Kolkata Municipal Corporation

আইনের ফাঁক গলে গুরুতর বিধিলঙ্ঘন করা নির্মাণও ছাড় পেয়ে যাচ্ছে! অস্বস্তি দূর করতে স্পষ্ট নির্দেশিকার দাবি কলকাতা পুরসভার কর্তাদের

কলকাতা পুরসভার কর্তাদের একাংশের অভিযোগ, বর্তমান আইনে একাধিক অস্পষ্টতা থাকায় তার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর বহু বেআইনি নির্মাণকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ১৩:৪২
Share:

কলকাতা পুরসভা। —ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কলকাতা পুরসভার অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে এড়িয়ে শহর জুড়ে অবৈধ নির্মাণ ভাঙার অভিযান শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ। সম্প্রতি পুরসভার তরফে নোটিস দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারিবারিক ঠিকানাতেও। তপসিয়ার চামড়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতায় বুলডোজ়ার চলেছে। এই আবহে ফের প্রকাশ্যে এল ‘রেগুলারাইজ়েশন’ বা জরিমানার বিনিময়ে বেআইনি নির্মাণ বৈধ করা নিয়ে বিতর্ক।

Advertisement

কলকাতা পুরসভার কর্তাদের একাংশের অভিযোগ, অবৈধ নির্মাণ বৈধকরণের বর্তমান আইনে একাধিক অস্পষ্টতা থাকায় তার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর বহু বেআইনি নির্মাণকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তাই এখন তাঁরা চাইছেন, আইনে স্পষ্ট সংশোধনী এনে ঠিক কোন ধরনের নির্মাণকে ‘মাইনর ডেভিয়েশন’ ধরা হবে, তার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও পরিমাপের পদ্ধতি আইনেই উল্লেখ করা হোক।

কলকাতা পুরসভা ২০১৫ সালে ‘কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (রেগুলারাইজ়েশন অফ বিল্ডিং) রেগুলেশনস, ২০১৫’ চালু করে। সেই সংশোধিত বিধিতে বলা হয়েছিল, অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান থেকে ‘ক্ষুদ্র বিচ্যুতি’ বা ছোটখাটো ব্যত্যয় ঘটলে নির্দিষ্ট জরিমানার বিনিময়ে সেই নির্মাণকে বৈধ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই। আইনে কোথাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি, কতটা বিচ্যুতিকে ‘ক্ষুদ্র’ বলা হবে কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে। ফলে বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিক বা পুরকর্তাদের ব্যাখ্যা ও বিবেচনার উপর। পুরসভার অন্দরমহলের দাবি, এই আইনি ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়েই বহু ক্ষেত্রে বড়সড় বেআইনি নির্মাণও ‘বৈধ’ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব বা মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এমন বহু নির্মাণকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যেগুলি আদতে নিয়মভঙ্গের স্পষ্ট উদাহরণ।বর্তমান পরিস্থিতিতে শহর জুড়ে যখন বুলডোজ়ার অভিযান চলছে, তখন পুরকর্তাদের একাংশের মতে, আইনের এই ফাঁক বন্ধ না করলে ভবিষ্যতেও অবৈধ নির্মাণ রোখা সম্ভব হবে না।

Advertisement

পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকদের বক্তব্য, ‘ক্ষুদ্র বিচ্যুতি’-র স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি। যেমন— কত শতাংশ অতিরিক্ত নির্মাণ, কতটা পার্শ্ব-ফাঁক কম থাকা, উচ্চতার কতটা ব্যত্যয় বা কত অতিরিক্ত নির্মিত এলাকা পর্যন্ত নিয়মভঙ্গকে ছোটখাটো ধরা হবে, তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। একই সঙ্গে কী ভাবে এই বিচ্যুতি পরিমাপ করা হবে, তারও নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। এর ফলে যেমন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, তেমনই বেআইনি নির্মাণকে বৈধ করার অপব্যবহারও কমবে। এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টও একাধিক মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে। শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, অবৈধ নির্মাণকে বৈধ করা কখনওই নিয়ম হতে পারে না, তা হওয়া উচিত শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। আদালত বারবার বলেছে, লাগাতার ‘রেগুলারাইজ়েশন’ আইনভঙ্গের প্রবণতাকে উৎসাহিত করে এবং নগর পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত করে।

তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এখনও অবৈধ নির্মাণ বৈধকরণের আলাদা আইন বা প্রকল্প চালু রয়েছে। মহারাষ্ট্রে মুম্বই, ঠাণে, নবি মুম্বই এবং পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় পুরসভায় এই ধরনের নিয়ম কার্যকর। নবি মুম্বইয়ে সিডকো সম্প্রতি একটি সাধারণ ক্ষমা প্রকল্প চালু করেছে, যেখানে আবাসিক প্লটের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত মূল্যের ২৫ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক প্লটের ক্ষেত্রে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা নিয়ে বৈধতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দিল্লিতে অননুমোদিত কলোনি বৈধকরণ প্রকল্প, কর্নাটকে ‘আক্রম-সক্রম’, তেলঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশে নির্মাণ জরিমানা প্রকল্প এবং গুজরাতের বিভিন্ন নগর এলাকায় ব্যবহার অনুমতি বৈধকরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে নির্মিত ভবনই বৈধকরণের আওতায় আসে। মালিককে মিটমাট ফি, পরিকাঠামো মাসুল এবং অতিরিক্ত মূল্য মাসুল জমা দিতে হয়। পাশাপাশি নির্মাণকে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।

সাধারণত পার্শ্ব-ফাঁক কম থাকা, উচ্চতার ব্যত্যয় বা অতিরিক্ত নির্মিত এলাকার মতো সীমিত নিয়মভঙ্গকেই বিবেচনা করা হয়। তবে উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল, বনভূমি, প্রতিরক্ষা জমি, খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান দখল করে তৈরি নির্মাণ কিংবা বিপজ্জনক ও অরক্ষিত ভবনকে কোনও ভাবেই বৈধতা দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই বৈধ হওয়ার পরও ভবিষ্যতে নতুন নির্মাণের অনুমতি মেলে না, শুধুমাত্র মেরামতির অনুমোদন দেওয়া হয়। পুরকর্তাদের মতে, কলকাতাতেও একই ধরনের স্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা চালু করা গেলে অবৈধ নির্মাণে অনেকটাই লাগাম টানা সম্ভব হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement