E-Paper

ভোটের ‘কথা’য় নেই অনুন্নয়নের উত্তর

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

কাজল গুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২১
রঘুনাথপুর বিধানসভা এলাকার একটি কল, কিন্তু জল মেলে না তা থেকে।

রঘুনাথপুর বিধানসভা এলাকার একটি কল, কিন্তু জল মেলে না তা থেকে। — নিজস্ব চিত্র।

পুরুলিয়া শহর থেকে বান্দোয়ান যাওয়ার রাস্তা। ভোটের প্রচার সেরে চায়ের দোকানে এসে বসলেন এক যুবক। কাছেই বেঞ্চে বসা প্রবীণ নরহরি বললেন, ‘‘কাম লাই, দান লিয়ে কিমন পঙ্গু হুয়ি যাইছি। লেতাগুলান এক-এক রকম বুইলছে। বুইঝতে লারি। আগে পেট দিখবো লা ধম্ম?’’ এক যুবক বলে উঠলেন, ‘‘কাকা, মানো আর লাই মানো, ইখন সরকারি প্রকল্পগুলার টাকাতে কিছু সুবিধাতো হুইছে।’’

চায়ের দোকানের ওই সংলাপই যেন জেলার ভোটযুদ্ধের ছবি তুলে ধরছে। উন্নয়ন আর অনুন্নয়ন দুই সহোদর পুরুলিয়া জেলায়। ঝাঁ-চকচকে রাজ্য সড়ক, কংক্রিটের রাস্তা, পর্যটন, কারখানা, মেডিক্যাল কলেজ আপাত উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও রয়েছে পানীয় জলের সঙ্কট, গ্রামীণ রাস্তার হতশ্রী চেহারা, কর্মসংস্থানের আকাল, শিক্ষকের অভাব, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিস্তর অভিযোগ এবং দুর্নীতি।

২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে পুরুলিয়ায় বিজেপি ছ’টি এবং তৃণমূল তিনটি আসনে জয়ী হয়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে কিছুটা জমি পুনরুদ্ধার করে তৃণমূল। যদিও দুই দলের ভোটের ব্যবধান আহামরি নয়। সেই সূত্রে এ বার বাম-কংগ্রেস, ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক মুক্তি মোর্চা কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি হিসাবের হেরফের ঘটাতে পারবে কিনা, চলছে সেই চর্চা। যদিও তৃণমূল এবং বিজেপি, উভয়েরই দাবি, ন’টি বিধানসভা আসনেই তারা জয়ী হবে। সেই প্রসঙ্গ তুলতেই বান্দোয়ানের দলীয় অফিসে বসে সিপিএম প্রার্থী রথুসিং সর্দার বলেন, ‘‘সব হিসাব ইবার উল্টাইন দিব।’’

এই হিসাবে বড় হয়ে উঠছে প্রার্থী নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ, দ্বন্দ্বের চোরা স্রোত। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ উড়িয়ে ফের টিকিট পাওয়া মন্ত্রী, মানবাজার আসনের তৃণমূল প্রার্থী সন্ধ্যারানি টুডু অবশ্য বললেন, ‘‘আমরা পুরুলিয়ার প্রভূত উন্নতি ঘটিয়েছি। জয় নিশ্চিত।’’ যদিও বিজেপি প্রার্থী ময়না মুর্মু, বাম প্রার্থী সোনামণি টুডু হিসাব কঠিন করতে পারেন বলেই ধারণা অনেকের।

গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ছবি আরও প্রকট পুরুলিয়া আসনে। প্রার্থী ঘিরে ক্ষোভের জেরে তৃণমূল নেতা দিব্যজ্যোতিপ্রসাদ সিংদেও কংগ্রেসে যোগ দিয়ে প্রার্থী হয়েছেন। তৃণমূলের ভরসা পুরনো মুখ সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের দলীয় বিভাজন আর বাম-কংগ্রেসের ভোট থেকে লাভের আশায় বিজেপি প্রার্থী সুদীপ মুখোপাধ্যায়। এই কেন্দ্রে বাম প্রার্থী সায়ন্তন ঘোষের ভোট বাড়লে লাভের আশা দেখছেন তৃণমূল কর্মীরা।

সেই নিরিখে জয়পুর আসনে লড়াই বহুমুখী। বিজেপি প্রার্থী করেছে কুর্মি সমাজের ‘মূল মানতা’ (প্রধান) অজিতপ্রসাদ মাহাতোর ছেলে বিশ্বজিৎ মাহাতোকে। তাতে বিজেপির অন্দরে কোন্দলের কথা শোনা গিয়েছে। আবার তৃণমূল ছেড়ে আসা দিব্যজ্যোতি সিংদেও ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার টিকিটে লড়ছেন। রয়েছেন তৃণমূলের নতুন মুখ অর্জুন মাহাতো, ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতো ও কংগ্রেসের ফণিভূষণ সরকার।

বাঘমুন্ডি আসনে রয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী নেপাল মাহাতো, ফরোয়ার্ড ব্লকের পরিমল কুমার, বিজেপির রহিদাস মাহাতো। তৃণমূল পুনরায় প্রার্থী করেছে সুশান্ত মাহাতোকে। এখানেও লড়াই জোরদার। পাড়া কেন্দ্রে ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে তৃণমূলের নতুন মুখ মানিক বাউড়িকে ঘিরে। গত বারের বিজেপি বিধায়ক নদিয়ারচাঁদ বাউড়ি এ বারেও প্রার্থী। বাম প্রার্থী, যুবনেতা অলোক বাউড়ি এবং কংগ্রেসের ফাল্গুনী বাউড়ি। চতুর্মুখী লড়াই হলে ভোট ভাগাভাগির অঙ্কে কে বেরোবেন, তা বোঝার চেষ্টায় রাজনৈতিক মহল। রঘুনাথপুর কেন্দ্রেও ক্ষোভ তৃণমূল প্রার্থী হাজারি বাউড়িকে নিয়ে। উপরন্তু, বিজেপি প্রার্থী মামণি বাউড়ি, সিপিএম প্রার্থী গণেশ বাউড়ি কিংবা কংগ্রেসের সন্ধ্যা বাউড়ি হিসাব কঠিন করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

চোরা স্রোত কাশীপুর কেন্দ্রে। তৃণমূল প্রার্থী করেছে দাপুটে নেতা স্বপন বেলথরিয়ার ছেলে সৌমেনকে। বিজেপি বিধায়ক কমলাকান্ত হাঁসদা পুনরায় প্রার্থী। বামেদের ভরসা শিক্ষিকা সুলেখা বাউড়ি, কংগ্রেসের প্রার্থী সুভাষ মাহাতো। গোষ্ঠী-কাঁটা, বাম ভোটের বাড়া-কমা ঘিরে চলছে লাভ-ক্ষতির হিসাব। বলরামপুর আসনে বিজেপির নতুন মুখ জলধর মাহাতো। তৃণমূলের ভরসা মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো। তবে, বাম প্রার্থী নমিতা মাহাতো এবং কংগ্রেসের প্রার্থী সুকান্ত মাহাতোর ভোট বৃদ্ধি বা ক্ষরণ এই আসনের নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। একই কথা শোনা যাচ্ছে তৃণমূলের দুর্গ হিসাবে পরিচিত বান্দোয়ানেও। সেখানে বিধায়ক তথা দলের জেলা সভাপতি রাজীবলোচন সরেনকে ফের প্রার্থী করেছে তৃণমূল। বিপক্ষে সিপিএম প্রার্থী রথুসিং সর্দার, বিজেপির লবসেন বাস্কে, কংগ্রেসের সিতেন মান্ডি। আপাত নিশ্চিত আসনেও দ্বন্দ্বের চোরা স্রোতের উঁকিঝুঁকি রয়েছে।

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে বিজেপিতেও। যদিও তা উড়িয়ে বিজেপির পুরুলিয়া জেলার সভাপতি শঙ্কর মাহাতোর গলায় আত্মবিশ্বাসের সুর, ‘‘তৃণমূলের দুর্নীতি, বিপুল সম্পদ, অনুন্নয়ন দেখে মানুষ তিতিবিরক্ত। বিপুল ব্যবধানে ন’টি আসনেই জিতব।’’ কংগ্রেস নেতা তথা প্রার্থী নেপাল মাহাতোর বক্তব্য, ‘‘বিজেপির জয় এসেছিল ফ্লোটিং ভোটকে ভিত্তি করে। এ বার সেটা হবে না।’’ সিপিএমের জেলা সম্পাদক প্রদীপ রায়ও বলেন, ‘‘চাকরি, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সাধ্যের মধ্যে রেল পরিষেবা দিতে ব্যর্থ দু’টি দলই। স্রেফ ধর্মের মেরুকরণ, টাকা এবং বাহুবলে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা।’’

তবে, এ সবই ভোটের ‘কথা’। পরিযায়ী শ্রমিক পরাশর, কলেজপড়ুয়া সুভাষ, সুস্মিতা এবং কৃষক অজয়রা প্রশ্ন করছেন, ‘‘জেলাতেই কি কাজ পাব? পরিস্রুত জল কবে পাব? হাসপাতালের ‘রেফার’ বন্ধ হবে?’’ উত্তর এখনও নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

purulia West Bengal Politics West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy