‘এসেছি, আমি এসেছি’....মহানায়কের মুখে অনবদ্য এই গানের প্রেক্ষাপটে রয়েছে হাওড়ার জগৎবল্লভপুর। সেখানেই সত্যনারায়ণ খাঁ-এর বাড়িতে হয়েছিল ‘হার মানা হার’-এর শুটিং।
কিন্তু জগৎবল্লভপুরের ক্ষুদ্র শিল্পের আসরে ‘বড়গাছিয়া মেটাল ক্লাস্টার’ এসেও আসছে না বহু বছর ধরে। এলাকার ব্যবসায়ী তুষারকান্তি কর জানালেন, ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে ক্লাস্টার বা গুচ্ছ শিল্প তৈরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সেই বিজ্ঞাপন দেখে রাজ্যের দ্বারস্থ হন তাঁরা। কারণ, বর্তমানে ক্ষুদ্র শিল্পেও আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তির প্রয়োজন। কিন্তু সেই ধরনের যন্ত্র কিনতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা করা ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের পক্ষে কঠিন। কিন্তু গুচ্ছ শিল্প বা ক্লাস্টার তৈরি হলে, সেখানে ওই যন্ত্র ও প্রযুক্তি আনা সম্ভব। যা কম খরচে ব্যবহার করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। সেই চিন্তা থেকে শুরু হয় ‘বড়গাছিয়া মেটাল ক্লাস্টার’ তৈরির উদ্যোগ। কিন্তু অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় জমি।
তুষারের বক্তব্য, প্রথমে একটি জমি চিহ্নিত করা হলেও, সেটির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত পারিবারিক জমিও ক্লাস্টার তৈরির জন্য দিয়েছেন তিনি। কিন্তু, ক্লাস্টারের কাজ কিছুই এগোয়নি।
সমস্যার কথা মেনে জগৎবল্লভপুরের বিদায়ী বিধায়ক সীতানাথ ঘোষ জানান, সরকারের হাতে থাকা একটি খাস জমিতে হয়েছে জল প্রকল্প। অন্য একটিতে বিদ্যুৎ প্রকল্প হওয়ার কথা। আবার, ক্লাস্টারের জন্য আগে চিহ্নিত জমির মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তুষারের ব্যক্তিগত জমির সামনে অন্য জমি থাকায়, সেখানে যাতায়াতের সমস্যা। কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অনুপম ঘোষ এই গুচ্ছ শিল্প নিয়ে নির্দিষ্ট ভাবে মুখ না খুললেও বললেন, ‘‘এলাকার অনেক ক্ষুদ্র শিল্পই সরকারি সাহায্য ও উদ্যোগের অভাবে ধুঁকছে। এলাকাবাসী তথা রাজ্যের মানুষ সুযোগ দিলে, নির্দিষ্ট নীতি মেনে এই শিল্পের উন্নয়নের চেষ্টা করব।’’
এমনই সব সমস্যা, তার সঙ্গে উদ্বেগের কথা শোনা গেল উলুবেড়িয়া পূর্ব, পাঁচলা, সাঁকরাইল, ডোমজুড়ের সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায়। বিশেষ করে, এসআইআর শব্দটি সেখানে অতি পরিচিত। ভীতিরও।
পাঁচলায় জরিশিল্পীদের সর্বভারতীয় সংগঠনের নেতা মুজিবর রহমান মল্লিকের অফিসে বিষণ্ণ মুখে বসেছিলেন আসলাম। এসআইআরে নাম ‘বিবেচনাধীন’ থাকায় কেরল থেকে আসতে হয়েছে তাঁকে। শুনানির পরে সেই সমস্যা মিটেছে। আপাতত আসলাম ভেবেছেন, ভোট দিয়েই ফিরবেন। বললেন, ‘‘এখানেই যদি কাজের সুযোগ আর কেরলের মতো পারিশ্রমিক মিলত, তা হলে আর ওখানে যেতেই হত না।’’ অনেক রাজ্যেই কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, স্বীকার করছেন মুজিবরও। তাঁর মতে, আগে মহারাষ্ট্রে পুলিশ-প্রশাসনের তরফে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া জরিশিল্পীদের উত্ত্যক্ত করা হয়েছে। সেখানে তবু পরিচয়পত্র দেখালে স্বস্তি মিলত। কিন্তু বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ-সহ নানা রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের স্থানীয় জনতাই নিশানা করছে। কেরলে তবু তুলনামূলক ভাবে স্বস্তিতে কাজ করতে পারেন শ্রমিকেরা।
টাকা বড় বালাই। আসলাম বললেন, ‘‘এ রাজ্যে সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করে যদি ১৪০০ টাকা উপার্জন হয়, তবে কেরলে ওভারটাইম মিলিয়ে তা দাঁড়ায় সাড়ে চার হাজার টাকা।’’ মুজিবরের কথায়, ‘‘পাঁচলা, উলুবেড়িয়া পূর্ব, সাঁকরাইলে এক সময়ে অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ ছিল জরি শিল্প। কিন্তু এখন টাকা কম। কাজও কম। তাই শিল্পীদের বড় অংশ ভিন্ রাজ্যমুখী।’’
কাজ বা টাকা কম কেন? পাঁচলার ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী তথা ওই এলাকার পোড়খাওয়া রাজনীতিক ফরিদ মোল্লা জানালেন, হাওড়ার এই অঞ্চলে তৈরি জরির পণ্য প্রথমে কেনে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। তার পরে তা যায় বড়বাজারের ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে আর্থিক ভাবে বঞ্চিত হন জরিশিল্পীরা।
২০১২ সালে সাঁকরাইলে ‘জরি হাব’-এর উদ্বোধন করেছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেখানে আর কাজ বিশেষ এগোয়নি, দাবি জরিশিল্পী এবং বিরোধীদের। সাঁকরাইলের সিপিএম প্রার্থী সমীর মালিকের বক্তব্য, ওই হাব ঘিরে স্বপ্ন দেখেছিলেন স্থানীয়েরা। সেখানে স্থানীয় জরিশিল্পীদের তরফে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকার কথা ছিল।
জরিশিল্পীদের সমস্যার কথা জানেন, দাবি উলুবেড়িয়া পূর্বের তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁদের কল্যাণের জন্য নির্দিষ্ট মডেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র-সহ পরিষেবা দেওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি। তবে জরি হাব হবে কিনা, সদুত্তর মেলেনি ঋতব্রতের কাছে। পাঁচলার বিজেপি নেতা মোহিত ঘাটি অবশ্য বলেন, ‘‘এখন জরি শিল্পে কম্পিউটারের মাধ্যমে কাজ করা বেড়েছে। কদর নেই হাতের কাজের। বাংলাদেশের মতো যে সব দেশে জরির পণ্য রফতানি হত, সেখানকার কারিগরেরা এখন নিজেরাই সব তৈরি করছেন। ফলে চাহিদা কমেছে।’’ তা হলে জরি হাব? মোহিতের দাবি, উপযুক্ত চাহিদা না থাকলে হাব হবে কী করে!
মুজিবর জানান, এসআইআরের ডাক পেয়ে রাজ্যে ফিরেছেন অনেক জরিশিল্পীই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না ফিরলে যে কাজ চলে যেতে পারে, মানছেন আসলামই। কিন্তু ভোটের অধিকার হারাতে রাজি নন তিনি। ভিন্ রাজ্যে পরিচয়পত্র হিসেবে ভোটার কার্ডের দরকারও বোঝেন হাড়ে হাড়ে।
উদ্বেগের আর এক ছবি উলুবেড়িয়ার মহকুমা শাসকের দফতরের সামনে। হাকিমা বেগমের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। মধ্যবয়সি ওই মহিলা উলুবেড়িয়া পূর্ব কেন্দ্রের পশ্চিম বাউড়িয়ার বাসিন্দা। পারিবারিক কারণে বর্তমানে মুম্বইবাসী। নাম ভোটার তালিকায় ফেরাতে ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হতে এসেছেন। উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, ‘‘আমি এ সবের কিছুই জানি না। ছেলে যা করতে বলল, করছি।’’ ট্রাইবুনালে আবেদন নিয়েও ধোঁয়াশা বিস্তর। উলুবেড়িয়া আদালতের আইনজীবী অনুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, উচ্চ আদালতে আপিলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এই বিচার বিভাগীয় ট্রাইবুনালের কাছে আপিল। কিন্তু কী নথি ট্রাইবুনাল গ্রাহ্য করবে, তা তাঁদের কাছেও স্পষ্ট নয়।
এসআইআরের প্রভাব সাঁকরাইলেও। শাসক দলের হিসাব অনুযায়ী সেখানে কয়েক হাজার নাম বাদ গিয়েছে। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সব সম্প্রদায়ই। সে কথা উল্লেখ করে তৃণমূলের প্রার্থী প্রিয়া পাল বলছেন, ‘‘সব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই এটা বিপজ্জনক।’’ তরজায় এসেছে নিকাশি ও পানীয় জলের সমস্যার কথাও। প্রিয়া জানান, দু’টিরই সমাধানে সচেষ্ট প্রশাসন। সিপিএম প্রার্থী সমীর মালিকের পাল্টা দাবি, এই নিয়ে কোনও কাজই হয়নি।
নিকাশির সমস্যা ডোমজুড়েও। পাশাপাশি, ওই কেন্দ্রকে পুরসভার অন্তর্গত করার প্রস্তাব যে আগেই এসেছিল, তা মেনে নিচ্ছে শাসক দলের সূত্র। বালি খালের মাধ্যমে বিকল্প পথে জল বার করে নিকাশি সমস্যার সমাধানের কথা ভাবছেন তৃণমূল প্রার্থী তাপস মাইতি। আর পুরসভা? বিজেপি প্রার্থী গোবিন্দ হাজরার মতে, ‘‘১৫টি পঞ্চায়েত এলাকা নিয়ে গঠিত ডোমজুড়কে পুরসভার অন্তর্ভুক্ত করতে গেলে আগে উপযুক্ত পরিকাঠামো প্রয়োজন। নিকাশির জন্য প্রয়োজন খাল সংস্কার। কিন্তু বর্তমান শাসক দল শুধু লুটপাটে ব্যস্ত।’’ ডোমজুড়ের কংগ্রেস প্রার্থী অলোক কোলের মতে, বালি পুরসভা সংলগ্ন এলাকায় যে হারে নগরায়ণ হয়েছে, তাতে ওই এলাকাকে পুরসভার অন্তর্ভুক্ত করলে সেখানকার বাসিন্দাদের আরও উন্নত পরিষেবা দেওয়া যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)