সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) মেটাতে গিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ‘গড়িমসি’র অভিযোগ তুলছিল বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন। তবে তারই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বকেয়া মেটানোর ঘোষণা করেছেন। এই আবহে রাজ্যে দলের কর্মসূচি ‘পরিবর্তন যাত্রা’য় এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি ঘোষণাকে সামনে রেখে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ‘সম্ভাব্য বেতনে’র পাল্টা হিসাব দেখাচ্ছে রাজ্য বিজেপি। দলের তরফে হিসাব কষে বলা হচ্ছে, শাহের ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপি রাজ্যে সরকার গড়লে ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন চালু হবে এবং তার ফলে কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১১৪% বাড়তে পারে! যদিও এর ‘বাস্তবতা’ নিয়ে কর্মচারী সংগঠনগুলির একাংশ সংশয় প্রকাশ করে বলছে, এই প্রতিশ্রুতি আসলে ভোটের আগে সরকারি কর্মচারীদের মন জয়ে ‘নির্বাচনী প্রচার কৌশল’।
রাজ্যে ষষ্ঠ বেতন কমিশন চালু আছে। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছে, ২০২৫-এর ৩ নভেম্বর অষ্টম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন গঠিত হয়েছে। সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে ১৮ মাস, অর্থাৎ ২০২৭-এর গোড়ার মধ্যে। এই প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের কর্মচারীদের ‘বেতনের ফারাকে’র কথা বলে ধারাবাহিক ভাবে সরব বিজেপি। এই সূত্রেই রাজ্য বিজেপির বক্তব্য, ষষ্ঠ বেতন কমিশন অনুযায়ী, গ্রুপ-এ সরকারি কর্মীদের মাসিক বেতন গড়ে ৪৭ হাজার ১১০ টাকা। সপ্তম বেতন কমিশন হলে তা, ১১৪% বেড়ে হতে পারে এক লক্ষ ৮৬০ টাকা। একই প্রেক্ষিতে বিজেপির হিসাবে, গ্রুপ-বি এবং সি কর্মীদের বেতন বাড়তে পারে অন্তত ৪৬% (বর্তমানে গড়ে ২৫ হাজার ৩১৪ টাকা থেকে গড়ে ৩৭ হাজার ৫৭ টাকা)।
যদিও বিজেপির প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয়ে কর্মী সংগঠনগুলির একাংশ। মহার্ঘ ভাতা নিয়ে অন্যতম আন্দোলনকারী ‘সংগ্রামী যৌথ মঞ্চে’র তরফে ভাস্কর ঘোষ বলেছেন, “বিজেপি যদি রাজ্যের সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথা বলে, তা হলে সেটা কেন্দ্রের অষ্টম বেতন কমিশনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে হবে। কিন্তু এখনও অষ্টম বেতন কমিশনের রিপোর্টই কেন্দ্রে গৃহীত হয়নি। বিজেপি বরং রাজ্যে সরকার গড়লে ৪৫ দিনের মধ্যে বকেয়া সব মহার্ঘ ভাতা মেটাক।” রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বক্তব্য, “সপ্তম বেতন কমিশন গঠন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ৪০% বকেয়া মহার্ঘ ভাতা না-মিটিয়ে বেতন কমিশন গঠিত হলে, তার কার্যকারিতা থাকে না। এগুলো দ্বিচারিতা ও নির্বাচনী প্রচার।”
রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রিসাইডিং অফিসার থেকে পুলিশ-কর্মীরা। তাঁরা বেশির ভাগই রাজ্য সরকারি কর্মচারী। ফলে, ভোটের মুখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এমন হিসাব সামনে আনার নেপথ্যে সরকারি কর্মচারীদের দলের প্রতি ‘আস্থা’ বাড়ানোর লক্ষ্য থাকতে পারে বলে ওই অংশের মত। ঘটনাচক্রে, তৃণমূলের ইস্তাহারেও সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মহার্ঘ ভাতা সংক্রান্ত টানাপড়েনের আবহে তৃণমূলের এই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে বলে মনে করছে বিজেপি।
পুরো বিষয়টাকেই ‘জুমলা’ বলে কটাক্ষ করেছে তৃণমূল। দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেছেন, “বিজেপি ত্রিপুরায় বলেছিল, সপ্তম বেতন কমিশন চালু করবে, কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা মিলবে। ক্ষমতায় আসার আট বছর পরেও তা হয়নি।” যদিও বিজেপি প্রভাবিত সরকারি কর্মচারী সংগঠনের তরফে দীপল বিশ্বাসের পাল্টা বক্তব্য, “আমরা এই প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানাচ্ছি। এর ফলে বেতন কাঠামোর অপ্রাপ্তিগুলি থাকবে না। সর্বভারতীয় ‘প্রাইস ইনডেক্স’ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা, বকেয়া মিলবে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)