দলে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, ‘যেমন কথা, তেমন কাজ’। এ সুনাম তাঁর বহু দিনের। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে স্বয়ং অমিত শাহ তাঁর ‘গুণগ্রাহী’ বলেও শোনা যায়। তাই বার বার নানা কঠিনতর দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই চাপে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজেপি তার সুফলও পায়। এ হেন সুনীল বনসল পশ্চিমবঙ্গে এসে ঈষৎ ‘কথার খেলাপ’ করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে বিজেপির অন্দরমহলে। ভোটের আগে অন্তত মাস ছয়েক ধরে যাঁদের কাজে লাগিয়ে রাজ্য জুড়ে সংগঠন গুছিয়ে নিচ্ছিলেন বনসল, তাঁদের কয়েক জনকে ভোটে টিকিট দেওয়ার ‘কথা’ ছিল তাঁর। কিন্তু দু’দফায় ইতিমধ্যেই যে ২৫৬ জন প্রার্থীর নাম বিজেপি ঘোষণা করেছে, তাতে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে ‘অভিমান’।
জেলা, মণ্ডল, শক্তিকেন্দ্র এবং বুথ স্তরে সাংগঠনিক পরিস্থিতি মজবুত করতে এবং সাংগঠনিক শক্তির খাঁটি হিসাব হাতে রাখতে ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ শুরু করেছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বনসল। পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসাবে ওই অভিযানই ছিল বনসলের তত্ত্বাবধানে সবচেয়ে বড় দুই সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার একটি (অন্যটি ‘সদস্যতা অভিযান’)। সাংগঠনিক হিসাবে ‘জল মেশানো’র অভিযাগ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে বহু বছর ধরেই উঠত। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব খাতায়-কলমে যে হিসাব হাতে পেতেন, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে আলাদা হত। ভোটের ফলাফলে সেই ফারাক টের পাওয়া যেত। সেই ‘গরমিল’ মুছে দিতে বনসল ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ শুরু করান। রাজ্য স্তরে তার দায়িত্ব বর্তায় সাত জনের একটি কমিটির উপরে। সেই সাত জনের কারও নামই বিজেপির প্রার্থিতালিকায় এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাঁদের মধ্যে যে কয়েক জনের নাম যে সব আসনের প্রার্থী হিসাবে বিবেচিত হচ্ছিল, সে সব আসনে ইতিমধ্যেই অন্য প্রার্থীর নাম ঘোষিত হয়ে গিয়েছে।
বনসলের প্রতিশ্রুতি কী ছিল? বিজেপি সূত্র বলছে, কাজ ‘ভাল’ হলে ‘বুথ সশক্তিকরণ টিম’ থেকে অন্তত তিন জনকে বিধানসভা ভোটে প্রার্থী করা হবে বলে বনসল একটি বৈঠকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে বিধাননগরের বিজেপি দফতরে সে বৈঠক হয়েছিল। সেখানে অবশ্য সাত নয়, ১৭ জন উপস্থিত ছিলেন। রাজ্য স্তরে কর্মরত সাত জন এবং ১০টি সাংগঠনিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আরও ১০ জন। বনসল তিন জনকে প্রার্থী করার কথা বললেও ‘টিম’-এর তরফ থেকে তৎক্ষণাৎ দাবি উঠেছিল, তিন নয়, পাঁচ জনকে প্রার্থী করতে হবে। বনসল সে আর্জিও বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেই বিজেপি সূত্রের দাবি। কিন্তু এ যাবৎ প্রকাশিত প্রার্থী তালিকা বলছে, ‘প্রতিশ্রুতি’ রক্ষা করা হয়নি।
‘বুথ সশক্তিকরণ টিম’-এর অন্যতম পুরোধা শশী অগ্নিহোত্রী পরে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছেন। তাই শশীর টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ, কোনও সাধারণ সম্পাদকই টিকিট পাচ্ছেন না। কিন্তু ওই ‘টিম’-এর প্রধান হিসাবে যিনি কাজ করেছিলেন, সেই প্রবাল রাহা হয়েছেন রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি। সে পদে থেকে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং তাপস রায় টিকিট পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু প্রবাল পাননি। রাজ্য স্তরের সাত জনের টিমের মধ্যে আরও অন্তত তিন জনের নাম তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রে বিবেচিত হচ্ছিল। এক জনের নাম ছিল তমলুক সাংগঠনিক জেলার একটি আসনে। বাকি দু’জন বিবেচনায় ছিলেন ব্যারাকপুর এবং বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার একটি করে আসনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সব আসনে অন্য নামের পাশে সিলমোহর পড়েছে।
আরও পড়ুন:
বিভাগ স্তরে যাঁরা কাজ করছিলেন, তাঁদের মধ্যে এক জনের নাম রাজারহাট-নিউটাউনে বিবেচনায় ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিজেপির দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশের পরে দেখা গিয়েছে, তিনি রাজারহাট-নিউটাউনে টিকিট পাননি। ‘বুথ সশক্তিকরণ’-এর বিভাগ স্তরে কাজ করা আর এক নেতা বিল্বেশ্বর সিংহ অবশ্য বাঁকুড়ার বড়জোড়া আসনে টিকিট পেয়েছেন। তবে বিজেপি সূত্রের দাবি, তিনি ‘বুথ সশক্তিকরণ’-এর কোটায় টিকিট পাননি। বিজেপির জেলা নেতৃত্বের মতামত অনুযায়ী পেয়েছেন। যে ৩৮টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা এখনও বাকি, সে সব জায়গাতেও ‘বুথজাগানিয়া নেতা’দের কারও নাম বিবেচনায় নেই বলেই খবর।
‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়েও বনসল রাখতে পারলেন না কেন? বিজেপি সূত্রের দাবি, ‘প্রতিশ্রুতি’ যখন দেওয়া হয়েছিল, তখন বনসলই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত সবচেয়ে প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা। কিন্তু পরে ‘নির্বাচন প্রভারী’ হিসাবে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের প্রবেশ ঘটে। সাংগঠনিক পদ বা দায়িত্ব অনুযায়ী বনসল তাঁদের মাথার উপর। কিন্তু ভোটের টিকিট নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক শেষ কথা বলেন না। সে ক্ষেত্রে ‘নির্বাচন প্রভারী’র মতামত গুরুত্বপূর্ণ। সে দায়িত্বে ভূপেন্দ্রের মতো ‘ওজনদার’ নেতা থাকলে সে মতামতের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এর পরেও থাকে রাজ্য নেতৃত্বের নানা অংশের মতামত, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মতামত, আরএসএস-এর ইচ্ছা-অনিচ্ছা। এত রকম অঙ্ক মিলিয়ে প্রার্থী বাছতে গিয়ে বনসল আর ‘কথা’ রাখতে পারেননি বলে বিজেপির অন্দরেই আলোচনা চলছে। কিন্তু সে ব্যাখ্যা ‘বুথ সশক্তিকরণ টিম’-এর ‘অভিমান’ মুছে দিতে পারছে না।