আনন্দবাজার ডট কম-এর লোগো ব্যবহার করে ফের ভুয়ো ‘গ্রাফিক কার্ড’ ছড়ানো হচ্ছে সমাজমাধ্যমে। ওই ভুয়ো গ্রাফিক কার্ডে প্রথম দফায় ভোট হওয়া ১৫২টি আসনের মধ্যে কোন দল ক’টি আসন পেতে পারে, তার হিসাব দেওয়া হয়েছে। গ্রাফিকের নীচে আনন্দবাজার ডট কম-এর লোগোও ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ধরনের কোনও গ্রাফিক কার্ড আনন্দবাজার ডট কম তৈরি করেনি। করার কথাও নয়। কারণ, এই ধরনের কোনও প্রাক্-নির্বাচনী সমীক্ষা আনন্দবাজার ডট কম করে না। তা-ও শুধুমাত্র প্রথম দফার ভোট হওয়ার পরেই! কিন্তু কোনও কোনও স্বার্থান্বেষী মহল আনন্দবাজার ডট কম-এর ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ব্যবহার করে এই ভুয়ো গ্রাফিক সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র মারফত ওই ভুয়ো কার্ডের স্ক্রিনশট (স্ক্রিনশটটি আমরা এই প্রতিবেদনের মূল ছবিতেও ব্যবহার করেছি) আমাদের কাছে এসেছে। আনন্দবাজার ডট কম সমাজমাধ্যমে যে ধরনের গ্রাফিক কার্ড (টেমপ্লেট) ব্যবহার করে, প্রচারিত স্ক্রিনশটটি হুবহু তারই আদলে তৈরি। আনন্দবাজার ডট কম-এর লোগোও রয়েছে তাতে। এমনটি হওয়ারই সম্ভাবনা প্রবল যে, আমাদের কোনও একটি টেমপ্লেটকে ফোটোশপ জাতীয় কোনও ডিজ়াইন সফ্টঅয়্যারে ফেলে তার পরিবর্তন করা হয়েছে। ভাইরাল স্ক্রিনশটে যে শিরোনাম রয়েছে, তা হল, ‘বিধানসভা নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল: ২০২৬’। তার উপরে তুলনায় ছোট হরফে লেখা হয়েছে ‘নীলবাড়ির লড়াই: প্রথম দফা আসন ১৫২’।
প্রথমত, আনন্দবাজার ডট কম এই পর্বে কখনওই এমন শিরোনাম সংবলিত গ্রাফিক কার্ড তৈরি করেনি। ভুয়ো গ্রাফিক কার্ডটি যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই ছড়ানো হচ্ছে এবং আনন্দবাজার ডট কম-এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে ব্যবহার করেই যে এই ভুয়ো খবরকে বিশ্বাসযোগ্য করতে কেউ বা কেউ কেউ মরিয়া এ সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয়ত, আনন্দবাজার ডট কম বিভিন্ন প্রতিবেদনের সঙ্গে তথ্য সংবলিত যে গ্রাফিক কার্ড প্রকাশ করে, সেগুলির সঙ্গে ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটের সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য রয়েছে। খুঁটিয়ে সেই স্ক্রিনশট দেখলেই তা চোখে পড়ে। কিন্তু সাধারণ পাঠকের চোখে সেই পার্থক্য ধরা না-পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
আনন্দবাজার ডট কম-এর গ্রাফিকের শিরোনাম ছিল ‘বিধানসভা নির্বাচনের ফল: ২০২১’। সেটি বদলে ভুয়ো কার্ডে লেখা হয়েছে ‘বিধানসভা নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল: ২০২৬’। আমাদের গ্রাফিকের শিরোনামের অনুকরণে ভুয়ো কার্ডের শিরোনামটি দেওয়া হলেও ‘সম্ভাব্য ফলাফল’ শব্দ দু’টি লেখা হয়েছে অন্য ‘ফন্ট’-এ। বৃহস্পতিবার রাজ্যের যে ১৬টি জেলায় ভোট হয়েছে, সেগুলিতে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে কী ফল হয়েছিল, তার পরিসংখ্যান ছিল আমাদের গ্রাফিকটিতে। ভুয়ো গ্রাফিকে ওই জেলাগুলিতে কোন দল ক’টি আসন পেতে পারে, তার পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। অথচ আদৌ এমন কোনও সম্ভাব্য ফলাফল সংবলিত গ্রাফিক প্রকাশ করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
তা ছাড়াও, ভুয়ো গ্রাফিকটির নীচের দিকে দু’টি সংখ্যা লেখা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এই ১৫২টি আসনের মধ্যে একটি দল ১০৬টি আসনে জয়ী হতে পারে। মার্কশিটের অনুকরণে ওই সংখ্যা দু’টিকে লাল কালি দিয়ে চিহ্নিতও করা হয়েছে। আনন্দবাজার ডট কম-এর গ্রাফিক কার্ডটিতে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের পরিসংখ্যান ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে এমন কোনও পূর্বানুমান বা দাবির উল্লেখ ছিল না।
অতীতেও আনন্দবাজার ডট কম-এর নামে এমন অনেক স্ক্রিনশট ছড়িয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে আনন্দবাজার ডট কম-এর খবরের শিরোনাম বিকৃত করে ভুয়ো ‘স্ক্রিনশট’ ছড়িয়ে জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন কয়েক জন। ভোটের আবহে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে সেটি তৈরি করা হয়েছিল, তা বোঝা গিয়েছিল। শুধু ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনই নয়, ২০২২ সালে আসানসোল লোকসভার উপনির্বাচনের সময়ে আনন্দবাজার অনলাইনের (বর্তমানে আনন্দবাজার ডট কম) নামে একটি জনমত সমীক্ষা ভাইরাল হয়েছিল সমাজমাধ্যমে। সেই সমীক্ষায় তৃণমূলের প্রার্থী শত্রুঘ্ন সিন্হাকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। সমীক্ষার ফলাফল প্যামফ্লেটের আকারে ছাপিয়ে দৈনিক খবরের কাগজের মধ্যে ভরে গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি সরবরাহ করা হয়েছিল। বাস্তবে আনন্দবাজার অনলাইন তেমন কোনও জনমত সমীক্ষা করেনি।
গত লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রাক্তন বিচারপতি তথা তমলুকের বিজেপি প্রার্থী (বর্তমানে সাংসদ) অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর নামে বিকৃত খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়াও, তমলুকের প্রাক্তন সাংসদ দিব্যেন্দু অধিকারীর ছবি দিয়েও ভুয়ো স্ক্রিনশট ছড়ানো হয়। এমন উদাহরণ আরও রয়েছে। লোকসভা ভোট চলাকালীনই সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং সিপিএমের যুবনেত্রী মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে নিয়েও আমাদের খবরের ভুয়ো স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছিল।
অতীতেও সেই সব ভুয়ো স্ক্রিনশট নিয়ে আমরা প্রতিবেদন লিখে মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, কী ভাবে ধরা যায় যে আনন্দবাজার ডট কম-এর নামে ছড়ানো স্ক্রিনশটটি ভুয়ো! সেই চেষ্টা আমরা এ বারেও করলাম।