শহিদ স্মরণে। নেতাইয়ে দেবরাজ ঘোষের তোলা ছবি।
বিধানসভা ভোটের আগে নেতাইয়ের ক্ষতে প্রলেপ লাগালেন শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার নেতাই দিবসের স্মরণ অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে শুভেন্দু জানিয়ে দিলেন, এতটুকু অভিমান করার কোনও কারণ নেই! নেতাইয়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রী এত কাজ করে দিয়েছেন, আগামী দিনে তাঁর নেতৃত্বে কংসাবতী নদী ভাঙনের কাজও হবে।
বস্তুতপক্ষে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘সাহসী গ্রামে’র বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের চোরাস্রোত বইছে। প্রথমত, রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে ফের একটা ভোট দোরগোড়ায়, অথচ এখনও কংসাবতীর ভাঙন রোধে এখনও কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ করা না হওয়ায় হতাশ নেতাইয়ের বাসিন্দারা। নদী ক্রমশ গ্রামকে গিলে খেতে আসছে। পাড় ভাঙতে ভাঙতে গ্রামের পাঠাগার লাগোয়া পিচ রাস্তার খুব কাছে চলে এসেছে নদী। পরিস্থিতি এখনই সামাল দেওয়া না গেলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী। দ্বিতীয়ত, নেতাই-কাণ্ডে নিহতদের পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য চাকরি পেলেও গুলিতে জখম হয়ে পঙ্গু হয়ে যাওয়া দিলীপ সেন, তাপস মণ্ডল, তরণী ঘাটার মতো ২৮ জনের কেউই চাকরি পাননি। এই নিয়ে বাসিন্দাদের একাংশ বেশ ক্ষুব্ধ।
এ দিন নেতাইয়ের শহিদ স্মরণ মঞ্চে সেই ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করলেন শুভেন্দু। কংসাবতী নদী ভাঙনের বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুভেন্দু বলেন, “আপনাদের কাঁসাই ভাঙন নিয়ে একটা দাবি আছে। জেলা সভাধিপতি উত্তরা সিংহ, আদিবাসী উন্নয়নমন্ত্রী সুকুমার হাঁসদারা যথোপযুক্ত জায়গায় আপনাদের দাবির বিষয়টি পৌঁছে দেবেন। আমি তাঁদের বন্ধু হিসেবে সহযোগিতা করব। মুখ্যমন্ত্রী এত কাজ করে দিয়েছেন আগামী দিনে তাঁর নেতৃত্বে ভাঙন রোধের কাজও হবে। নেতাই গ্রামকে আমরা অক্ষয় অমর করে রাখতে চাই।” পাশাপাশি, নেতাই-কাণ্ডে আহতদের চাকরির দাবির প্রসঙ্গে শুভেন্দু অবশ্য সরাসরি কোনও প্রতিশ্রুতি দেননি। তবে শুভেন্দু বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর বদান্যতায় শহিদ পরিবারের সদস্যরা চাকরি পেয়েছেন। আপনাদের এতটুকু অভিমান করার কোনও কারণ নেই। আগামী দিনে দিলীপ সেন (গুলিতে বাঁ চোখ নষ্ট, ডান হাতটি অসাড়)-সহ যারা আহত অবস্থায় পঙ্গুত্বের মধ্যে আছেন, তাদের দাবির বিষয়টিও দল দেখবে। আমরা দায়িত্ব নিচ্ছি।”
এ দিন মাত্র দশ মিনিটের বক্তৃতার আগাগোড়া নেতাইয়ের পুরনো স্মৃতি ও আবেগ উস্কে দেন শুভেন্দু। পাঁচ বছর আগে কীভাবে তিনি, পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও তত্কালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতাইয়ে ছুটে এসেছিলেন সে কথা বর্ণনা করেন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নেতাই-মামলার সাক্ষীদের ঠিক রাখার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি, গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে আবেদন করে শুভেন্দু বলেন, “অনুজ পাণ্ডে, ডালিম পাণ্ডে-র মতো যে সব গুণ্ডারা বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিল, এদের যতক্ষণ না চূড়ান্ত শাস্তি হয়, আইনি লড়াই চলবে। এই লড়াইয়ে আমাদের জয়যুক্ত হতে হবে। আমরা সবাই মিলে আপনাদের সহযোগিতা করব। মামলার সাক্ষীগুলোকে ঠিক রাখবেন। অনুজ-সহ প্রত্যেকের আমরা ফাঁসি চাই। ফাঁসি না হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেখতে চাই। বিচার ব্যবস্থার কাছে আমরা এই আশাপ্রকাশ করব।”
সবশেষে শুভেন্দুর বার্তা, “শহিদ মঞ্চ ও শহিদ পরিবারকে সাক্ষী রেখে শপথ নিন, এই জেলার ১৯টি আসনেই মমতাদির প্রার্থীরা জিতবেন, সর্বত্র জোড়া ফুল ফুটবে।” প্রতিবারের মতো এদিনও নিহতদের পরিজন ও আহতদের হাতে ব্যক্তিগত ভাবে খামে ভরা অর্থসাহায্য তুলে দেন শুভেন্দু।
এ দিন সকাল এগারোটা নাগাদ নেতাই গ্রামে পৌঁছে প্রথমে শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানান শুভেন্দু। নীরবতা পালনের পরে লাগোয়া স্মরণ অনুষ্ঠান মঞ্চে বসেন। সদ্য জেলা যুব তৃণমূল সভাপতির পদ হারানো শ্রীকান্ত মাহাতো এ দিন শুভেন্দু আসার আধঘন্টা আগেই চলে এসেছিলেন। বিমর্ষ মুখে বসেছিলেন শ্রীকান্ত। শুভেন্দু আসার পরে তাঁর বাঁ পাশের চেয়ারে বসে পড়েন শ্রীকান্ত। শুভেন্দু একবার শ্রীকান্তর ডান হাতটা চেপে ধরেন। কিন্তু কোনও কথা বলেননি। তারপর শুভেন্দু চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে মঞ্চের এক পাশে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। ততক্ষণে চেয়ার অদল বদল করে সামনের সারিতে বসে পড়েন জেলা সভাধিপতি উত্তরা সিংহ, আদিবাসী উন্নয়নমন্ত্রী সুকুমার হাঁসদা, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল সভাপতি দীনেন রায়, কার্যকরী সভাপতি নির্মল ঘোষরা। শ্রীকান্ত চলে যান পিছনের সারিতে।
এ দিন অনুষ্ঠান শেষে নেতাই গ্রামের কমিউনিটি হলটির দ্বারোদ্ঘাটন করেন শুভেন্দু। ‘সাহসী গ্রাম’ হিসেবে নেতাইকে বিবেক পুরস্কার বাবদ পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই টাকার পাশাপাশি, লালগড় পঞ্চায়েত সমিতির বরাদ্দ করা আরও কিছু টাকা দিয়ে ‘নেতাই শহিদ স্মরণ কমিউনিটি হল’টি তৈরি করা হয়েছে।