচির ব্যানারে একপাশে থাকে দুই সর্বভারতীয় শীর্ষনেতার ছবি। প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর ছবি, তার পরে দলের সর্বভারতীয় সভাপতির ছবি। আর ব্যানারের অন্য পাশে থাকে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের দুই শীর্ষনেতার ছবি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এত দিন প্রথমে থাকত শমীকের ছবি, তার পরে শুভেন্দুর ছবি। অর্থাৎ রাজ্য সভাপতি এবং বিরোধী দলনেতা, এই বিন্যাসে সাজানো থাকত ছবিদু’টি। শুক্রবারের সাংগঠনিক বৈঠকে শমীক নিজেই সেই বিন্যাস নিয়ে আপত্তি তোলেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। এ বার লথেকে দলের ব্যানারে রাজ্য নেতৃত্বের ছবি বসানোর সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ছবি আগে থাকবে এবং তাঁর ছবি পরে থাকবে— নির্দেশ দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি।

Advertisement

কেন এমন নির্দেশ? শমীকের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ব্যাখ্যা— এত দিন শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা ছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী নয়। কিন্তু এখন রাজ্যে দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুভেন্দু রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। সুতরাং তাঁর সম্মান এখন অন্য সকলের ঊর্ধ্বে। সংগঠনই সর্বাগ্রে বলে বিজেপিতে কথিত রয়েছে। সে কথা মেনে নিয়েও শুক্রবারের বৈঠকে শমীক বার্তা দেন যে, প্রশাসনকে বা প্রশাসনিক প্রধানের মর্যাদাকে খাটো করে দেখানোর কোনও অবকাশই নেই। তাই এ বার থেকে শুভেন্দুর ছবিই আগে থাকবে, রাজ্য সভাপতির ছবি পরে। ঠিক যেমন সর্বভারতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক প্রধান মোদীর ছবি আগে থাকে, দলের সভাপতি নিতিনের ছবি পরে। বৈঠকে এই নির্দেশ জারি করার মাধ্যমে শমীক আসলে দলের রাজ্য ও জেলা নেতৃত্বকে প্রশাসনের ‘পবিত্রতা’ রক্ষার বার্তা দিতে চেয়েছেন বলেও অনেকে মনে করছেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠিত হয়েছে বলে বিজেপি প্রশাসনকে দলদাসে পরিণত করবে, এমন যাতে কেউ না-ভাবেন, সে বার্তাও শমীক দিতে চেয়েছেন বলে বিজেপির একাংশের মত।

বনসল শুক্রবার জোর দিয়েছেন যাবতীয় সাংগঠনিক অপূর্ণতা দ্রুত দূর করার উপরে। চলতি মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে সবক’টি জেলায় কোর কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বনসল। সে কমিটিতে জেলা সভাপতি, জেলা ইনজার্জ, জেলা সাধারণ সম্পাদকরা যেমন থাকবেন, তেমনই থাকবেন সেই জেলা থেকে নির্বাচিত সাংসদ-বিধায়করাও। সব মিলিয়ে কমবেশি ১৫ জনের কমিটি গড়ার নির্দেশ দিয়েছেন বনসল। তাঁর নির্দেশ, জেলা সভাপতিরা কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একতরফা ভাবে নেবেন না। কোর কমিটিতে আলোচনার ভিত্তিতেই সেই সিদ্ধান্তগুলি নিতে হবে। এ ছাড়া দলে বা শাখা সংগঠনগুলিতে নানা স্তরে যে সব কমিটি গঠন এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে, সেগুলিও দ্রুত সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রত্যেক জেলায় অন্তত ১০০ জন ‘সক্ষম’ বা ‘সেরা’ কর্মীর তালিকা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পুরভোট এবং পঞ্চায়েত ভোটের আগে দলের সামর্থ্যকে নখদর্পণে রাখতেই এই তালিকা তৈরির নির্দেশ বলে অনেকে মনে করছেন।

বিধাননগরের ওই প্রেক্ষাগৃহে দিনভর দফায় দফায় বৈঠক করেই অবশ্য বিজেপির বৈঠকের পরম্পরা শুক্রবার শেষ হয়নি। রাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসেছিল বিজেপির বিধাননগর কার্যালয়ে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, রাজ্য সভাপতি শমীক তো ছিলেনই। ছিলেন বনসল, মালবীয়ও। রাজ্য বিজেপির কোর কমিটি সদস্যদের অধিকাংশও সে বৈঠকে ছিলেন। তবে রাতের এই ‘ওজনদার’ বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে রাজ্য নেতৃত্বের কেউ মুখ খোলেননি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement