ভোট তিনি দেখছেন ছ’দশক ধরে। তবে দিনভর বুথে বুথে চরকিপাকে ঢিলেমি নেই। আবার প্রতিপক্ষের সঙ্গে দেখা হতে ফিচেল রসবোধে হাসিয়েও ছেড়েছেন মাঝসত্তরের দুঁদে আইনজীবী।
একদা ‘লাল দুর্গ’ যাদবপুরে, বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য নামটা শূন্য হওয়া সিপিএমের অক্সিজেন। এখনও। তবু এ ভোটে তাঁকে ঘিরে আশাতীত অঘটনের স্বপ্ন, দানা বাঁধতে পারল কি? বুধবার সাত-সকালে কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামেই বিকাশদার সঙ্গে দেখা দলের একনিষ্ঠ কর্মী তথা গোঁজ প্রার্থী কৃশানু নাগের। বাড়িতে তাঁর স্ত্রীর উপরে প্রতিপক্ষ দলের হামলার খবর দিয়ে রাতভর হাসপাতালে জেগে কাটানোর কথা বলছিলেন। অভিযোগ, মুখ-ঢাকা হামলাকারীরা বাড়িতে চড়াও হয়ে কৃশানুর স্ত্রী দেবরূপাকে হুমকি দিতে আসে। তিনি প্রতিবাদ করায় দেওয়ালে মাথা ঠুকে ঘাড়ে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগ। স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল দেবরূপাকে ভর্তি রাখতে চাইলেও নিজ দায়িত্বে বেরিয়ে বুথে বসেছেন।
মুকুন্দপুরে হেলেন কেলার স্কুলে সিপিএমের এজেন্ট দেবরূপা গলায় কলার পরে ভোটের কাজ করতে করতে বললেন, ‘‘আমার কিন্তু মনে হয়, তৃণমূল নয়, এই হামলা বিজেপিই করেছে।’’ সিপিএমই বলছে, বিকাশরঞ্জন বিজেপির ভোট কাটার শঙ্কায় তাদের নিশানা করেছে গেরুয়া-শিবির। কয়েক বছর আগেও যাদবপুরে বিজেপিকে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হত না। কিন্তু ২০১৯-এর লোকসভা ভোট থেকে শুরু করে গত বিধানসভা এবং লোকসভা ভোটেও বিজেপিই সিপিএমকে তিন নম্বরে ঠেলে দিয়েছে। বিজেপি প্রার্থী শর্বরী মুখোপাধ্যায় অবশ্য ঘটনাটি অস্বীকার করেন।
এ বারের ‘নিরামিষ’ ভোটে কেপিসি হাসপাতালের পিছনে সুকান্ত সেতুর নীচের তল্লাটে সামান্য উত্তেজনার জোগান মেলে। সাবেক টিবি হাসপাতালের আবাসনের দিক থেকে বিজেপি সমর্থকদের আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে শর্বরী পুলিশ, আধাসেনাকে খবর দেন। পরে তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদারও (মলয়) এসে বললেন, ‘‘মিথ্যা অভিযোগ। আমাদের কর্মীদেরই আধা সেনা রাতভর বাড়ি-বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়েছে। সিপিএমের অত্যাচার দেখেছি। কিন্তু কমিশনের এই জুলুম ভুলব না।’’ পরে শর্বরী দাবি করলেন, ২০২১ থেকে ঘরছাড়া কয়েক জন সমর্থককে এনে তিনিই ভোটের ব্যবস্থা করছেন। ‘বিকাশদা’র সঙ্গে ওই বুথেই শর্বরীর দেখা হল। বিকাশ ঠাট্টা করলেন, “না না, ওরা বিজেপিকে মোটেই ভোট দেবে না।” এক পরিচিতের ফোন মারফত তৃণমূল প্রার্থী মলয়কেও বিকাশের সহাস্য বার্তা, “তুমিও পারলে চলে এস এখানে।”
সিপিএমের অন্দরে অনেকে মনে করেন, সৃজন ভট্টাচার্যের মতো কেউ যাদবপুরে লড়লে আর একটু আশা থাকত। আর একটি মত, সৃজনকে রাজ্য জুড়ে প্রচারের জন্য ফাঁকা রাখাই কাজের হল। এ সব চর্চার বাইরে বিকাশ নিজের কাজে মশগুল। বললেন,‘‘মে-র মাঝামাঝি প্রাথমিক শিক্ষকদের মামলার শুনানি সুপ্রিম কোর্টে। এ বার ওটা নিয়ে ভাবতে হবে।’’ তাঁকে দেখে ভোটাররা অনেকেই বিগলিত। কেউ ছেলে, মেয়েকে এগিয়ে দিচ্ছেন, ‘যা প্রণাম কর!’
বিকাশ সবার সঙ্গে থাকলেন, সবার বিশ্বাসে থাকলেন কি না, বোঝা যাবে শীঘ্রই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)