বন্ধন টুটলেও গান রয়ে গিয়েছে। আর সেই গানের গুঁতোই ‘বুমেরাং’ হয়ে ফিরছে গায়ক-নেতার দিকে। যদিও নেতার দাবি, তিনি জানেন সত্যকে সহজে নেওয়ার কৌশল।
সঙ্গীতশিল্পী তথা রাজ্যের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় এখন দলের রাজ্যসভার সাংসদ। প্রতিপক্ষ দল বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্য জুড়ে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। আর সেই বাজারে বাবুলের কণ্ঠস্বরকে তাঁর দলের বিরুদ্ধেই প্রচারের কাজে লাগাচ্ছে বিজেপি।
ভোটের প্রচারে বিরোধী দলকে বিঁধতে প্রচার-সঙ্গীত বাজানো বর্তমান যুগের রীতি। তৃণমূল যখন প্রচার-সঙ্গীত তৈরি করে নিজেদের প্রকল্প ও দলনেত্রীর হয়ে প্রচার করছে, তখন বিরোধী দলগুলি গান তৈরি করে তুলোধোনা করছে শাসকদলকে। এই বাজারে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপির প্রচারে নতুন করে ফিরে এসেছে তাদের তৈরি পুরনো একটি প্রচার-সঙ্গীত ‘এই তৃণমূল আর না’। যে গান গেয়ে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের বাজার গরম করেছিলেন তৎকালীন বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়।
এ বারের ভোটে কলকাতায় শ্যামবাজার, রাসবিহারীর পাশাপাশি হাওড়া, খড়্গপুরের মতো এলাকাতেও বাবুলের গাওয়া বিজেপির গান ‘ফুটবে এ বার পদ্মফুল, বাংলা ছাড়ো তৃণমূল’ বাজতে শোনা যাচ্ছে দলের প্রচার-গাড়িতে। শ্যামবাজারের কাছে পাল স্ট্রিটে মানিকতলার বিজেপি প্রার্থী তাপস রায়ের নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে অটোর উপরে লাগানো মাইক থেকে ভেসে আসছিল বাবুলের গলায় ‘দিদির পায়ে হাওয়াই চটি, ভাইয়েরা সব কোটিপতি, এই তৃণমূল আর না’। যা শুনে হাসতে দেখা গেল অটোচালককেও। ফোনে কথা বলার সময়ে হেসে ফেললেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও।
এটা কি তৃণমূলকে ঠেস দিয়ে বাবুলকে বিড়ম্বনায় ফেলার তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়াস?শমীকের দাবি, ‘‘একেবারেই না। তবে বাবুলের ওই গানটা সেই সময়ে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। এ বারেও গান তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বিশেষ কিছু না ভেবে হয়তো অন্য গানের সঙ্গে বাবুলের গানটাও চালিয়ে দিচ্ছেন। আসলে রাজনীতিতে দল বদলটা কখনও কখনও বিপজ্জনক এবং বিড়ম্বনার হয়ে পড়ে।’’ কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতা উদ্ধৃত করে শমীকের সংযোজন, ‘‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়...।’’
বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলের হাতে হাত রেখে তা বইতে গিয়ে ভোটের সময়ে আগেও বিড়ম্বনায় পড়েছেন বাবুল। ২০২১ সালে ত্রিপুরায় তৃণমূলের হয়ে প্রচার করার সময়ে বিজেপির গাড়ি বাবুলের সভায় হাজির হয়ে, ‘এই তৃণমূল আর না’ বাজাতে শুরু করে দিয়েছিল। বাবুল তো বটেই, বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন দলের আর এক সাংসদ সায়নী ঘোষও।
বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার পথে দলের হয়ে ভোটের প্রচারে যাওয়ার ফাঁকে বাবুল তাঁর ব্যাখ্যা দিলেন ফোনে। বিষয়টিকে তিনি জনপ্রিয় শিল্পীর বিড়ম্বনা হিসেবে দেখেন বলেই দাবি করলেন। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপির দুরবস্থা ভাবুন। ভোটের বাজারে এত বছরেও এমন জনপ্রিয় গান তৈরি করতে পারল না। এক দিনের মধ্যে গানটা তৈরি করেছিলাম। এ রাজ্যে তো আমার জন্যই বিজেপি খাতা খুলেছিল। দু’বার রেকর্ড ব্যবধানে জিতেছিলাম। অথচ, আমাকেই পিছন থেকে ছুরি মারল। ঝালমুড়ি খেয়ে সৌজন্যের রাজনীতি আমিই দেখিয়েছিলাম। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সাংসদ পদ ছাড়ার দুঃসাহসও দেখিয়েছি।’’
তবে, ওই গান যে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক জীবনে মাঝেমধ্যেই বুমেরাং হয়ে ফেরে, তা স্বীকার করছেন বাবুল। তিনি বলেন, ‘‘কিছু করার নেই। এটাই জীবন। বিরোধী দলের এই প্রয়াস সহজ ভাবেই নিই। তবে, এই গান বাজানোর পরেও ওদের হারাব।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)