মাঠ ছোট করে গোলে পৌঁছনোর অঙ্ক বিজেপির

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনেই প্রকাশ্যে সংখ্যা ঘোষণা করে বিজেপির জন্য জয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেন। এ বার পশ্চিমবঙ্গেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদীর আশাবাদের কারণ কী?

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮
চণ্ডীপুরে ‘বিজয় সঙ্কল্প সভা’য় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাশে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।

চণ্ডীপুরে ‘বিজয় সঙ্কল্প সভা’য় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাশে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। — নিজস্ব চিত্র।

রাজ্যে শেষ যে বার পরিবর্তন এসেছিল, তার ইঙ্গিত ছিল কয়েক বছর আগে থেকেই। এ বার দৃশ্যত তেমন কোনও লক্ষণ নেই। তবু কলিঙ্গ, অঙ্গের পরে বঙ্গ জয়ের প্রশ্নে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি! মাঠের সীমানার দড়ি ছোট করে এনে ম্যাচ বার করার অঙ্ক কষেছে তারা। সেই অঙ্কে এখন ভরসা রাখছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।

বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে পুরুলিয়ায় এসে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, ‘‘সাধারণত নির্বাচনে কোনও দিন আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করি না। কী ফল হবে, কখনও বলি না। অনেক বছর ধরে নির্বাচন লড়ছি। কিন্তু এ বারে যা দেখছি.. এ সব দেখা-শোনার পরে আর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলছি, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে সরকার গড়তে চলেছে।’’

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনেই প্রকাশ্যে সংখ্যা ঘোষণা করে বিজেপির জন্য জয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেন। এ বার পশ্চিমবঙ্গেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদীর আশাবাদের কারণ কী? বিজেপির অন্দরের খবর, তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার চোরা স্রোত, হিন্দু পরিচয় সত্তা তথা মেরুকরণ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরিণাম— এই তিন বিষয়কে এক সূত্রে বেঁধে মসনদে পরিবর্তনের সম্ভাবনার অঙ্ক করছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল।

রাজ্যে ২৯৩টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে বিজেপি। পুরুলিয়ার একটি আসনে সহযোগী দলকে তারা সমর্থন করছে। বিজেপির অন্দরের একটি সূত্রের বক্তব্য, সব আসনে প্রার্থী থাকলেও দল আসলে লড়ছে রাজ্যের ২২০টি আসনে। সংখ্যালঘু ভোটই নির্ণায়ক, এমন আসন তারা হিসেবের বাইরে রেখেছে। গত লোকসভা নির্বাচনে ফলাফলের নিরিখে বিজেপি এগিয়ে ছিল ৯২টি আসনে। ওই সূত্রের বক্তব্য, পরিস্থিতির বিচারে প্রায় ১০০ আসনে এখন তারা ‘স্বচ্ছন্দ’ জায়গায় আছে। এর পরে কম-বেশি ৭০টা আসন আছে, যেখানে লোকসভা ভোটে ‘লিড’ ১০ হাজার ভোটের আশেপাশে ছিল। তার মধ্যে ৬০টিতে আবার জয়ী ও দ্বিতীয় স্থানের মধ্যে ব্যবধান তুলনায় বেশি কাছাকাছি। এই সব আসনে যেমন এমনিতেই তৃণমূলকে কড়া লড়াইয়ে ফেলার জায়গা আছে, তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া। সব মিলিয়ে এই ৭০ আসনের মধ্যে ৪৫-৫০টি ঘরে তুলতে পারলে সরকার গড়ার জায়গায় চলে যেতে পারবে বিজেপি এবং দলীয় নেতৃত্বের দাবি, সেই কাজ অসম্ভব নয়। বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতার কথায়, ‘‘বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ১০১টি আসনে লড়েছিল। জিতেছে ৮৯টিতে। বিহারেও বড় সংখ্যায় মুসলিম ভোট ছিল। বিহারে যদি ১০১-এর মধ্যে ৮৯ সম্ভব নয়, বাংলায় ২২০-র মধ্যে ১৫০ হতে পারবে না কেন!’’

নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংখ্যালঘু ভোট ৩০%-এর বেশি, এমন ৮৯টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০২১ সালে ৮৭টিই জিতেছিল তৃণমূল। আর ২৫% বা তার কাছাকাছি সংখ্যালঘু ভোট আছে, এমন ১১২টি আসনের মধ্যে ১০৬টিই গত বার গিয়েছিল তৃণমূলের দখলে। প্রথম অংশের মধ্যে থেকেই ৭৪টি আসন নিজেদের নজরের একেবারে বাইরে রেখে নেমেছে বিজেপি। কিন্তু সংখ্যালঘুর পাশাপাশি হিন্দু ভোটারও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছে, এমন কিছু আসনকে তারা তালিকার বাইরে রাখছে না। বিজেপি শিবিরের অঙ্ক, ওই রকম কিছু আসনে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ হলে পাশা উল্টে যেতে পারে। আর এই ধরনের মিশ্র এলাকার কিছু আসনকে হিসেব থেকে বাদ দিয়ে ধরলে বিজেপি প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ১৯২ আসনে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, গত শতকের ছয়ের দশকে সেই যুক্তফ্রন্টের টানাপড়েনের সময় ছাড়া এ রাজ্যে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। রাজ্যে কি আদৌ বিজেপির জন্য তেমন পরিস্থিতি আছে? দলের ওই নেতার যুক্তি, ‘‘অতীতে বামফ্রন্ট বা তৃণমূল যখন পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তখন তারা বাংলার সব আসনেই লড়েছে। বিজেপির জন্য পরিস্থিতি তেমন নয়। তাই সংখ্যাগত তুলনা এখানে খাটবে না। গত ৬ মাসে বাংলায় আমাদের পক্ষে অবস্থার উন্নতি হয়েছে।’’

এই সুর বজায় রেখেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘বিজেপি বলে নয়, এই ভোটটা হচ্ছে মমতার সরকারকে রাখতে চাওয়া বা না-চাওয়ার প্রশ্নে। মমতা বনাম জনতার লড়াই। পরিবর্তন নিশ্চিত!’’ বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মতে, ‘‘বিজেপি ২০১৬ সালে তিন আসন থেকে ২০২১ সালে ৭৭ হয়েছে। এ বার ১৭০-এর নীচে নামবে না, ওটা ১৭৭ হবে!’’ ব্যতিক্রমী ভাবেই শুভেন্দুকে এ বার নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর, জোড়া কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে বিজেপি। ব্যতিক্রম ঘটিয়েই প্রথম দফার ভোটের আগে শেষ দু’দিনে শুভেন্দুর জন্য হেলিকপ্টার বরাদ্দ করেছে দল। কারণ, সড়ক-পথে ছুটে নানা কেন্দ্রে প্রচারের সূচি মানা অসম্ভব হয়ে উঠছিল।

প্রচারের পরে ভোটের সমীকরণের ‘অসম্ভব’ কি ছুঁতে পারবেন শুভেন্দুরা? মোদী-শাহদের আশা বাড়ছে! আর তাঁর দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রতি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা, ‘‘ভোট-বাক্স খুললে পদ্ম ফুল যেন চোখে সর্ষে ফুল দেখে!’’ সেই সঙ্গে তাঁর পাল্টা হুঙ্কার, ‘‘কথা দিচ্ছি, এ বার ডিজে বাজবে ৪ তারিখের পরে! সে দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলায় থাকবেন?’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Amit Shah BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy