এক ভোট কেড়েছিল ছেলের প্রাণ। পাঁচ বছর পরে ছেলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে আর এক নির্বাচনে অংশ নিলেন প্রৌঢ়া। বাড়িতে বসে ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে আঙুলে ভোটের কালি দেখিয়ে বললেন, ‘‘যারা সে দিন আমার ছেলেকে মেরেছিল, তারা এখনও এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যত ক্ষণ না ওদের শাস্তি হচ্ছে, আমি থামব না।’’
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন। ফল ঘোষণার দু’সপ্তাহ পরে রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত দমদম পার্ক এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছিল প্রসেনজিৎ দাস নামে এক যুবকের দেহ। এলাকায় বিজেপি কর্মী হিসাবে পরিচিত ছিলেন পেশায় গাড়িচালক ওই যুবক। সেই ঘটনায় অভিযোগ ওঠে, ভোট-পরবর্তী হিংসার বলি হয়েছেন প্রসেনজিৎ।
বুধবার ভোট দিয়ে এসে বাড়ি ফিরে ছেলের ছবি হাতে মা অণিমা দাস জানালেন, ২০২১-এর ভোটের ফল বেরোনোর পরে প্রসেনজিৎ আর বাড়িতে থাকতে পারেননি। সপ্তাহখানেক বাদে বাড়ি ফিরলে তাঁকে জোর করে এলাকার পার্টি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। অণিমার অভিযোগ, সেখানে প্রথমে প্রসেনজিৎকে মারধর করা হয়। কয়েক দিন পরে অভিযুক্তেরা বাড়িতে এসে ফের ওই যুবককে মারধর করে। এর পরে বাড়ির সামনে থেকে উদ্ধার হয় প্রসেনজিতের ঝুলন্ত দেহ।
প্রৌঢ়া মায়ের কথায়, ‘‘আমি সে দিন বাড়িতে ছিলাম না। ফিরে এসে ছেলের ঝুলন্ত দেহ দেখি। ওরা ছেলেকে মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছিল।’’ ঘটনার তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। সেই তদন্ত আজও চলছে। সিবিআইয়ের তদন্তকারী আধিকারিকেরা রাজারহাট-গোপালপুরের তৃণমূল নেতা তথা বিধায়ক অদিতি মুন্সির স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
ছেলের মৃত্যুর পরে বদলে গিয়েছে অণিমার সংসার। পুত্রশোক সইতে না পেরে এক বছর পরে মারা যান অণিমার স্বামীও। আপাতত অন্যের বাড়ি রান্নার কাজ করে সংসার চলে প্রৌঢ়ার। নানা রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে। যদিও এর কোনও কিছুই দমাতে পারেনি তাঁকে। এ দিন ঘরে বসে অণিমা বললেন, ‘‘সে বার ভোটের দিন থেকেই হুমকি আসছিল। ফল বেরোনোর পরে তা আরও বাড়ে। ছেলের মৃত্যুর বিচার যত দিন না পাচ্ছি, ভোটের হিংসা যত দিন বন্ধ না হচ্ছে, আমি থামব না।’’
পাঁচ বছর পরে আবার একটি বিধানসভা ভোট হল রাজারহাট-গোপালপুর এবং রাজারহাট-নিউ টাউনে। শেষ ভোটে বিক্ষিপ্ত অশান্তির অভিযোগ থাকলেও এ বারের ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ। সকালের দিকে কয়েকটি বুথে ইভিএমের বিভ্রাট ছাড়া অশান্তির কোনও অভিযোগ কার্যত শোনা যায়নি। রাজারহাট-নিউ টাউনের যাত্রাগাছিমাঝেরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘুনি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাই ভাই সঙ্ঘ-সহ হাতিয়াড়া, নারায়ণপুরের প্রতিটি বুথে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। একই ছবি রাজারহাট-গোপালপুরের প্রতিটি বুথে। রাজারহাট-নিউ টাউন বিধানসভা এলাকার একাধিক আবাসনে এ বার প্রথম ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করেছিল কমিশন। সেখানেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেনআবাসিকেরা। দুই কেন্দ্রের প্রার্থীরাও এ দিন দিনভর বুথ চষে বেড়িয়েছেন। শান্তির ভোটে সব পক্ষই জেতার ব্যাপারে আশাবাদী।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)