বিজেপির জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলার জাতি- অস্মিতা খাড়া করে লোকসভায় সেমি ফাইনাল লড়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে তার ফাইনালের প্রস্তুতিতে তারা নিখাদ এগিয়েছে বলেই মনে করছে শাসক দল। সেই মতোই ভোটার তালিকা থেকে প্রচার পরিকল্পনা রূপায়ন পর্যন্ত দলের গতিতে সন্তুষ্ট তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। প্রচার শেষের পরে প্রাথমিক মূল্যায়নের পরে তাঁরা মনে করছেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত সব ঠিকই এগোচ্ছে।’’
এ বারের বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতি একটু আগেই শুরু করেছিল তৃণমূল। ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত ব্যতিক্রমী পরিবেশ আন্দাজ করেই অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল দলের অন্দরে। ভোটে এই পর্ব মাথায় রেখে তখন থেকেই প্রচার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা শুরু হয়েছিল। বিজেপির দিল্লির নেতাদের জাতীয়তাবাদী প্রচার ও ধর্মীয় মেরুকরণের সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাখা হয়েছিল ‘বাংলার মেয়ে’ এবং ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবে। গত লোকসভা ভোটে এই কৌশল নেওয়া ও তা কার্যকর হওয়ার পরে এ বারও সেই পথ নিয়েছিল দল। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া আর ভিন্ রাজ্যে বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীদের উপরে নিগ্রহের বিষয় নিয়েই রাজ্য ঘুরেছেন মমতা। প্রচার কৌশলের দায়িত্বে থাকা এক নেতার কথায়, ‘‘মমতার এই আবেদন খুব বেশি। এ বারেও একটি স্লোগানে (‘যে লড়ছে সবার ডাকে, সেই বাঁচাবে বাংলা মাকে’) সাড়া ছিল।’’ তার পাশাপাশি তৃণমূলের প্রচার-সঙ্গীত ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’ও যথেষ্ট ছড়িয়েছে। গত ২৪ মার্চ উত্তরবঙ্গের চালসা থেকে প্রচার শুরু মমতার ১১০টি প্রচার কর্মসূচির অভিমুখও ছিল এ দিকেই। দলের নেতাদের কাছ থেকে মঙ্গলবার দিনভর খোঁজখবর নিয়েছেন মমতা। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অন্য নেতাদের।
অভিষেকের নজর ছিল এলাকাভিত্তিক প্রতিশ্রুতি পূরণ আর প্রয়োজন চিহ্নিত করা। দু’বছর ধরে কেন্দ্রভিত্তিক বিষয় নির্বাচন করেছেন তিনি। তার ভিত্তিতে ঝাড়গ্রামে ভোট চাইতে গিয়ে অভিষেক বলেছেন লালগড়ে ডিগ্রি কলেজ, পলিটেকনিক কলেজ, নার্সিং প্রশিক্ষণ কলেজ ছাড়াও কিসান মান্ডি তৈরি করেছে রাজ্য সরকার। সবংয়ে গিয়ে মনে করিয়েছেন, এই বিধানসভা কেন্দ্রে রাজ্য সরকারি অর্থে ৩১টি সেতু আর কালভার্ট তৈরি হয়েছে তৃণমূলের আমলে। আবার উত্তরে বিজেপির দখলে থাকা ময়নাগুড়িতে গিয়ে ভোটের প্রচারে তিনি মনে করিয়েছেন, ২০২১ সালে হেরে গেলেও এই কেন্দ্রে ৮০ হাজার মহিলা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পেয়েছেন। এলাকার উন্নয়নে রাজ্য সরকার কত টাকা খরচ করেছে, বিজেপির হাতে থাকা রানাঘাটে গিয়ে সে হিসেব দিয়েছেন। আর এক হাতছাড়া এলাকা কোচবিহারে প্রচারে গিয়েও স্থানীয় কাজের হিসেব দিয়ে প্রতিদান চেয়েছেন তিনি। সাংগঠনিক বৈঠক ছাড়া ৮৫টি প্রকাশ্য কর্মসূচি ছিল তাঁর। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে কেন্দ্র ধরে চিহ্নিত সমস্যা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রার্থী, নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন। সাংগঠনিক দায়িত্ব রয়েছে, এমন অনেকের সঙ্গে দিনভর ফোনে যোগাযোগ রেখেছেন।
এসআইআর-এর ঘিরে মমতা বিজেপি- বিরোধী প্রচার যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন, তাতে সাম্প্রতিক অতীতে রাজ্যের শিক্ষা, রেশন সংক্রান্ত দুর্নীতি অনেকটাই ঢাকা দিতে পেরেছেন বলে দলের ধারণা। এর সঙ্গে বিধায়ক নির্বাচনে ভোটারের নিজের এলাকা নিয়ে চাওয়া-পাওয়ার ভাবনা উস্কে দিতে চেয়ে সেই কাজে অভিষেকের প্রচারও সহায়ক হয়েছে বলে তৃণমূল শিবিরের দাবি। এই দুই প্রচারে দল ও দলীয় সরকারের বিরুদ্ধে যে জনমতের সম্ভাবনা ছিল, তা কতটা আড়াল করা গিয়েছে, এ বারের ভোটে সেই পরীক্ষাও হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)