ঢেউ ছিল প্রত্যাখ্যানের। তার নীচেই এসেছে হিন্দু মেরুকরণের কুমির!
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পথে ৪৫.৮৪% ভোট পেয়েছে বিজেপি। গত কয়েক বছরে পরপর কয়েকটি নির্বাচনে তাদের ধরে রাখা ভোটের সঙ্গে এ বার যোগ হয়েছে আরও প্রায় ৬%। বাড়তি ভোট সঞ্চয় করে রাজ্যে পালাবদল ঘটানোর এই নির্বাচনে হিন্দু সমর্থনের সর্বোচ্চ মেরুকরণ করতে পেরেছে তারা। ফলাফলের প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, হিুন্দু ভোটের প্রায় ৮০%-ই এ বার গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। যা উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ বা বিহারের দৃষ্টান্তকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।
ভোট গণনার আগে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের আত্মবিশ্বাস ছিল, বাংলায় তাঁদের ১৭০-এর বেশি আসন নিয়ে সরকার গড়া নিশ্চিত। আরও আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘোষণা ছিল ১৭০ আসনের। বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর হিসেবও ছিল কাছাকাছি। কার্যক্ষেত্রে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন! প্রাথমিক বিশ্লেষণেই উঠে আসছে, সংখ্যালঘু ভোট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আছে— এমন অন্তত ৩৪টি আসন জিতে নিয়েছে পদ্ম শিবির। মুসলিম ভোটের উল্টো দিকে হিন্দু ভোটের বিপুল মেরুকরণ ঘটেছে। রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের বিরুদ্ধে নানা স্তরের ক্ষোভকে উস্কে দিয়ে বিজেপি যে ভাবে ভোটের বাক্সে হিন্দু সংহতির নজির ঘটিয়েছে, তাতে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র অনেকটা যেন গত শতাব্দীর চারের দশকের ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ও তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান এখনও পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৩২ লক্ষ ১১ হাজার ৪২৭। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) ‘বিচারাধীন’ হয়ে বাদ এবং পরে ট্রাইবুনালে আবেদনের নিষ্পত্তি না-হওয়ায় ভোট দিতে পারেননি ৩০ লক্ষের বেশি মানুষ। কেউ কেউ এই দুই সংখ্যাকে পাশাপাশি রেখে মত দিচ্ছেন, এসআইআর-ই দু’পক্ষের ফারাক গড়ে দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রভিত্তিক পরিসংখ্যান এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিচ্ছে না। অনেক কেন্দ্রেই এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়ার পরেও পাঁচ বছরের তুলনায় বেশিসংখ্যক ভোট পড়েছে।
বিজেপি নেতাদের আশা ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতির অভিযোগ তুলে তাঁরা হিন্দু ভোটের ৬০-৬২% ঘরে আনতে পারবেন। কিন্তু ভোটের ফলে দেখা যাচ্ছে, গড় হিসেবে হিন্দু সমর্থনের প্রায় ৮০% বিজেপি পেয়েছে। তুলনায় তৃণমূলের ক্ষেত্রে সেই হার গড়ে ১৮-২০%। আবার উল্টো দিকে, মুসলিম বা সংখ্যালঘু ভোটের পুরোটা তৃণমূলের দিকে যায়নি। প্রাথমিক হিসেব বলছে, সংখ্যালঘু ভোট ৫০%-এর বেশি— এমন আসনে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এ বার তৃণমূলের ভোট কমেছে ১৬.৩%। পক্ষান্তরে বাম ও কংগ্রেসের ভোট এই ক্ষেত্রে বেড়েছে ৭.৪%। বিজেপির ভোটও বৃদ্ধি পেয়েছে ৪.৬%। সংখ্যালঘু ভোটার খুব বেশি, এমন ১০টি আসনের নিরিখে ধরলে পাঁচ বছর আগের তুলনায় তৃণমূলের ভোট কমেছে ১৭.১%। এই ক্ষেত্রে বাম ও কংগ্রেসের ভোট বেড়েছে ৯.৯%, বিজেপির বেড়েছে ২.৫%। অর্থাৎ এক দিকে বিজেপির পক্ষে হিন্দু ভোটের নিবিড় একত্রীকরণ এবং অন্য দিকে তৃণমূলের সংখ্যালঘু সমর্থনে ভাঙন— এই দুইয়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছে মমতার মসনদ।
দুই কেন্দ্রে জয়ের পরে প্রথম বার বিজেপির রাজ্য কার্যালয়ে শুভেন্দু অধিকারী। বিধাননগরে। —নিজস্ব চিত্র।
বঙ্গে ভোটের এমন ধারা টের পেয়েই বিজেপি নেতারা হিন্দু সমর্থনের কথা আরও বেশি ও সরাসরি বলতে শুরু করেছেন। শুভেন্দু অধিকারী যেমন বলছেন, নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুই কেন্দ্রেই তিনি জিতেছেন হিন্দু ভোট পেয়ে। বীরভূমের সিউড়ি কেন্দ্রে জয়ী বিজেপি নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়েরও মত, ‘‘হিন্দু ভোট সর্বোচ্চ পরিমাণে একত্রিত না-হলে এখানে আমাদের জয় সম্ভব ছিল না।’’ ওই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোট উল্লেখযোগ্য। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) সেখানে প্রায় ২৬ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। তার পরেও গত বারের তুলনায় বেশি ভোট পড়েছে প্রায় ১৮ হাজার। এই ‘মডেলে’ই দিনহাটা, করণদিঘি, মানিকচক, জঙ্গিপুর, বেলডাঙা, করিমপুর, তেহট্ট, নাকাশিপাড়া, রাজারহাট-গোপালপুর, রাজারহাট-নিউটাউন, জাঙ্গিপাড়া, চাঁপদানি, পান্ডুয়া, পাঁশকুড়া পশ্চিম বা মন্তেশ্বরের মতো আসন জিতে নিয়েছে পদ্ম শিবির।
ব্যতিক্রমও অবশ্য আছে কিছু। উলুবেড়িয়া পূর্বে যেমন আইএসএফ বিদায়ী শাসক দলের সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসিয়েছে। কিন্তু হিন্দু ভোটের ৩২-৩৩% পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজেপির ইতিহাসে নির্বাচনী ফলের নিরিখে সফলতম রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘বাংলাদেশের সঙ্গে এই রাজ্যের ২২০০ কিলোমিটার সীমান্ত। সন্ত্রাসের একাধিক ঘটনায় এই রাজ্যের নাম জড়ানো, বিভিন্ন নাশকতামূলক সংগঠনের ‘স্লিপার সেল’ ধরা পড়া, একাধিক গোলমাল ও সংঘর্ষের ঘটনা— এই সবের জেরে হিন্দু বাঙালি একত্রিত হয়ে বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। তাঁরা তৃণমূলের সরকার থেকে মুক্তি চেয়েছেন।’’
বহরমপুরের পরাজিত কংগ্রেস প্রার্থী অধীর চৌধুরী বলছেন, ‘‘এই ভোটে রাজ্যের মানুষ আগে তৃণমূলকে সরাতে চেয়েছেন। হিন্দুরা এককাট্টা হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। তাতে তৃণমূল হেরেছে, আমরাও সকলে তার শিকার হয়েছি। মনোভাবটা ছিল তৃণমূলকে হারাও।’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মতে, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লিগ, কারও রাজনীতিই স্থায়ী জায়গা পায়নি। বাংলার ঐতিহ্য এবং পরে বামপন্থী রাজনীতির ভূমিকা সেখানে ছিল। তার পরে আরএসএসের বসানো শক্তি এখানে ক্ষমতায় থেকেছে, এখন বিজেপি নিজেই এসেছে। এ সবের ফল এই বিভাজন। ধর্মীয় পরিচিতি নির্বিশেষে মানুষের রুটি-রুজির সমস্যা নিয়ে আমাদের লড়াই চালাতে হবে।’’
স্বয়ং তৃণমূল নেত্রী এ বারের নির্বাচনের ফলকেই অস্বীকার করায় দলের নেতারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাই না। তবে একান্তে তৃণমূলের নেতাদের অনেকেই মানছেন, তাঁদের ‘ডবল ধাক্কা’য় রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার এসে পড়েছে!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)