ভোটের যুদ্ধ দুই শিবিরে বেঁধে ফেলতে নেমে পড়ল বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস।
ভবানীপুর কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন জমার সঙ্গী হয়ে বৃহস্পতিবার বিজেপির তরফে সেই বার্তাই দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং। বিপরীতে শাহকে নিশানা করে চতুর্থ বার সরকার গড়ার চ্যালেঞ্জ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
কলকাতায় এসে শাহ এ দিন বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। গোটা বাংলার মানুষ চাইছেন মমতা বিদায় নিন।” এই দাবির পক্ষে তাঁর সূত্র, “ভবানীপুরই (মমতার কেন্দ্র) এই রাজ্যে পরিবর্তনের ‘শর্টকাট’ পথ!” আর ভোটের প্রচারে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের সভায় মমতা পাল্টা বলেছেন, ‘‘লড়ে নেব। স্বৈরাচারী, দুরাচারীরা ভাবছেন, নাম কেটে গায়ের জোরে জিতবেন!”
রাজ্যে পরিবর্তনের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর ঘাঁটিতে চাপে রাখতে ভবানীপুরে বিজেপির বাজি এ বার শুভেন্দু। সেই চাপ বাড়িয়ে শুভেন্দুর মনোনয়নপত্র জমা-পর্বে এ দিন উপস্থিত থাকলেন দেশে বিজেপির ভোটের সেনাপতি শাহ। মনোনয়ন জমার আগে হাজরা মোড়ে এক সভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘ভবানীপুরের মানুষ যদি একটি আসন (বিজেপিকে) জিতিয়ে দেন, তা হলে এমনিই পরিবর্তন হয়েই যাবে।” সেই সঙ্গে, রাজ্যে ভোটের ফলাফলের ‘পূর্বাভাস’ দিয়ে তাঁর দাবি, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তন করার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। আমাদের ১৭০ আসন দিন, পরিবর্তন হবেই।” অন্য দিকে, দলীয় প্রার্থীদের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আক্রমণ করে মমতার জবাব, “এঁদের কোনও দিন ক্ষমা করবেন না। দাঙ্গা করে, মানুষ মেরে ক্ষমতায় এসেছে। মিথ্যার ফুলঝুরি।” মমতার বার্তা, “খেলা হবে, এ বার দুরন্ত খেলা হবে!”
মমতার কেন্দ্রে শুভেন্দুর মনোনয়ন জমার দিনেই তৃণমূল-বিরোধী প্রচারের সুর বেঁধে দিতে চেয়েছে বিজেপি। সেটাই স্পষ্ট করে শাহের বক্তব্য, “গত বার পুরো বাংলায় জিতলেও নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর কাছে হেরেছিলেন মমতা। এ বার তিনি গোটা বাংলায় হারবেন, ভবানীপুরেও হারবেন।” এই প্রসঙ্গে শাহের সংযোজন, “শুভেন্দুদা শুধু নন্দীগ্রামে লড়তে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, আপনি মমতার ঘরে গিয়ে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে আসুন।” সেই সঙ্গে রাজ্যে তৃণমূল-শাসনের সমালোচনা করে শাহের সংযোজন, “তৃণমূলের তোলাবাজি, গুন্ডাগিরি, তোষণ, অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি, নারী-নির্যাতন নিয়ে মানুষ ভীত। ভয় ভেঙে তাঁরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন।’’ তাঁর কথায়, ‘‘ভোটের আগেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দিদিকে টাটা-বাইবাই বলে দিয়েছেন।’’ দলীয় কর্মীদের উৎসাহ বাড়িয়ে শাহ জানিয়েছেন, ভোটের সময় ১৫ দিন রাজ্যে থাকবেন তিনি।
একই ভাবে মালদহ ও মুর্শিদাবাদের সভাগুলিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আক্রমণ করেছেন মমতাও। এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগে বুধবার মালদহে যে অশান্তি হয়েছে, সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘‘পুরো অশান্তি করিয়েছেন অমিত শাহ। এটা তাঁর চক্রান্ত।’’ মমতা বলেন, ‘‘অপদার্থ এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সীমান্ত আটকাতে পারে না। দেশকে বাঁচাতে পারে না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি।’’ ভোটার তালিকা নিয়ে তাঁদের অভিযোগের সঙ্গে শাহকে জুড়ে মমতার আরও মন্তব্য, ‘‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লজ্জা করে না! চক্রান্ত করে এক দিকে ভোট কাটেন, অন্য দিকে এনআইএ, সিবিআই করেন।’’ বিজেপি জিতবে, শাহের এই দাবির পাল্টা মমতার কথা, ‘‘ক্ষমতা থাকলে সামনাসামনি লড়ুন। ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই হবে।’’
মেদিনীপুরে একাধিক কর্মসূচি থাকলেও শাহের মন্তব্য প্রসঙ্গ এড়িয়েই গিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বিকেলে পূর্ব মেদিনীপুরে সাংগঠনিক সভার পরে এই নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অভিষেকের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘অমিত শাহকে এ বার রাজভোগ খাওয়াব।’’ তবে তাঁর এ দিনের কর্মসূচিকে কটাক্ষ করতে শুভেন্দুর মনোনয়ন-পর্ব শেষ হওয়ার আগেই মাঠে নেমে পড়েছে তৃণমূল। দলের তরফে সাংবাদিক বৈঠক করে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বলেছেন, ‘‘১৫ দিন কেন, রাজ্যে আরও বেশিই থাকুন শাহ। তবে অনুরোধ, ফল বেরোনোর পরে একটি দিন অন্তত এই রাজ্যে থেকে যান।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)