মহিলা প্রার্থী: রাজ্যে সবার পিছনে বিজেপি

রাজ্যের ২৯৪টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার নিরিখে হিসেবে বিজেপির মহিলা মুখ ১১%-এর আশেপাশে। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল ১৭%-এর আশেপাশে মহিলা প্রার্থী দিয়েছে। বাম-কংগ্রেস দু’পক্ষের মহিলা প্রার্থী ১৩%-এর কাছাকাছি।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২১

—প্রতীকী চিত্র।

প্রস্তাবিত মহিলা সংরক্ষণ বিল সংসদে আটকে যাওয়ায় বিরোধীদের একটানা নিশানা করছে বিজেপি। সেই তালিকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেউ বাদ নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজেজু থেকে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি রাজ্যে এসে ভোট-প্রচারের ফাঁকে এই প্রশ্ন সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করছেন। কিন্তু রাজ্যে বিধানসভা ভোটের প্রার্থী তালিকায় চোখ রাখলে বেরোচ্ছে অন্য ছবি! রাজ্যে মহিলা প্রার্থী দেওয়ার নিরিখে সব চেয়ে পিছিয়ে আছে বিজেপিই!

রাজ্যের ২৯৪টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার নিরিখে হিসেবে বিজেপির মহিলা মুখ ১১%-এর আশেপাশে। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল ১৭%-এর আশেপাশে মহিলা প্রার্থী দিয়েছে। বাম-কংগ্রেস দু’পক্ষের মহিলা প্রার্থী ১৩%-এর কাছাকাছি। তবে ৩৩%-কে (সংরক্ষণের নিরিখে) মানদণ্ড ধরলে রাজ্যের সবক’টি প্রধান রাজনৈতিক দলই অনেক পিছনে রয়েছে। এডিআর-এর হিসাব অনুযায়ী, তৃণমূল যে ২৯১ আসনে প্রার্থী দিয়েছে, তার মধ্যে ৫৩ জন মহিলা। বাম-আইএসএফের জোটের মহিলা প্রার্থী ৪৫, কংগ্রেসের তালিকায় মহিলা মুখ ৪০ জন। সেখানে বিজেপির ২৯৩ আসনে প্রার্থীদের মধ্যে ৩৫ জন মহিলা। বিজেপি অবশ্য ‘নিয়মের বাধ্যবাধকতা’কে ঢাল করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। বিরোধীরা যদিও বিজেপির এই ‘দ্বৈত অবস্থান’কে ‘নাটক’ বলে কটাক্ষ করছে।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘এখনও তো কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি। আমরা যেখানে দেব মনে করেছি, দিয়েছি। কিন্তু তৃণমূলের এই নিয়ে কিছু বলার নৈতিক অধিকার নেই! এক জন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করছেন, এর চেয়ে লজ্জার কিছু হতে পারে? আমরা এক জন আদিবাসী মহিলাকে রাষ্ট্রপতি করেছি। সংবিধান অনুযায়ী যিনি এই দেশের সমস্ত জমির মালিক, সেই রাষ্ট্রপতি এই রাজ্যে এসে কর্মসূচির জন্য একটা মাঠ পাননি। তাঁর গায়ের রং নিয়ে তৃণমূল আক্রমণ করেছে!’’

লোকসভায় তৃণমূলের উপ-নেতা শতাব্দী রায়ের মন্তব্য, ‘‘মহিলা বিলে কোনও বিরোধী সাংসদ বিরোধিতা করেনি। ওই বিল তো ২০২৩ সালে পাশ হয়ে গিয়েছিল। এটা তো আসন পুনর্বিন্যাসের বিল। আমরা এটার বিরোধিতা করেছি। বিজেপি যে মহিলা দুর্গা, কালীর রূপ বলে এখন নাটক করছে, তা হলে তো পুনর্বিন্যাস ছাড়াই মহিলা সংরক্ষণ দিতে পারত! নিজেদের ৫৪৩ আসন ছাড়ব না, আসন বাড়লে তবে সংরক্ষণ দেব, এটা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কী?’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও বিলের দরকার হয় না। তিনি লোকসভা, রাজ্যসভায় সব চেয়ে বেশিসংখ্যক মহিলাদের পাঠিয়েছেন।’’

একই সুরে প্রদেশ কংগ্রেসের তরফে মিতা চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘মহিলা সংরক্ষণ বিল ২০১০ সালে রাজ্যসভায় এবং ২০২৩ সালে লোকসভায় পাশ হয়ে আছে। এখন বিরোধিতা হয়েছে আসন পুনর্বিন্যাস বিলের। বিজেপির যদি সদিচ্ছা থাকত, তা হলে বর্তমান আসনের নিরিখে বিল কার্যকর করত এবং বিধানসভায় বেশি মহিলা প্রার্থী দিয়ে দেখাত!’’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘‘কাঠুয়া, উন্নাও, মণিপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, বিলকিস বানুর ধর্ষণে অভিযুক্তদের যারা মালা পরিয়ে জেলের বাইরে স্বাগত জানিয়েছে, তার পরে সেই দল মহিলাদের কল্যাণ নিয়ে এত কথা বললে সেটা পরিহাসের মতোই শোনায়!’’

সিপিএমের মহিলা সংগঠন গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কনীনিকা বসু ঘোষের বক্তব্য, ‘‘এ সব বিজেপির নাটক! মহিলা বিলের নামে নাকের বদলে নরুণ ধরাতে চেয়েছে। মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে মহিলা সমিতির আন্দোলন দীর্ঘদিনের। এখন বিজেপি সেটাকে জনগণনা, আসন পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে জুড়ে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে। আমরা চাই নিঃশর্ত সংরক্ষণ।’’

বিজেপির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও রাজ্যের বাকি রাজনৈতিক দলগুলির বিধানসভায় মহিলা প্রার্থী দেওয়ার শতাংশ যথেষ্ট কমই। এই নিয়ে শতাব্দীর জবাব, ‘‘এখন তো কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাঁকে যোগ্য মনে করেছেন, তাঁকে প্রার্থী করেছেন। লোকসভা, রাজ্যসভায় শতাংশের হিসেবে তো অনেক বেশি। সব জায়গায় সমান ভাবে দেওয়ার সুযোগ অনেক সময় থাকে না।’’ কনীনিকা অবশ্য বলেছেন, ‘‘এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, সমাজটা পুরুষতান্ত্রিক। সেই জন্যই তো সংরক্ষণ চাই। তবে আগের চেয়ে প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে।’’

রাজারহাটের একটি হোটেলে এসে সোমবারই বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি এই নিয়ে দাবি করেছেন, ‘‘আমরা সংগঠনের মধ্যে মহিলা সংরক্ষণ দিয়েছি। কে কোথায় টিকিট পাবেন, সেটা যেখানে ঠিক হয়, সেই সংসদীয় বোর্ডে পর্যাপ্ত সংখ্যক মহিলা প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই দৃষ্টান্ত আর অন্য কোনও দলের নেই।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP TMC Congress CPIM

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy