প্রতিশ্রুতির বন্যায় আস্থা নেই ভাঙনে ভীত বাসিন্দাদের

ভোটের আগে ফের উঠেছে প্রতিশ্রুতির ঝড়। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৮
নদীগর্ভে: গঙ্গার ভাঙনে বিপর্যস্ত হুগলির বলাগড়।

নদীগর্ভে: গঙ্গার ভাঙনে বিপর্যস্ত হুগলির বলাগড়। — নিজস্ব চিত্র।

গঙ্গা ও দামোদর। বহমান দু’টি জলধারাই দুঃখে রেখেছে হুগলির জাঙ্গিপাড়া ও বলাগড়ের বাসিন্দাদের। বলাগড় ব্লকের বিস্তীর্ণ অংশ গঙ্গার ভাঙনে বিপর্যস্ত। ভাঙনের জেরে বহু বাড়িঘর তলিয়ে গিয়েছে। ভাঙন যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনের কথা ভেবে আশঙ্কায় বহু মানুষ। আবার ফি-বছর বর্ষায় দামোদরের জলস্ফীতিতে জাঙ্গিপাড়া ব্লকের ছিটঘোলা গ্রাম ডুবে যায়। দামোদরের অববাহিকায় থাকা গ্রামবাসীদের আশ্রয় নিতে হয় অন্যত্র। ভোট আসে, ভোট যায়। কিন্তু জাঙ্গিপাড়ার ছিটঘোলা বা বলাগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা আঁধারেই থাকেন! ভোটের সময়ে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা তাঁদের কাছে ভোট চাইতে এসে ‘প্রতিশ্রুতি’টুকু দিয়ে যান কেবল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।

গঙ্গার গতিপথে পলি, বালি, মাটি জমে চর সৃষ্টি হয়েছে বছর দশেক আগে। গঙ্গার এ-পারে দাঁড়িয়ে ও-পারের সেই চর দেখাচ্ছিলেন এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ মণ্ডল। এক সময়ে ও-পারেই বাড়ি ছিল বিশ্বজিতের। গঙ্গার ভাঙনে সেই বাড়ি তলিয়ে গিয়েছে। তখনও ও-পারের সংশ্লিষ্ট এলাকা হুগলির বলাগড়ের অন্তর্গত ছিল। চর পড়ে গঙ্গার গতিপথ পাল্টে যাওয়ায় ও-পারের বিস্তীর্ণ অংশ এখন নদিয়ার চাকদহে ঢুকে গিয়েছে। এ-পারে এসে ঠাঁই নিয়েছেন বিশ্বজিৎ। গঙ্গা লাগোয়া জিরাট এলাকার চরখয়রামরি গ্রামে অস্থায়ী টিনের ছাউনির বাড়ি করেছেন। বিশ্বজিতের বাড়ির অদূরে গঙ্গার পাড় ভয়ঙ্কর ভাবে ভাঙছে। অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন চরখয়রামরির প্রায় দেড় হাজার বাসিন্দা।

হুগলির বলাগড় ব্লকের জিরাট অঞ্চল জুড়ে গঙ্গার ভয়াবহ ভাঙন এলাকার বড় সমস্যা। গোটা বলাগড় জুড়ে দশটি চরের সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা বাড়ছে বলাগড়ের গঙ্গা লাগোয়া একাধিক গ্রামে। এখন ভোটের আগে প্রার্থীদের কাছে গ্রামবাসীদের একটিই প্রশ্ন, ‘‘জিতে এসে গঙ্গার ভাঙন রোধে কাজ করবেন তো?’’ বলাগড়ের বিজেপি প্রার্থী সুমনা সরকারের অভিযোগ, ‘‘তৃণমূল আমলে কাজ যে কিছু হয়নি, তার বড় প্রমাণ গঙ্গার ভাঙনের সমস্যা। জিতে এলে ভাঙন রোধে সচেষ্ট হব।’’

বিশ্বজিতের বাড়ির অদূরে টিনের অস্থায়ী ঘর সুশোভন মণ্ডলের। তাঁর কথায়, ‘‘গঙ্গার ভাঙনে চর সৃষ্টি হওয়ায় ও-পার থেকে ন’বছর আগে এ-পারে চলে এসেছি। এক সময়ে আমাদের অনেক জমিজমা ছিল। ভাঙনে কিছুই আর নেই।’’ নিজের একচিলতে ঘরের দাওয়ায় বসে সুশোভন বলেন, ‘‘বর্ষায় আতঙ্ক বাড়ে। গঙ্গার স্রোতের শব্দে ঘুম হয় না। মনে হয়, এই বুঝি বাড়িটা তলিয়ে গেল!’’

বিশ্বজিতের বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে গঙ্গার পাড় ক্রমেই ভাঙছে। কলাগাছের বাগান হেলে পড়েছে। স্থানীয় টিঙ্কু মণ্ডল, স্বপন গোসাঁইদের বাড়ি বছর দশেক আগে গঙ্গার ভাঙনে তলিয়ে গিয়েছে। দিনমজুর টিঙ্কুর কথায়, ‘‘গঙ্গার ভাঙন ভিটেবাড়ি কেড়ে নিয়েছে। আতঙ্ক নিয়ে দিন যাচ্ছে।’’ বলাগড়ের রানিনগর মৌজার অধিকাংশ এলাকা এখন গঙ্গার ভাঙনের কবলে। রানিনগর মৌজার তলিয়ে যাওয়া বাড়িগুলির বাসিন্দাদের অস্থায়ী ঠিকানা দুর্লভপুর মৌজা। কিন্তু সেখানকার বর্তমান বাসিন্দারাও চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙন কেড়ে নিয়েছে চরখয়রামারির একটি বিদ্যালয়কেও। সেই বিদ্যালয় সরে এসেছে প্রায় দুশো মিটার দূরে। চরখয়রামারি থেকে বলাগড় ব্লকের চাঁদরার দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। চাঁদরার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গার ভাঙন ঘুম কেড়েছে স্থানীয়দের। গত দু’বছরে ভাঙন তীব্র আকার নিয়েছে। প্রায় ২০টি বাড়ি তলিয়ে গিয়েছে। গঙ্গার ধারের বাসিন্দা নির্মলা বারিক বললেন, ‘‘দু’বছর আগে পর্যন্ত গঙ্গা অনেকটা দূরে ছিল। পাড় যে ভাবে ভাঙছে, তাতে আমরা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’’ নির্মলার একমাত্র ছেলে গোপাল টোটো চালান। গোপালের কথায়, ‘‘টোটো চালিয়ে সংসার চালাই। বছর দুয়েক আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। আমাদের এত টাকা নেই যে, অন্যত্র বাড়ি তৈরি করব।’’ বলাগড়ের তৃণমূল প্রার্থী রঞ্জন ধাড়ার কথায়, ‘‘গঙ্গার ভাঙন বড় সমস্যা। ভাঙন ঠেকাতে অতীতে কাজ হয়েছে। আমি জিতে এসে গঙ্গার ভাঙন রোধে বেশি করে কাজ করব।’’

হুগলির জাঙ্গিপাড়ার সীমানা দিয়ে বয়ে গিয়েছে দামোদর নদ। জাঙ্গিপাড়ার দিকে দামোদরের অববাহিকায় ছিটঘোলা গ্রাম। ও-পারে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের ঘোলা গ্রাম। ফি-বছর বর্ষায় দামোদরের জলস্ফীতিতে ছিটঘোলা গ্রাম ডুবে যায়। গ্রামবাসীদের অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। তাঁদের একটিই আবেদন, ‘‘ও-পারে দামোদরের জল আটকাতে বাঁধ তৈরি হয়েছে। এ-পারেও সেই রকম বাঁধ নির্মাণ করা হোক।’’ সব শুনে জাঙ্গিপাড়ার তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, ‘‘গ্রামটা নদী অববাহিকায় থাকায় বর্ষার সময়ে সমস্যা হয়। তবু আমাদের তরফে ওঁদের জন্য ফ্লাড-সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে।’’ জাঙ্গিপাড়ার সিপিএম প্রার্থী সুদীপ্ত সরকার বলছেন, ‘‘বন্যার সময়ে ছিটঘোলার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরতে হবে কেন? তৃণমূল ১৫ বছরে কী কাজ করল?’’

ভোটের দোরগোড়ায় রাজনৈতিক প্রার্থীদের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু গঙ্গার ভাঙনের কবলে পড়া বলাগড় কিংবা দামোদরের তীরে ছিটঘোলার বাসিন্দারা সেই তিমিরেই রয়ে যান!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Balagarh Hooghly

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy