E-Paper

জেতা মাঠ ছেড়ে ভাঙড়ে ম্যাচ জেতানোই চ্যালেঞ্জ

রাজ্যের সর্বত্র যখন তৃণমূল-বিজেপি টক্করের রাজনীতি, ভাঙড় সেখানে ব্যতিক্রমী। এখানে মূল লড়াই ক্যানিং পূর্ব ছেড়ে আসা তৃণমূলের সওকাতের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’-এর (আইএসএফ) নওসাদ সিদ্দিকীর। বাম সমর্থন রয়েছে নওসাদের সঙ্গে।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২৬
নির্বাচনী প্রচারে নওসাদ সিদ্দিকী।

নির্বাচনী প্রচারে নওসাদ সিদ্দিকী। — নিজস্ব চিত্র।

পাশের হারা মাঠে দলকে জেতানো যায় কি না, দেখতে এসেছিলেন। সেখানে দলীয় কর্মীদের বলতেন, ‘‘কী ভাবে খেলতে হবে, শেখাব। কিন্তু খেলতে হবে তোমাদেরই।’’ খেলা শেখাতে আসা সেই সওকাত মোল্লাকেই হারা মাঠে ম্যাচে নামিয়ে দিয়েছে দল। মনে করা হচ্ছে, দলের মাথাদের এটাই ‘মাস্টার স্ট্রোক’। দল জিতলে ভাল, হারলেও হারানোর কিছু নেই। কিন্তু খেলা শেখাতে এসে মাঠে নামা সেই খেলোয়াড়ের জেতা মাঠ আগেই হাতছাড়া। নতুন মাঠেও না জিতলে প্রাসঙ্গিক থাকাই কঠিন হবে। ভোটের মরসুমে এমনই পরিস্থিতি ভাঙড়ের।

রাজ্যের সর্বত্র যখন তৃণমূল-বিজেপি টক্করের রাজনীতি, ভাঙড় সেখানে ব্যতিক্রমী। এখানে মূল লড়াই ক্যানিং পূর্ব ছেড়ে আসা তৃণমূলের সওকাতের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’-এর (আইএসএফ) নওসাদ সিদ্দিকীর। বাম সমর্থন রয়েছে নওসাদের সঙ্গে। বিজেপির প্রার্থী জয়ন্ত গায়েন প্রচারে থাকলেও তৃণমূল-আইএসএফের কেউই মাঠ ছাড়তে নারাজ। একাধিক রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা, একাধিক জায়গায় বোমা উদ্ধার, বিস্ফোরণে মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে মাসখানেক আগে। তদন্তভার নিয়েছে এনআইএ। মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে গন্ডগোল হয়েছে। গত পঞ্চায়েত ভোটে রক্তারক্তি দেখেই ভাঙড়কে কলকাতা পুলিশের আওতায় এনেছিল সরকার। সরকারি পরিষেবা পেতে এতে সুবিধা হয়েছে বলে তৃণমূলের প্রচারের পরেও বন্ধ হয়নি হানাহানি। ফলে এতে কাজের কাজ কতটা হয়েছে, সেই প্রশ্ন উঠছে।

তৃণমূলের টিকিটে ২০০৬-এ প্রথম বামেদের থেকে ভাঙড় ছিনিয়ে নেন আরাবুল ইসলাম। ২০১১ সালে রাজ্যে প্রবল তৃণমূল-হাওয়ার মধ্যেই ভাঙড়ে ফেরে বামেরা। ২০১৬ সালে সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যাওয়া ‘চাষার ব্যাটা’ রেজ্জাক মোল্লা ফের জেতেন ভাঙড়ে। আগে রেজ্জাক সিপিএম প্রার্থী হিসাবে ভাঙড়ে জিতেছেন ১৯৭২ এবং ১৯৮৭ সালে। কিন্তু এর মধ্যেই ভাঙড়ে দাপটের রাজনীতি করে গিয়েছেন শিক্ষিকার দিকে জগ ছুড়ে মারা ‘তাজা নেতা’ আরাবুল। ২০২১ সালে ভাঙড়ে তৃণমূল প্রার্থী করে আদতে কংগ্রেসি, লোকসভা ভোটে সিপিএমের প্রার্থী হওয়া চিকিৎসক রেজাউল করিমকে। সে বার টিকিট না পেয়ে আরাবুল ও তাঁর বাহিনী দলীয় কার্যালয় পোড়ান বলে অভিযোগ। ওই ভোটে আরাবুলের সমর্থন কার দিকে ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক চর্চাও হয়েছে বিস্তর। প্রায় ২৬ হাজার ভোটে তৃণমূল হারে আইএসএফের নওসাদের কাছে।

নওসাদের দাদা আইএসএফ প্রতিষ্ঠাতা আব্বাস সিদ্দিকী ভাঙড়ে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই এই কেন্দ্রকে সম্মানের লড়াই হিসাবে নেয় আইএসএফ। ২০২১ সালে দল গড়ে বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সময়েই তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ভাঙড় চাই। জোটের জয়ও আসে সেখানেই। এ বারও তাই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট না থাকলেও বাম-আইএসএফের হয়ে ‘ভাঙড়ে ভাইজান’!

এর মধ্যে একাধিক নেতাকে দিয়ে ভাঙড় উদ্ধারের চেষ্টা করে তৃণমূল। শেষে ক্যানিং-পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক সওকাত দায়িত্ব নেওয়ার পরের পঞ্চায়েত ভোটে ফল পায় তৃণমূল। সে বার ভাঙড়ের ১৩টি অঞ্চলের মধ্যে মাত্র একটি পায় ভূমিরক্ষা কমিটি, বাকিগুলি যায় তৃণমূলের ঝুলিতে। সওকাতের হাত ধরে তৃণমূল ভাল ফল করে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী সায়নী ঘোষ ভাঙড় থেকে ভোট পান প্রায় এক লক্ষ ১৬ হাজার। যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা আইএসএফের থেকে ৪০ হাজারেরও বেশি। বিজেপি ও বামেরা যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে ছিল। ওই ভোটে বাম-আইএসএফ জোট হয়নি। পর পর সাফল্যে সওকাতই হয়ে দাঁড়ান ভাঙড়ের শেষ কথা। তত দিনে আরাবুল অনেকটাই কোণঠাসা। একাধিক বার দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে, জেলে গিয়ে কার্যত বসে গিয়েছিলেন। এ বার বিধানসভা নির্বাচনের আগে যোগ দিয়েছেন আইএসএফে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, ‘‘সওকাতের বিরুদ্ধে বদলা নিতেই তিনি আইএসএফে গিয়েছেন। আইএসএফ-ও আরাবুলকে দাঁড় করিয়েছে সওকাতের ছেড়ে আসা ক্যানিং-পূর্বে।’’

এ বারের ভোট কতটা কঠিন? ক্যানিং পূর্ব নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী সওকাত বলেন, ‘‘এক লক্ষেরও বেশি ভোটে ক্যানিং পূর্বে তৃণমূল জিতবে।’’ আর ভাঙড়? সওকাতের উত্তর, ‘‘আমি কি জ্যোতিষী?’’ ক্যানিং পূর্ব নিয়ে বলতে পারলে ভাঙড় নয় কেন? প্রার্থী ঘোষণার পরেই সওকাতের কেন্দ্র বদল নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। অপেক্ষাকৃত শক্ত আসন ভাঙড়ে কেন সওকাত, তা নিয়ে পথে নামেন তাঁর ঘনিষ্ঠেরা। সওকাত অবশ্য বললেন, ‘‘পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পরে রাজ্য সরকারকে বলে যা কাজ করিয়েছি, তাতে আমার জেতা উচিত। জয়ী হলে প্রথম কাজ ভাঙড়কে এনকেডিএ (নিউ টাউন ডেভলপমেন্ট অথরিটি)-র অধীনে নিয়ে আসা। আরও ৫০ হাজার ঘর তৈরির ব্যবস্থা করা, রাস্তাঘাটের উন্নতি। ঘরে ঘরে জিহাদি বানিয়ে ফেলা আইএসএফের থেকে স্থানীয়দের মুক্তি দেব।’’

ভাঙড়ের হাওয়ায় অবশ্য ঘুরছে ভোট কাটাকাটির অঙ্ক। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে ১২০০ জনের নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) বাদ গিয়েছে বলে তৃণমূলের দাবি। ফলে এই অঙ্ক এসআইআর-এ নাম কাটা নিয়ে নয়। ভাঙড়ের এক চায়ের দোকানদার বললেন, ‘‘বোঝাপড়া হয়েছে। ভাঙড়ে আরাবুল ও কাইজ়ারের লোক আইএসএফ-কে ভোট দেবে। উল্টে আইএসএফ আরাবুলকে ক্যানিং পূর্বে জেতাতে ঝাঁপাবে।’’

আইএসএফের শক্ত ঘাঁটি সানপুকুর অঞ্চলের সভাপতি আসাদুল মোল্লা বললেন, ‘‘২০২৩-এর পঞ্চায়েতের সময়ে মনোনয়ন জমা দিতে দেওয়া হয়নি। পঞ্চায়েতে হানাহানি, ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ বিধানসভায় উগরে দেবে ভাঙড়।’’ কিন্তু যে আরাবুলের বিরুদ্ধে অতীতে আইএসএফের এত অভিযোগ, তাঁকেই দলে নেওয়ার প্রভাব পড়বে না? ভাঙড়ে আইএসএফের কর্মী সফিউর জামান বললেন, ‘‘আরাবুলের তুলনায় গত তিন বছরে সওকাত দশ গুণ বেশি ঝামেলা করেছেন। আমাদের যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের কাছে আরাবুল ক্ষমা চেয়েছেন। তাঁরা সম্মতি দিলে ওঁকে দলে নেওয়া হয়েছে।’’ অবশ্য খোঁচা দিচ্ছেন জমিরক্ষা কমিটির সমর্থিত সিপিআই (এমএল) মাস লাইন প্রার্থী মির্জা হাসান। প্রচারের মধ্যেই বললেন, ‘‘আইএসএফের দিকে হাত বাড়িয়েছিলাম। ওরা আমাদের ছেড়ে আরাবুলের হাত ধরেছে। দু’তরফের গুন্ডারাজ থেকেই মানুষ মুক্তি চান।’’ সেই সঙ্গে রয়েছে ভাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মাল্টিপারপাস হিমঘর তৈরি না হওয়া, পড়শী নিউ টাউনের মতো উন্নয়ন না হওয়ার ক্ষোভ। বিজেপি প্রার্থী জয়ন্ত বলেন, ‘‘স্থানীয়েরা বোমা-গুলির হানাহানিতে বিরক্ত। এখানকার সব পক্ষই এ বার বিজেপিকে ভোট দেবে।’’

একই সুর নওসাদেরও। বললেন, ‘‘রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় সরিয়ে রেখেই এসেছি। সবার ভোটেই আইএসএফ জিতবে।’’ সানপুকুর অঞ্চল থেকে তাঁর অফিস সরেছে বাসন্তী হাইওয়ের ধারে। ক্যানিং লাগোয়া ভাঙড় ১ ব্লকের ওই অংশে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক হানাহানির অভিযোগ ওঠায় এই পদক্ষেপ বলে দাবি। নওসাদ অবশ্য বললেন, ‘‘ক্যানিং পূর্ব থেকে এসে ভাঙড় শাসন করা যাবে না। আরাবুল সামলে নেবেন। এখানে সওকাত হারবেনই। উনি ক্যানিং হারালেন, ভাঙড়েও হারবেন।’’ আরাবুলকে দলে নেওয়ার প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘আরাবুল ভুল বুঝেছেন। ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ আইএসএফ দেয়।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

ISF Nawsad Siddique

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy