অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোরে কাজ করেন উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখরের মনিরুল হক, সফিউদ আলম, মহম্মদ তোফাজ্জলরা। ভোট দিতে যাবেন বলে বুধবার ভোরে ওঁরা ট্রেন থেকে হাওড়ায় নেমেছেন। বাড়ি যেতে ট্রেনের টিকিট সরাসরি কাটা থাকলেও তাঁরা সকালে উত্তরবঙ্গমুখী ট্রেনে উঠতে পারেননি। বেলা ১০টা নাগাদ তাঁরা ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ডে চলে আসেন। বাসস্ট্যান্ড জুড়ে তখন শয়ে শয়ে যাত্রী। বাস কম থাকায় তাঁরা বাসে উঠতে হিমশিম খেলেন। সুযোগ বুঝে টিকিটের দাম বাড়ল কয়েক গুণ। তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস না পেয়ে মনিরুল ফের হাওড়ার দিকে রওনা দেন রাতের ট্রেন ধরতে। গত লোকসভা নির্বাচনের মতো একই চিত্র ফিরে এল বিধানসভা ভোটের প্রথম পর্যায়ের আগের দিন।
আজ, বৃহস্পতিবার প্রথম দফার ভোটদান। তাই বাড়ি পৌঁছতে বুধবার সকাল থেকে ওই বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হচ্ছিলেন মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে প্রবল গরমে কাহিল হলেন তাঁরা। ধর্মতলা থেকে দিঘা যেতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে সাধারণ সময়ে ভাড়া লাগে ৩০০-৩৫০ টাকা। এ দিন বেসরকারি পরিবহণ সংস্থা সেই ভাড়া নিয়েছে ৫০০-৮৫০ টাকা! কাঁথির গৌর দাস বলেন, ‘‘প্রতি বার ভোটে এ ভাবেই চার-পাঁচ গুণ ভাড়া দিতে হয় আমাদের। কিন্তু কেউ এ সব দেখেন না।’’ বাসের ছাদে বসেই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মণিশঙ্কর মাইতি। তিনি বলেন, ‘‘ভোট দিতে হবে বলে বেশি টাকা দিয়ে যাচ্ছি। যে ভাবে যেতে হয়, তাতে খুব ঝুঁকি থাকে।’’ বাসের ছাদে বসা তো বেআইনি! কী বলছে পুলিশ? হাওড়া সিটি পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘ভোটের সময়ে কিছুটা ছাড় তো দিতেই হয়।’’
হয়রানির শিকার হয়েছেন মালদহ, বালুরঘাট, শিলিগুড়ির যাত্রীরাও। অভিযোগ, দ্বিগুণেরও বেশি টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়েছে তাঁদের। ভোটের জন্য বেশির ভাগ নন-এসি বাস নির্বাচন কমিশন তুলে নেওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে।
সরকারি পরিবহণের অবস্থা আরও খারাপ ছিল। ধর্মতলায় সরকারি বাসের টিকিট কাউন্টারে লোকে লোকারণ্য। দু’ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে টিকিট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। কম বাস থাকায় সংস্থার কর্মীরা বার বার মাইকে ঘোষণা করলেও প্রবল গরমে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। দিঘা যাওয়ার পথে টিকিটের খোঁজে নাজেহাল হয়েও তা পেলেন না অসুস্থ এক প্রবীণ দম্পতি। কেন এত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তরে বেসরকারি পরিবহণ সংস্থার এক কর্মীর জবাব, ‘‘ইদ, দুর্গাপুজোর মতো ভোটের সময়ে চাহিদা বুঝে আমরা ভাড়া বাড়াই। এর বেশি বলতে পারব না।’’
আইএনটিটিইউসি চালিত ধর্মতলা লং রুট বাস অ্যাসোসিয়েশনের তরফে সাহিল ওয়ারসির অভিযোগ, ‘‘সোমবার সন্ধ্যায় ধর্মতলা থেকে যাত্রিবোঝাই একটি বাস মালদহে যাচ্ছিল, উল্টোডাঙার মোড়ে বাসটিকে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য পুলিশ আটকায়। ফোনে বাসমালিক অনুরোধ করায় পুলিশ শেষমেশ ছাড়ে।’’ ভাড়া বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে সাহিলের দাবি, ‘‘বুধবার সকালে বাঁকুড়ার খাতরা থেকে একটি বাস ধর্মতলায় আসছিল। সেটিকে বেলা ১১টা নাগাদ পুলিশ দ্বিতীয় হুগলি সেতুতে আটকে ভোটে নিয়ে যায়। অথচ বিকেলে ধর্মতলা থেকে খাতরা যেতে ওই বাসের আসন আগাম বুক রয়েছে। এখন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বাস ভাড়া করা ছাড়া উপায় নেই।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)