Advertisement

‘বাবারা সবাই কাঠ-পাত আইনতে বনে যাঁয়েছে’

পুরুলিয়া-জামশেদপুর জাতীয় সড়ক ধরে পুরুলিয়া শহর ছাড়িয়ে বলরামপুরের দিকে এগোলে পথে পড়ে ছোট উরমা মোড়। এখান থেকে ডান দিকে বাঁক নিলেই ঘাটবেড়া-কেরোয়া এলাকা। খানিকটা পথ পেরিয়ে উত্তর-দক্ষিণে চলে গিয়েছে আদ্রা-চান্ডিল রেলপথ। উরমা স্টেশন ডান হাতে রেখে এগোলেই চোখে পড়ে অযোধ্যা পাহাড়।

প্রশান্ত পাল

শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০১৬ ১৩:০৫

পুরুলিয়া-জামশেদপুর জাতীয় সড়ক ধরে পুরুলিয়া শহর ছাড়িয়ে বলরামপুরের দিকে এগোলে পথে পড়ে ছোট উরমা মোড়। এখান থেকে ডান দিকে বাঁক নিলেই ঘাটবেড়া-কেরোয়া এলাকা। খানিকটা পথ পেরিয়ে উত্তর-দক্ষিণে চলে গিয়েছে আদ্রা-চান্ডিল রেলপথ। উরমা স্টেশন ডান হাতে রেখে এগোলেই চোখে পড়ে অযোধ্যা পাহাড়। ছোট ছোট টিলা, ডুংরির মাঝে ছোট ছোট জনপদ— ঘাটবেড়া, কেরোয়া, খুনটাঁড়, মণ্ডল কেরোয়া, কুমারডি, মাহালিটাঁড়, কর্মা, মিরমি, গোহালডাং, নন্দুডি— সব এক একটা ছবির মতো গ্রাম। আঁকাবাঁকা মেঠো পথ চলে গিয়েছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের দিকে।

২০০৮-এর শেষ থেকে কী অবস্থা ছিল এই এলাকার? জেলার তো বটেই রাজ্যের মানুষেরও অজানা নয়। পাশেই অযোধ্যা পাহাড়, মাওবাদীদের অযোধ্যা স্কোয়াডের কার্যত মুক্তাঞ্চল ছিল। একের পর এক খুন, গুলির লড়াই, অপহরণ এবং সবোর্পরি দিনের পর দিন বন্‌ধ ও বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল এলাকার বাতাস। এই উরমা স্টেশন থেকেই বন্দুকের ডগায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্টেশন ম্যানেজারকে। মাওবাদীদের বন্‌ধে টানা ৩৬ ঘণ্টারও বেশি ফাঁকা পড়ে থেকেছে পুরো স্টেশন। সেই স্টেশনের অদূরে কুমারডি মোড় থেকে ঘাটবেড়ার দিকে খানিকটা এগিয়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে যে মেঠো রাস্তাটি গিয়ে মিশেছে পাহাড়ের নীচে জঙ্গলের মাঝে, তারই একটি ছোট্ট জনপদের নাম মাহালিটাঁড়। এই সব গ্রামগুলিতে দিনের বেলাতেও ঢোকার সাহস পেত না পুলিশ।

সেই মাহালিটাঁড় পার হয়েই জঙ্গলের রাস্তায় দেখা এক যুবকের সঙ্গে। পরাণ হাঁসদা। পরনে লুঙ্গি, গেঞ্জি, মাথায় গামছা বাঁধা। সাইকেলে বাঁধা কাঠের বোঝা। বাড়ি বাগানডি গ্রামে। পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শুকনো ডালপালা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই কাকভোরে বেরিয়েছেন বাড়ি থেকে, ফিরতে ফিরতে মাঝ দুপুর। এই কাঠ বেচে বড় জোর শ’দেড়েক টাকা জুটবে বলরামপুরের হাটে। হাটও কমবেশি ১৫-১৬ কিলোমিটার পথ। পরাণের কথায়, ‘‘কী করব? এই ডালপালা বেচলে তবে কয়েকটা টাকা পাব। মঙ্গলবার বলরামপুরে হাট, আর শুক্রবার উরমাতে হাট। সপ্তাহে এই দুটো হাটেই ডালপালা বেচলে কিছু বেশি টাকা মেলে।’’

Advertisement


দুর্গম এলাকা থেকে সমতলে পুনবার্সন দেওয়া হয়েছে। ছবি: প্রদীপ মাহাতো।

পরাণের বাবা অর্জুন হাঁসদা বা ঠাকুরদা পাঁড়ু হাঁসদাও একই ভাবে ডালপালা বেচে দিন চালাতেন। পরাণের বাবা এখন কাজ করতে পারেন না। শরীর একেবারেই ভেঙে গিয়েছে। ঘরের কাছে সব্জি ফলান। তবে সব্জি ফলাতেও তো জল লাগে। সেই জলও নেই। পরাণ বলছিলেন, ‘‘এখন চালটা অবশ্য পাচ্ছি। বাকি তো জোগাড় করতেই হবে। ঘরে বড় অভাব।’’ কবে ভোট? জানতে চাওয়ায় পরাণের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘‘ভোট আছে বটে, তবে কবে জানি না।’’ তাঁর কেন্দ্রে প্রার্থী বিদায়ী মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো। তাঁর আরও একটা পরিচয় রয়েছে, তিনি তৃণমূলের জেলা সভাপতিও বটে। আর এটা জেলা পরিষদের সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতোরও এলাকা। তাঁর এলাকায় প্রার্থী কে জানতে চাওয়ায় পরাণের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘‘জানি না প্রার্থী কে। ওটা পার্টির লোকেই বলে দেবে।’’ এর পরে কাঠ নিয়ে জঙ্গলের বাঁকে হারিয়ে যান পরাণ।

খানিকটা এগিয়ে কলাবেড়া গ্রামের নতুন বসতি। গ্রামটির অবস্থান ছিল পাহাড়ের ঢালে, সমতল থেকে বেশ খানিকটা উপরে। এমনই দুর্গম পথ যে, হেঁটে গ্রামে ঢুকতে হয়। এমন ‘সুবিধাজনক’ অবস্থানের দরুণ এই এলাকায় মাওবাদীদের যাতায়াত ছিল— এমনটাই মনে করেন গোয়েন্দারা। কলাবেড়া নামের সেই গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্গম এলাকা থেকে সমতলে পুনবার্সন দেওয়া হয়েছে মাসখানেক আগে। অধিকার প্রকল্প থেকে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া, গ্রামীণ বৈদ্যুতিকরণ প্রকল্প থেকে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছনো, নয়া বসতিতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র গড়ে দেওয়া-সহ স্বনির্ভরতার জন্য মুরগি ও ছাগলও দেওয়া হয়েছিল দিন পনেরো আগে। বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, সেই ছাগল শাবকগুলিকে এক সপ্তাহের বেশি বাঁচাতে পারেননি তাঁরা।

অজয় পাহাড়িয়া, হিরামণি পাহাড়িয়া, লধু পাহাড়িয়া, খিরি পাহাড়িয়ারা বলেন, ‘‘বাবুরা ছাগল দিয়ে গরম জলে স্নান করাতে বলেছিল। সেই ভাবেই রেখেছিলাম। কিন্তু, সর্দি হয়ে একে একে সব ছাগলগুলি মারা গেল।’’ বাড়ির সামনে খেলা করছিল সন্তোষ পাহাড়িয়া, গৌতম পাহাড়িয়াদের মতো কয়েক জন কিশোর। ঘরে কে আছে জানতে চাওয়ায় খেলা থামিয়ে সমস্বরে জবাব দেয়— ‘‘বাবারা সবাই বনে যাঁয়েছে।’’ কেন? ‘‘কেনে আবার, কাঠ-পাত আইনতে। শুক্রবার উরমা হাটে বিকবেক।’’

পথের ধারে মাটির বাড়ির দেওয়ালে কোথাও দেওয়ালে তৃণমূলের প্রার্থীকে ভোটদানের আহ্বান, কোথাও গাছের শুকনো ডালে বাম-কংগ্রেস জোটের লাল-তেরঙ্গা পতাকা উড়ছে পতপত করে। ধামসা-মাদলের বাদ্যি নিয়ে ধুলো উড়িয়ে মিছিল যাচ্ছে প্রার্থীদের।

ভোট আসে ভোট যায়, পরাণ হাঁসদা, লধু-বুদ্ধেশ্বর বা বিজয় পাহাড়িয়াদের মতো জঙ্গলে যাওয়া মানুষজনকে সেই কাকভোর হলেই ছুটতে হয় জঙ্গলে। কে প্রার্থী, কবেই বা ভোট এ সব তথ্য তাঁদের রোজনামচায় কোনও আলো ফেলে না।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy