Advertisement
E-Paper

বিধানসভার দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে কাউন্সিলরদের ভবিষ্যৎ! বছর ঘুরলেই পুরনির্বাচন, বার্তা তৃণমূলের পুরপ্রতিনিধি মহলে

রবিবার ভবানীপুরের কর্মিসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্সিলরদের সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে বিষয়টি শুধু ভবানীপুরেই সীমাবদ্ধ নেই। গোটা রাজ্যের শহরাঞ্চলেই ‘বার্তা’ পাচ্ছেন তৃণমূলের কাউন্সিলরেরা।

শোভন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৭
Municipal election nominations will depend on Assembly election performance, TMC councilors getting party message

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বিধানসভায় ‘লিড’ দাও, পুরসভায় টিকিট পাও! সরাসরি এই চারটি শব্দ বলা হচ্ছে না বটে। তবে জেলায় জেলায় পুর এলাকার তৃণমূলের কাউন্সিলরেরা ইতিমধ্যেই এই মর্মে ‘বার্তা’ পেতে শুরু করেছেন। কোথাও সেই বার্তা যাচ্ছে কোনও নেতার ফোন মারফত। কোথাও প্রকাশ্য কর্মিসভায়। এ-ও বলে দেওয়া হচ্ছে যে, পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের খেরোর খাতায় সব হিসাব নথিবদ্ধ থাকছে। বছর ঘুরলেই পুরসভা নির্বাচন। তখন হিসাবনিকাশে আসল সূচক হবে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের কাউন্সিলরদের ওয়ার্ডে সংশ্লিষ্ট দলীয় প্রার্থীর ‘লিড’।

রবিবার ভবানীপুর বিধানসভার নেতা-কর্মীদের নিয়ে চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে কর্মিসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী তথা এলাকার তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অভিষেক যেমন সরাসরিই বলে দিয়েছেন, কে কী করছেন, তার উপর নজর রাখা হবে,তেমনই মমতাও কাউন্সিলরদের সতর্ক করে দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু ভবানীপুরের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। গোটা রাজ্যের শহরাঞ্চলেই ‘বার্তা’ পাচ্ছেন তৃণমূলের কাউন্সিলরেরা।

গত লোকসভা নির্বাচনে শহরাঞ্চলে তৃণমূলের ফল আশানুরূপ ছিল না। রাজ্যের ৭০টির বেশি পুরসভা এলাকায় মোট ভোটে তৃণমূলের চেয়ে এগিয়ে ছিল বিজেপি। বিধানসভা ভোটে শহর এবং মফস্সলে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে মরিয়া শাকদল। সে কারণেই নিজেদের ওয়ার্ডে পরীক্ষার মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে কাউন্সিলরদের। তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ধারণা, পুরসভা ভোটে কাউন্সিলরেরা যে পরিশ্রম করেন, বিধানসভা বা লোকসভা ভোটে তাঁদের সেই উদ্যম দেখা যায় না। শাসকদলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘বিধানসভা বা লোকসভা ভোট এলে কাউন্সিলরদের একটা বড় অংশ মনে করে, এগুলো ‘আমার ভোট’ নয়। এ বার সেই রোগটাই কাটাতে নামা হয়েছে।’’

আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজ্য তৃণমূলের সহ- সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন, ‘‘তৃণমূল তৈরিই হয়েছিল সিপিএম-কে সরিয়ে পশ্চিমবাংলাকে বাঁচাতে। সেই সময়ে একটা আবেগ কাজ করত। এখন দল বড় হয়েছে। দল বড় হলে তার পরিচালন ব্যবস্থাতেও বদল হয়। সেই দিশাতেই ভোটের ফলাফলকেন্দ্রিক পুরস্কার এবং তিরস্কারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’’

লোকসভা ভোটে শহরাঞ্চলে খারাপ ফলাফলের পরে অভিষেক বলেছিলেন, ‘পারফরম্যান্স’কে মাপকাঠি করে সংগঠন এবং পুর প্রশাসনে রদবদল হবে। কিন্তু সেই রদবদল অনেকদিন থমকে ছিল। গত বছর ডিসেম্বরে পিছিয়ে থাকা পুর এলাকার চেয়ারম্যানদের সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে বারাসত, বাঁশবেড়িয়া, চুঁচুড়া, কোচবিহারের মতো কয়েকটি পুরসভায় রদবদল করেই ক্ষান্ত থাকতে হয় ক্যামাক স্ট্রিটকে। বিধাননগর, আসানসোল, শিলিগুড়ি পুরনিগম এলাকায় তৃণমূল পিছিয়ে থাকলেও সে সব জায়গায় মেয়র বদল হয়নি। আসানসোলের মেয়র বিধান উপাধ্যায় এবং শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবকে বিধানসভা ভোটে প্রার্থীও করা হয়েছে। পিছিয়ে থাকা পুরসভার সংখ্যার তুলনায় চেয়ারম্যান বদল নেহাতই হাতেগোনা। ফলে অনেক পুরপ্রতিনিধিই নিশ্চিন্তে ছিলেন। তবে বিধানসভার প্রার্থিতালিকার সার্বিক ছবি দেখলে বোঝা যাচ্ছে, নির্মম ‘সংস্কার’ করেছেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। ৭৪ জন বিধায়ককে প্রার্থী করা হয়নি। ১৫ জন বিধায়কের আসন বদলে দেওয়া হয়েছে। যা দেখে অনেক পুর এলাকার কাউন্সিলরদের ‘সম্বিত’ ফিরেছে।

তৃণমূলের প্রথম সারির অনেক নেতাই একান্ত আলোচনায় মানেন, দলের বড় অংশের মধ্যে কাউন্সিলর হওয়ার উদগ্র বাসনা রয়েছে। যাঁরা হননি, তাঁরা হতে চান। যাঁরা হয়েছেন, তাঁরা থেকে যেতে চান। কারণ, বিষয়টি ‘লোভনীয়’। তৃণমূলে এমন উদাহরণও রয়েছে যে, এক নেতা রাজ্যসভার সাংসদ হয়েও পুরসভা ভোটে কাউন্সিলর হওয়ার জন্য দৌত্য চালিয়েছিলেন গত পুরভোটের সময়। তবে তৃণমূলের অনেকে এ-ও বলছেন যে, পুরসভা ভোটে কাউন্সিলরেরা যে ‘লিড’ পান, তা বিধানসভা বা লোকসভায় ধরে রাখা মুশকিল। প্রথমত, পুরসভা ভোট হয় রাজ্যের নির্বাচন কমিশনের অধীনে। সেখানে অনেক বেশি ‘হাত খুলে’ খেলার সুযোগ থাকে। বিধানসভা বা লোকসভা ভোটে তা হয় না। এ বার যে আরও কড়াকড়ির মধ্যে ভোট হবে, সেই আভাস ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছেন নিচুতলার জনপ্রতিনিধিরা। দ্বিতীয়ত, পুরভোটে স্থানীয় বিষয়ই গুরুত্ব পায়। লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে যথাক্রমে দেশ এবং রাজ্যের প্রেক্ষিত থাকে। কিন্তু তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সে সব মানতে রাজি নন। দলীয় প্রতীকে ভোট সুনিশ্চিত করার জন্য তাঁরা ‘চাপ’ রাখতে চাইছেন কাউন্সিলরদের উপর।

তবে সেই ‘চাপ’ খুব অমানবিক ভাবে দেওয়া হচ্ছে না বলেই দাবি তৃণমূলের অনেকের। যেমন দক্ষিণবঙ্গের এক তৃণমূল সাংসদ সম্প্রতি কর্মিসভা করে তাঁর সংসদীয় এলাকার একাধিক পুরসভার কাউন্সিলরদের বার্তা দিয়েছেন, পুরসভা ভোটের মতো ‘লিড’ না-হলে টিকিট বাতিল! আবার বিজেপি শক্তিশালী, এমন এলাকার তৃণমূল কাউন্সিলরের উদ্দেশে সেই তিনিই বলেছেন, ‘‘ওঁর এলাকাটা সমস্যার। সেটা জানি। কিন্তু ৫০০-র বেশি যেন ‘মাইনাস’ না-হয়। তা হলে কিন্তু মুশকিল আছে!’’

কাউন্সিলরদের ‘বার্তা’ দেওয়ার নেপথ্যে আরও একটি বিষয় রয়েছে বলে অভিমত শাসক শিবিরের অনেকেরই। তাঁদের বক্তব্য, সারা রাজ্যেই কাউন্সিলরদের ঘিরে নিচুতলায় একটি ‘অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র’ তৈরি হয়েছে। যার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে লোকবলও। সেই বাহিনী সারা বছর দলের কাজ, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা এবং সর্বোপরি সক্রিয় ভাবে মাঠে-ময়দানে থেকে নির্বাচনের দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আর কে না জানে, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হয় না, ভোট করাতে হয়!

গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য বা পঞ্চায়েত প্রধানদের ঘিরেও দেখা যায় অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। রয়েছে লোকলস্করের জোরও। যেহেতু গ্রামাঞ্চলে এখনও তৃণমূলের শক্তি অটুট, তাই আপাতত শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রেই এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে তৃণমূল সূত্রে খবর, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামাঞ্চলেও গ্রামীণ এলাকার জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই বার্তা যাবে। তবে আপাতত বার্তা দেওয়া হচ্ছে পুর এলাকার জনপ্রতিনিধিদেরই। বিধানসভার দাঁড়িপাল্লাতেই ওজন হবে তাঁদের পুরসভার টিকিটের।

WB Municipal Election West Bengal Politics TMC Councilors
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy